ডা. রাসেল চৌধুরী

ডা. রাসেল চৌধুরী

এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমডি (শিশু)
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ


১৫ অগাস্ট, ২০২০ ০৩:১৫ পিএম

তুমি রবে নীরবে...

তুমি রবে নীরবে...
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফাইল ছবি

আমরা যারা ১৯৭৫ -৯৬ প্রজন্মের মানুষ, তাঁরা বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সম্বন্ধে যতটুকু জানতে বাধ্য হয়েছিল, তার বড় অংশই ছিল নির্জলা মিথ্যাচার।

এক্ষেত্রে স্বাধীনতা বিরোধীদের দায় যদি ৯০ শতাংশ হয়, তবে ১০ শতাংশ হলেও দায় নিতে হবে প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতাদের। কারণ এই প্রবীণ নেতাদের কেউই আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধু পরিবারের অবদান সম্বন্ধে প্রায় কিছুই লেখেননি।

বঙ্গবন্ধু তাঁর জীবদ্দশায় একাই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে হিমালয় উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয় ৭৫ এর নির্মম হত্যাকাণ্ডের ৩৭ বছর পর "অসমাপ্ত আত্মজীবনী" গ্রন্থের মাধ্যমে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের ইতিহাস সবচেয়ে সাবলীলভাবে নতুন প্রজন্মের কাছে বলার গুরুভারটুকুও তাঁকেই নিতে হয়েছে।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে যত চমৎকারভাবে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাসংগিকতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস তুলে ধরেছেন সেটার তুলনা হতে পারে মওলানা আবুল কালাম আজাদের ইন্ডিয়া উইন্স ফ্রিডম বইটি।

তবে বিরাট তফাত হলো, মওলানা আজাদ লিখেছিলেন স্বাধীন ভারতের শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আর বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামরত অবস্থায় অন্তরীণ কারাগারে।

এই বইয়ে যদিও উনি ১৯৫৪ এ যুক্তফ্রন্টের পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে জয় ও প্রথম সরকার বাতিল পর্যন্ত এসে থেমে গেছেন, কিন্তু এতটুকুতেই বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ব্যাখ্যা করা হয়ে গেছে। বইটা পড়লে বোঝা যাবে, বঙ্গবন্ধু আসলে কতখানি ত্যাগ করেছেন এই দেশটার জন্য।

কতখানি আত্মত্যাগ আর নিবেদনের কারণে মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই পূর্ব বাংলার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হওয়া যায়, সেটা আমাদের প্রজন্মের কাছে ভাবনারও অতীত।

নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের বাইরে ঘুণাক্ষরেও কিছু ভাবেননি কখোনো। দেশের আনাচে কানাচে ক্লান্তিহীনভাবে সংগঠন গড়ে তুলেছেন, সভা সমাবেশে যুক্তি তর্ক আর বজ্রকন্ঠের হুংকারে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছেন মুসলিম লীগ জান্তাকে। যখনই সরকার আটক করেছে, জেলে চলে গেছেন।

বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব নিতে গিয়ে পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারেননি কখোনোই। বাবা আর সহধর্মিণী রেণুর দেয়া টাকাতেই পাকিস্তান আর বাংলাদেশ সৃষ্টির রাজনৈতিক জীবন পার করেছেন। সংসার কিভাবে চলছে, সন্তানরা কিভাবে বড় হচ্ছে, এর কোনো ভাবনাই শেখ মুজিবের ছিল না। শুধু বাংলাদেশ আর বাংলার জনগণ, এর বাইরে তাঁর জীবনে আর কিচ্ছু ছিল না।

শুধু তাই নয়, যারা মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা বা সোহরাওয়ার্দীকে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর কাতারে আনার চেষ্টা করেন, তাঁরা আসলে কতখানি ভুল করেন, সেটা বঙ্গবন্ধু নিজের যবানিতে যেভাবে বলেছেন, সাম্প্রতিক কালের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মহিউদ্দিন আহমেদের লেখনিতেও সেটা একইরকম।

বঙ্গবন্ধু এই তিন মহান নেতা সহ সমসাময়িক সকল নেতা সম্পর্কেই চমৎকার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে শুধু আদর্শিক দিকগুলোই তুলে ধরেছেন। সামান্যতম ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বা অশ্রদ্ধা কারো সম্বন্ধে করেননি।

সোহরাওয়ার্দীকে জীবনভর নেতা মেনেছেন কিন্তু বাংলাদেশের অধিকার আদায়ের আন্দোলন প্রশ্নে সোহরাওয়ার্দীর ভুলকেও তিরস্কার করতে বাঁধেননি। শেরে বাংলাকে পাকিস্তান আন্দোলনে পাননি বলে হতাশ ছিলেন কিন্তু দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁকেই যুক্তফ্রন্টের নেতা মানতে বাঁধেননি। দলের প্রথম সভাপতি মওলানা ভাসানীর এলোমেলো সব সিদ্ধান্ত দলকে বিপদে ফেললেও বঙ্গবন্ধু তাঁকেও চিরকাল শ্রদ্ধার আসনেই রেখেছেন।

যুক্তফ্রন্ট নিয়ে অনেক বিভ্রান্তির চমৎকার জবাব এখানে বঙ্গবন্ধু দিয়েছেন। যুক্তফ্রন্ট না করেও আওয়ামী লীগ ৫৪ এর নির্বাচনেই এককভাবে ভোটে জিতে একক দলীয় সরকার গড়তে পারতো। তাতে বাংলাদেশ সৃষ্টির যাত্রা হয়তো আরো সংক্ষিপ্ত হতে পারতো। এরকম সুখপাঠ্য ইতিহাস আর খুবই বাংলা ভাষায় লেখা হয়েছে।

এর বাইরে কারাগারে থাকা অবস্থায় লেখা বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি ডায়েরি "কারাগারের রোজনামচা" নামে প্রকাশ পেয়েছে, যার প্রথমটির শিরোনাম, "থালাবাটি কম্বল, জেলখানার সম্বল।" আক্ষরিক অর্থেই এইটুকু সম্বল নিয়েই বছরের পর বছর ক্লান্তিহীনভাবে জেল খেটে গেছেন। বইটি পড়লে মনে হবে, কারাগারে অন্তরীণ বঙ্গবন্ধুর পাশে বসেই বাংলাদেশ সৃষ্টি দেখছেন।

"আমার দেখা নয়াচীন" ১৯৫২ সালে তরুণ বঙ্গবন্ধুর চোখে দেখা মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে দোর্দণ্ড প্রতাপে এগোতে থাকা চীনকে দেখার গল্প। চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই বঙ্গবন্ধুকে বাকশাল গঠনে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। ৭ই মার্চের ভাষণকে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আতুঁরঘর বিবেচনা করলে, বাকশালের অভ্যুদয়ক্ষণে ৭৫ এর ১৯শে জুন বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যকে তুলনা করতে হবে আধুনিক বাংলাদেশ তৈরির দলিল হিসেবে। অথচ বাকশালকে ঘিরে যতটুকু অপপ্রচার হয়, এর প্রাসংগিকতা নিয়ে তার ছিঁটেফোঁটা আলোচনাতেও অনেকের আগ্রহ নেই। ২৩ বছর আগে দেখা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সাফল্য বঙ্গবন্ধুর বাকশাল গঠনে কতটুকু প্রভাব রেখেছিল সেটা এই বই পড়লে জানা যায়।

জীবিত বঙ্গবন্ধু যেমন আওয়ামী লীগের জন্য, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বেশি করেছেন; তেমনি এই তিনটি বইয়ের মাধ্যমে লোকান্তরে থাকা বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশের ইতিহাস বলাতেও সবচেয়ে বড় ভারটুকু কাঁধে তুলে নিয়েছেন। দুঃখবোধ শুধু এটুকুই জাগবে যে, স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার কাজে আত্মমগ্ন বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-৭৫ সময়ে নীলকন্ঠের মতো ব্যাথা সয়ে কাজ করে গেছেন, কিন্তু লিখতে পারেননি আর কিছুই।

পিতা তোমায় সালাম।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত