০৯ জুন, ২০২৬ ০৬:৩১ পিএম

বিরোধীদলের আট লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার 'ছায়া বাজেট' পেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অগ্রাধিকার

বিরোধীদলের আট লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকার 'ছায়া বাজেট' পেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অগ্রাধিকার
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আট লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার ‘ছায়া বাজেট প্রস্তাবনা’ পেশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এই বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি রয়েছে এক লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত এই বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি ইমাম-মুয়াজ্জিন ভাতা, শিক্ষায় করছাড় এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (৯ জুন) রাজধানীর মগবাজারের আল ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত ‘জনমুখী বাজেট ২০২৬-২০২৭ প্রস্তাবনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এই ছায়া বাজেট পেশ করেন ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা সাইফুল আলম খান মিলন।

বাজেটের মৌলিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে মানবসম্পদ ও অবকাঠামো উন্নয়নকে। খাতভিত্তিক বরাদ্দে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ১,২৫,৫৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা মোট বাজেটের প্রায় ১৪.৯৬ শতাংশ। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৫,২৪০ কোটি টাকা (৫.৩৯%), পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ৬৫,৩৪০ কোটি টাকা (৭.৭৮%), সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ৪৮,১৫০ কোটি টাকা (৫.৭৪%), জনপ্রশাসন ও সরকারি খাতে ২,০২,২৪৫ কোটি টাকা (২৪.০৯%), প্রতিরক্ষা খাতে ৪৩,৪৬২ কোটি টাকা (৫.১৮%), কৃষি খাতে ৫১,৬৭০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৪,৯৫০ কোটি টাকা, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে ৪৫,২২০ কোটি টাকা (৫.৩৯%), শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে ৩৪,৪৫৭ কোটি টাকা (৪.১০%), গৃহায়ন খাতে ৫,০৭৮ কোটি টাকা, শিল্প ও বাণিজ্য খাতে ৫,২৪৬ কোটি টাকা এবং বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্মের জন্য ৬,৬৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সুদ পরিশোধের জন্য ১,২৭,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা মোট বাজেটের ১৫.১৯ শতাংশ।

ছায়া বাজেট অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েই সংসদে গিয়েছিলাম। দুটি ভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু তারা একটি শপথ নিলেন আরেকটি নিলেন না। গণভোটকে তারা অস্বীকার করলেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যদি এভাবেই জনগণকে ধোঁকা দেয়, তাহলে রাজনৈতিক দলের ওপর মানুষের আস্থা থাকবে কীভাবে?

তিনি আরও বলেন, ‘দুই-তৃতীয়াংশের জোরে সরকার আমাদের দাবি অগ্রাহ্য করে জনগণকে অপমান করেছে। গণভোটের রায় ব্যর্থ হওয়ার দলিল কোথাও নেই। এবারই প্রথম বিপত্তি ঘটলো। আমরা যে আশঙ্কা করেছিলাম, এখন তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সমাজে। আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক, সাংবাদিক সমস্ত জায়গায় আজকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ স্পষ্ট। সমাজের অপরাধী লোকদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসিয়ে দেয়া হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বাজেট কোনো দলের জন্য দিচ্ছি না, এই বাজেট ১৮ বা ২০ কোটি মানুষের। আমরা যে প্রস্তাবনা জনগণের সামনে পেশ করবো এটার শর্ত আছে। সততা, স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতা থাকলে এটা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা আর একাউন্টটিবিলিটি না থাকলে যে বাজেট সরকার দেবে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।’

বাজেটের আকার ও রূপরেখা নিয়ে সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন তার উপস্থাপনায় জানান, প্রস্তাবিত এই ছায়া বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে আট লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৬৫ হাজার ৯২৬ কোটি টাকা। বাজেটে সামগ্রিক ঘাটতি ধরা হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ।

বিকল্প এই বাজেটের মূল দর্শন হিসেবে তিনি সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদায় অভিষিক্ত আধুনিক ইসলামভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা তুলে ধরেন।

বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলের সমালোচনা করে সাইফুল আলম বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলে ব্যাংকব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশ থেকে ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনাই হবে বাজেট ঘাটতি মেটানোর অন্যতম উপায়।

সাইফুল আলম বলেন, জামায়াতে ইসলামীর বাজেট প্রস্তাবনায় এনআইডিই হবে টিন। করজাল সম্প্রসারণের জন্য আলাদা টিন নম্বরের পরিবর্তে জাতীয় পরিচয়পত্রকেই ‘বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ বা ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি নম্বর প্রবর্তনের কথাও বলা হয়।

করমুক্ত আয়সীমা ও করছাড় বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যক্তিখাতে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে চার লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি করদাতাদের সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বাবদ বছরে ৫০ হাজার টাকা এবং পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথাপিছু আরও ৫০ হাজার টাকা কর রেয়াতের প্রস্তাব করা হয়েছে।

জামায়াতের এই নেতা বলেন, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির ভাতা ৬৫০-৯০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে প্রাথমিকভাবে এক হাজার টাকা এবং পর্যায়ক্রমে তিন হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।

ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য ভাতা বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের সব মসজিদের ইমামদের মাসিক সাত হাজার ৫০০ টাকা, মুয়াজ্জিনদের পাঁচ হাজার টাকা এবং খাদেমদের তিন হাজার টাকা করে সম্মানি ভাতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য ১০০ শতাংশ এবং ১ম থেকে ৯ম গ্রেডের কর্মকর্তাদের জন্য ৮০ শতাংশ বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

বিনামূল্যে মাতৃত্বকালীন চিকিৎসাসেবার বিষয়ে তিনি বলেন, সন্তানসম্ভবা হওয়ার শুরু থেকে সব মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন দুই বছর বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

শিক্ষা খাতে জোর ও মাদ্রাসা সরকারিকরণ বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষাকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা সরকারিকরণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘বিগত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে কেবল জিডিপির সংখ্যাগত উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু জনগণের প্রকৃত জীবনমানের কোনো উন্নয়ন হয়নি। ’২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা নতুন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাজেটের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক নয়, বরং সুশাসন, জবাবদিহিতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতানির্ভর। আমরা অর্থনীতিতে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও অদক্ষতা দূর করে স্বচ্ছতা ও ন্যায়ভিত্তিক সম্পদ বণ্টনের মাধ্যমে একটি প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির কাঠামো দাঁড় করাতে চাই।’

অনুষ্ঠানে জামায়াতের এই নেতা জানান, জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে জনগণের কাছে নিজেদের কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ভাবনা তুলে ধরতেই তাদের এই বিকল্প বাজেট প্রস্তাবনা।’

‘আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ভিশন হলো ২০৪৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের অবস্থান উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে পৌঁছানো। আমরা চাই, দেশের প্রবৃদ্ধি হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক, যেখানে ১৮ কোটি মানুষের এই দেশ সাম্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করে একটি ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে। এই বাজেট শতভাগ জনমুখী এবং এর মূল ভিত্তি হচ্ছে সুশাসন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ এবং সাধারণ মানুষের উপর করের বোঝা কমানো’—বলেন তিনি। 

বর্তমানে দেশের অর্থনীতি চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকায়, যা মূলত বিগত সরকারের রেখে যাওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট এবং সীমাহীন দুর্নীতির কারণে প্রভাবিত হয়েছে। শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে দেশ থেকে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই সংকট উত্তরণে আমরা পাচারকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং এনবিআর ও দুদক সংস্কারের মাধ্যমে অর্থনীতিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

তিনি বলেন, ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আমরা আট লাখ ৩৯,৫০৫ কোটি টাকার একটি বাস্তবসম্মত বাজেট প্রস্তাব করছি, যা জিডিপির ১২.১৪ শতাংশ। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের মাধ্যমে ছয় লাখ ৬৫,৯২৬ কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর থেকে আশা করা হচ্ছে পাঁচ লাখ ৭৩,৯২৬ কোটি টাকা, অন্যান্য কর থেকে ২২ হাজার কোটি টাকা এবং কর বহির্ভূত আয় থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ৬৭ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক উৎস এবং এক লাখ ৩২৯ কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেওয়া হবে।’

এ ছাড়াও দশম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন প্রথম বছরেই ১০০ ভাগ বৃদ্ধি দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই বাজেট দেশের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অনুযায়ী সুশাসন, কর্মসংস্থান, মানবসম্পদ উন্নয়ন, অবকাঠামো এবং সামাজিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে ২০৫০ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রের কাতারে পৌঁছে দেওয়ার ভিত্তি তৈরি করা হবে।

অনুষ্ঠানে চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ ১১ দলীয় অন্যান্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এমআই/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
চিকিৎসকদের ওপর হামলা স্বাস্থ্যখাতের জন্য কতটা অশনি সংকেত?
ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা

চিকিৎসকদের ওপর হামলা স্বাস্থ্যখাতের জন্য কতটা অশনি সংকেত?

ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু নাকি কাঠামোগত দুর্বলতা

চিকিৎসকদের ওপর হামলা স্বাস্থ্যখাতের জন্য কতটা অশনি সংকেত?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক