ডা. আশিকুর রহমান রুপম
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস-২য় পর্ব (অর্থোপেডিক্স)
অর্থোপেডিক ফিজিশিয়ান এবং স্বাস্থ্য কলামিস্ট
০২ ডিসেম্বর, ২০২০ ০৪:৩৯ পিএম
গর্ভফুল জরায়ুর নিচের দিকে থাকা কী ভয়ের কিছু?
বাস্তব জীবন অভিজ্ঞতা
মিসেস আনিস চাকুরিজীবি নারী, বয়স ২৮ বছর। বিয়ের বয়স ২ বছর। ওভারিতে সিস্ট থাকায় গাইনাকোলোজিস্ট তাকে ওভুলেশন ইন্ডিউসিং ড্রাগ (বাচ্চার হওয়ার জন্য ওষুধ) প্রেসক্রাইব করেছিলেন। সেটা সেবন করতে করতেই বাচ্চা চলে এল গর্ভে। প্রথমে মাসিক হওয়ার সময় ব্লিডিং হলো, তবে সে অল্প পরিমাণে। কাঠি টেস্ট করে প্রেগন্যান্সি পজিটিভ পাওয়া গেল। স্বামী-স্ত্রী সেই গাইনাকোলোজিস্টের কাছে গেলে তিনি বলেন, এটা ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং। অর্থাৎ ভ্রুন যখন জরায়ুর ভেতরের দেয়ালে এসে যুক্ত হয় (ইমপ্ল্যান্টেশন) তখন হালকা ব্লিডিং হতে পারে, একে বলে ইমপ্ল্যান্টেশন ব্লিডিং। তিনি কিছু কাউন্সেলিং করলেন আর প্ল্যাসেন্টা যেন ভালোভাবে ম্যাচিউর বা পরিপুষ্ট হয় এবং এবর্শন না হয়ে যায়, তার জন্য Allygestrenol খেতে দিলেন। ১২ সপ্তাহের পর আল্ট্রা সাউন্ড করলে দেখা যায়, মিসেস আনিসের গর্ভফুল নিচের দিকে এবং জরায়ুমুখের পেছনের দিকে। একে বলে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া পোস্টেরিওর।
প্রশ্ন হলো, এই গর্ভফুল নিচের দিকে থাকা কি ভয়ের কোনো বিষয়? চলুন, বিষয়টা খতিয়ে দেখা যাক।
গর্ভফুল নিচের দিকে থাকা কে বলে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া। প্রিভিয়া মানে সামনে। সাধারণত জরায়ুর মধ্যে বাচ্চা থাকে সামনে আর ফুল থাকে পেছনে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে সম্পূর্ণটাই থাকে সামনে, আর বাচ্চা পেছনে। তাই একে বলে প্লাসেন্টা প্রিভিয়া।
গর্ভাবস্থায় ব্লিডিংয়ের তিন ভাগের এক ভাগই হয় এই প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার জন্য। এটা কেন হয়, তার সুস্পষ্ট কোনো কারণ পাওয়া যায়নি। তবে বিজ্ঞানীদের কিছু ধারণা এতে কাজ করে। যেমন—তারা বলতে চেয়েছেন, ভ্রুণ (নিষিক্ত ডিম্ব) যখন জরায়ুর উপর দিকে যুক্ত হতে পারে না, তখন এটা জরায়ুর নিচের দিকে পড়ে যায় এবং সেখানেই যুক্ত হয়। একে বলে ড্রপিং ডাউন থিওরি। এ রকম আরও কয়েকটা কারণ তারা বলেছেন।
কাদের এই সমস্যা হয়?
১. যারা অনেকগুলো বাচ্চা ইতিমধ্যে নিয়েছেন।
২. মায়ের বয়স ৩৫ এর বেশি।
৩. পূর্বের সিজার বা জরায়ুর কোনো অপারেশন হলে।
৪. গর্ভফুল যদি অনেক বড় বা পর্দার মতো পাতলা হয়।
৫. সিগারেট বা তামাক সেবন করলে।
৬. পূর্বে কোনো ইচ্ছাকৃত গর্ভপাত বা কিউরেটেজ করলে।
গর্ভফুল নিচের দিকে থাকলেই কি ভয়ের?
উত্তর হলো, না। সবগুলো ভয়ের নয়। এটা চার ধরনের হয়। যথা:
১. লো-লাইং (অল্প মাত্রায় নিচে)
২. মার্জিনাল (জরায়ু মুখের সাথে লেগে আছে)
৩. আংশিক সেন্ট্রাল (আংশিক মুখ কাভার করেছে)
৪. টোটাল সেন্ট্রাল (সম্পূর্ণ মুখই ঢেকে ফেলেছে)
এই চার প্রকারের মধ্যে প্রথম দুই প্রকার হলে ভয়ের কিছু নেই, তবে সাবধানে থাকতে হবে৷ কিন্তু পরের দুই প্রকার হলে অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে। কারণ, ভয়টা এখানেই।

এর কারণ হলো, যখনই বাচ্চা বড় হতে শুরু করে এটা ওই ফুলের উপর চাপ দেয়, তখনই ব্লিডিং শুরু হয়। এটা কখন হবে, কী করলে হবে, কী করলে হবে না, নিশ্চিত করে কিছুই বলা যায় না। অদ্ভুত একটা ব্যাপার। মা ভয় পেয়ে যায়।
মিসেস আনিসও প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলেন। প্রথমবার যেবার ব্লিডিং হয়েছিল, তখন তার ২৯ সপ্তাহ চলছিল। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়েই তিনি এটা লক্ষ করেন, এবং চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠেন।
প্লাসেন্টা বা ফুলটা যেহেতু লোয়ার ইউটেরাইন সেগমেন্ট বা জরায়ুর নিচের দিকে থাকে এবং জরায়ুর নিচে অংশটা লম্বা হতে থাকে, কিন্তু প্লাসেন্টা সে তুলনায় বড় হয় না, তখনই সেখানে থাকা রক্তনালি ছিড়ে গিয়ে ব্লিডিং হয়৷
এই ব্লিডিং কি হবেই, নাকি প্রতিরোধের কোনো উপায় আছে?
- সাধারণত প্রতিরোধযোগ্য না। তবে আঘাত যেন না লাগে সেটা নিশ্চিত করতে হবে৷ এ ক্ষেত্রে পুরো গর্ভাবস্থায় দৈহিক মিলন করা যাবে না।
এটা কী ভাল হবার কোনোই আশা নেই?
- আছে। শতকরা ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল উপরের দিকে উঠে যায়। ৩৭ সপ্তাহের দিকে দেখা যায়, এটা উপরের দিকে উঠে গিয়েছে।
লক্ষণ
একমাত্র উপসর্গ হলো মাসিকের রাস্তায় ব্লিডিং। যেটা হয় হঠাৎ, স্বতঃস্ফূর্ত, ব্যথাহীন এবং বারে বারে। রাতে ঘুমের মধ্যে সাধারণত বেশি ঘটে।
বারবার ব্লিডিং হতে থাকলে যে সমস্যাটি হয়, তা হলো স্বতঃস্ফূর্ত লেবার শুরু হয়ে যায়। জরায়ু মুখ খোলা শুরু করে এবং বাচ্চা নিচের দিকে নামতে শুরু করে। এমন হলে তখন মা ব্যথা অনুভব করেন।
লেবার শুরু হয়ে গেলে সত্যিই তা ভয়ের। কারণ, তখন বাচ্চা হয়ে গেলেও তা হয় খুবই প্রিম্যাচিউর বা অপরিপক্ক। এ সব বাচ্চাদের সেরেব্রাল পালসি বা অটিস্টিক হবার ঝুঁকি থাকে। বাচ্চাকে আইসিউতে নেওয়া লাগতে পারে। অপর দিকে মায়েরও ব্লিডিং কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে জরায়ু কেটে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
গর্ভফুল নিচে থাকলে স্বামীর করণীয়
১. নির্দিষ্ট দক্ষ গাইনাকোলোজিস্টের তত্ত্বাবধানে থাকা।
২. এম্বুলেন্সের নম্বর রাখা এবং দিন-রাত যে কোনো সময়ে যেন পাওয়া যায়, তা নিশ্চিত করা।
৩. রক্তদাতা প্রস্তুত রাখা।
৪. কিছু অর্থ সঞ্চয় রাখা।
৫. হাসপাতালে বেশ কয়েকবার যেতে হতে পারে, তার জন্য প্রস্তুত থাকা।
৬. সিজারের জন্য মানসিক প্রস্তুতি রাখা।
৭. সরকারি বা বেসরকারি যেখানেই হোক, একাধিক বিশেষজ্ঞ গাইনি সার্জনের সমন্বয়ে অপারেশন করার ব্যবস্থা। এতে লাভ আছে। মায়ের জরায়ু রক্ষা করা যায়।
৮. শিশু বিশেষজ্ঞকে বলে রাখা, যেন জন্মের পরপরই বাচ্চাকে একটু দেখে দেন।
এই সমস্যার জটিলতা কী কী?
সঠিকভাবে চিকিৎসা না নিলে বা আনুষাঙ্গিক ব্যবস্থা না নিলে মা এবং বাচ্চার বেশ কিছু ক্ষতি হয়ে যায়।

মায়ের ক্ষতি
১. ব্লিডিং হতে হতে মা শকে (জীবন বিপন্ন) চলে যেতে পারে এবং মৃত্যু ঘটতে পারে।
২. সময়ের আগেই লেবার শুরু হওয়া।
৩. বাচ্চার পজিশন উল্টো হয়ে থাকা।
৪. জন্মের সময় প্রচুর রক্তক্ষরণ। এতেই গ্রাম-গঞ্জে অনেক মায়ের মৃত্যু হয়। কারণ গ্রামের ধাত্রীরা জানেনও না এই রোগ সম্পর্কে।
৫. জরায়ু ফেলে দিতে হতে পারে, যা মানসিকভাবে মা এবং তার পরিবারকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
৬. পরবর্তী গর্ভের সময়ও একই রোগ হওয়া। শুধু তাই নয়, পরিস্থিতি আরেকটু জটিল হয়ে যায়।
বাচ্চার ক্ষতি
১. কম ওজনের শিশু জন্মানো।
২. অপরিপক্ক শিশু।
৩. জন্মগত ত্রুটি। স্বাভাবিকের তুলনায় তিন গুণ বেশি ঝুঁকি থাকে।
৪. জন্মের পরপর শ্বাসকষ্ট।
৫. মায়ের পেটেই মৃত্যু ঘটতে পারে।
চিকিৎসা
অবশ্যই একজন দক্ষ গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা করাতে হবে। তাঁর পরামর্শ মতো চলতে হবে। পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। প্রস্রাব, পায়খানা বিছানায় করতে পারলে ভালো। একান্ত না পারলে, কারো সাহায্য নিয়ে বাথরুমে যেতে হবে। বাথরুম এটাচ হলে সবচেয়ে ভালো হয়।
বাম কাতে শোবার চেষ্টা করতে হবে। এতে বাচ্চা রক্ত ভালভাবে পাবে এবং মায়েরও শ্বাসকষ্ট হবে না। অল্প পরিমাণে ঘনঘন খেতে হবে। তিন বেলার জায়গায় পাঁচ বা ছয় বেলা খেতে হবে। প্রতিবার খাওয়ার সময় বাচ্চার নড়াচড়া গুনতে হবে।
কী কী ওষুধ দেওয়া হয়?
- আয়রন, ফলিক এসিড, জিংক, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন বি নিয়ম মাফিক খেতে হবে। ব্যথা হলে টাইমোনিয়াম, গ্যাসের জন্য প্যান্টোপ্রাজল, ইসোমেপ্রাজল, ওমিপ্রাজল, বমির জন্য ইমিস্ট্যাট বা প্যালোসেট নিরাপদ।
গর্ভফুল নিচে থাকার জন্য প্লাসেন্টা ম্যাচুরেশনের জন্য এলিজেস্ট্রেনল জাতীয় ওষুধ দেওয়া হয়। অনেকে মনে করে ১৮ বা ২০ সপ্তাহের পর এর তেমন ইফেক্ট নেই। কেউ বলেন ৩২ সপ্তাহ পর দিলে লাভ নেই। আবার কেউ কেউ পুরো প্রেগন্যান্সিজুড়েই এটা দিয়ে থাকেন। এটা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেদের সিদ্ধান্ত। এ ছাড়া প্রিম্যাচিউর লেবার (অপরিপক্ক জন্মদান) প্রতিরোধ করার জন্য টোকোলাইটিক এজেন্ট বা ওষুধ দেওয়া হয়। যেমন: ম্যাগ্নেসিয়াম সাল্ফেট, নিফেডিপিন ও সালবিউটামল ইত্যাদি। এগুলো বেশ ভালো কাজ করে। আমাদের এই আলোচনার রোগী মিসেস আনিসকে উপরোক্ত টোকোলাইটিক ওষুধ তিনটাই বিভিন্ন সময়ে দেওয়া হয়েছিল। নিফেডিপিন এবং সালবিউটামল- ২৯ সপ্তাহ থেকে ৩৭ সপ্তাহ পর্যন্ত টানা ৮ সপ্তাহ দেওয়া হয়েছিল। প্রয়োজন অনুযায়ী ডোজ কম বেশি করতে হয়েছিল। ওই সময়ে তার বেশ কয়েকবার ব্লিডিং হয়েছিল। হাসপাতালেও ভর্তি হতে হয়েছিল। তবে প্রথমবার জরায়ু মুখ যতটুকু খুলে গিয়েছিল, তা আর পরবর্তীতে বেশি খুলেনি এবং ব্যথাও করেনি। একেবারে ৩৭ সপ্তাহে গিয়ে তার সিজার হয় এবং মা বাচ্চা দুইজনই আল্লাহর রহমতে সুস্থ থাকে। জরায়ুও ফেলতে হয়নি।
গর্ভফুল নিচে থাকলে অবশ্যই সাবধানে থাকতে হবে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সমস্ত পরামর্শগুলো মেনে চলতে হবে। দুই থেকে তিন মাসের ধকল সামলাতে হতে পারে, সেভাবে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি রাখতে হবে।