ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম

ড. খোন্দকার মেহেদী আকরাম

এমবিবিএস, এমএসসি, পিএইচডি,

সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, শেফিল্ড ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য।


০৫ অগাস্ট, ২০২০ ১১:২৪ এএম

পর্যাপ্ত টেস্ট ছাড়া করোনা মোকাবেলার চিন্তা চোখ বন্ধ করে মহাসড়কে হাঁটার শামিল

পর্যাপ্ত টেস্ট ছাড়া করোনা মোকাবেলার চিন্তা চোখ বন্ধ করে মহাসড়কে হাঁটার শামিল

করোনা শনাক্তকরণের পরীক্ষা করার কথা বললে ইদানীং আমাদের ভেতরে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকেই করোনা পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে ছোট করে দেখছেন। অনেকে বলছেন করোনা পরীক্ষা করে লাভ কী? করোনা টেস্ট করে তো আর এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে না!

বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাবের আজ প্রায় ৫ মাস। গতকাল মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ৩ হাজার ২৩৪ জন। ১৬ কোটির এই দেশে ৫ মাসে মৃতের এই সংখ্যাটা হয়তো তেমন একটা বেশি না। করোনাতে পৃথিবীতে গড় মৃত্যুহার যেখানে শতকরা ৪ ভাগ, সেখানে আমাদের দেশে কোনো এক অলৌকিক কারণে মৃত্যুহার মাত্র শতকরা ১.৩ ভাগ। আর সম্ভবত এ কারণেই আজ আমরা ভুলতে বসেছি যে আমরা আসলে এখন করোনা মহামারীর পিক সময়টাতে অবস্থান করছি অথবা ভয়ঙ্কর সময়ের দিকে ধাবিত হচ্ছি। 

চলতি বছরের জানুয়ারী থেকে শুরু হওয়া মহামারীতে গোটা বিশ্বে করোনায় প্রাণ গেছে ৭ লক্ষের উপরে। ইউরোপ আমেরিকার কথা না হয় বাদই দিলাম। ভৌগলিক এবং জলবায়ুগত দিক দিয়ে ওসব দেশ আমাদের থেকে আলাদা। এসব দেশের মানুষও আমাদের থেকে আলাদা। অনেকে বলে থাকেন করোনা পাশ্চাত্যের লোকদের যেভাবে আক্রান্ত করেছে, আমাদের সেভাবে করবে না। তাদের ধারণা দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের চামড়ার মানুষেরা করোনার বিরুদ্ধে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধী!

পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে এটা এখন নিশ্চিতভাবে বলা যায়, করোনা মহামারীর এপিসেন্টার এখন দক্ষিণ এশিয়ায়। আর এই এপিসেন্টারের প্রধান কেন্দ্র হল আমাদের পড়শী দেশ ভারত। আজ পর্যন্ত ভারতে করোনায় প্রাণ গেছে ৪০ হাজার, আর আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ২০ লক্ষ। প্রতিদিন নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে ৪০-৫০ হাজার করে। বলা যায়, মহামারীর তাণ্ডব বইছে দেশটিতে। ভারতে করোনায় মৃত্যুহার মাত্র শতকরা ২ ভাগ। অপেক্ষাকৃত কম মৃত্যুহারের অযুহাতে ভারত কিন্তু হাত পা গুটিয়ে বসে নেই। তারাও তাদের সর্বশক্তি নিয়ে যুদ্ধে নেমেছে করোনা দমনে। কারণ তারা ভাল করেই জানে, ১৩৮ কোটি লোকের দেশে ২% হারে মৃত্যু হলে সর্বসাকুল্যে মোট মৃতের সংখ্যাটি হবে অনেক বড়।

৩১ জুলাইয়ের উপাত্ত অনুযায়ী দেখা যায়, বর্তমান সময়ে প্রতিদিন করোনা টেস্টের দিক দিয়ে বিশ্বে ভারত রয়েছে দ্বিতিয় অবস্থানে। যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে সবার উপরে। ওই দিন ভারত মোট পরীক্ষা করেছে ৬ লক্ষ ৪০ হাজার এবং যুক্তরাষ্ট্র করেছে ৭ লক্ষ টেস্ট। আর বাংলাদেশ? তারা ওই দিন টেস্ট করেছে মাত্র ১২ হাজার ৯শ’! ভারত ক্রমবর্ধমান হারে তাদের টেস্ট করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। মে মাসে তারা গড়ে প্রতিদিন টেস্ট করেছে ১ লক্ষের উপরে। জুনে এই সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ। জুলাই থেকে আজ পর্যন্ত তারা গড়ে প্রতিদিন টেস্ট করেছে ৪ লক্ষ। আর বাংলাদেশে গত তিন মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে করোনা পরীক্ষা হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার! এপ্রিল থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের টেস্ট করার সক্ষমতা এক চুলও বাড়েনি! কেন? টেস্টের কি তাহলে কোন প্রয়োজন নেই? আর যদি টেস্টের প্রয়োজনীয়তা নাই থাকে তাহলে এত পয়সা খরচ করে ভারত কেন প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ টেস্ট করবে?

আসলে করোনার মতো ভয়াবহ মহামারী মোকাবেলায় টেস্ট এবং ট্রেসই সবচেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি। এই বিষয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোন দ্বিমত নেই। শুধুমাত্র চিকিৎসা দিয়ে করোনা মহামারী মোকাবেলা সম্ভব নয়। মহামারী মোকাবেলার জন্য দরকার ইনফেকশন কন্ট্রোল। সংক্রমণ প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকরী পন্থা। আর এই সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্য দরকার সংক্রমণ শনাক্তকরণ। পর্যাপ্ত টেস্টের মাধ্যমেই শুধুমাত্র এটা করা সম্ভব।

পর্যাপ্ত এবং পরিকল্পিত টেস্টের মাধ্যমে জানা যায়:
১. একটা দেশের সমক্রমণ কোন গতিতে আগাচ্ছে,
২. দেশটির কোন অঞ্চল কি পরিমাণ আক্রান্ত,
৩. আক্রান্তের হার, ডাব্লিং টাইম এবং জনসংখ্যার ভিত্তিতে রোগ বিস্তারের সম্ভাব্য প্রকৃতি,
৪. টেস্টিং এবং ট্রেসিংয়ের মাধ্যমে আইসোলেশন ও কোয়ারেন্টাইন এবং 
৫. সম্ভাব্য চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং টিকার প্রয়োজনীয়তা।

উপরের এই পাঁচটি বিষয়ে সম্মক ধারনা ছাড়া কখনই সুষ্ঠুভাবে একটা মহামারী মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। আর এই কারণেই ভারতসহ পৃথিবীর সব দেশ করোনা টেস্টের দিকে এতটা নজর দিচ্ছে। পর্যাপ্ত টেস্ট ছাড়া করোনা মোকাবেলা করা আর চোখ বন্ধ করে ব্যস্ত মহাসড়কে হাঁটা অনেকটা একই রকম ঝুঁকিপূর্ণ! গতকাল (৩ আগস্ট) স্বাস্থ্য বুলেটিনে জানতে পারলাম, বাংলাদেশে ১০০টি টেস্টের মধ্যে ৩২ জনেরই পজিটিভ আসছে! এখন একবার ভাবুন, যদি আমরা দিনে ১ লক্ষ টেস্ট করতাম, কত জন নতুন রোগী শনাক্ত করতে পারতাম? করোনা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে এখন দরকার প্রতিদিনের টেস্টের সংখ্যা অন্তত ১০ গুণ বাড়ানো। ভারত যদি পারে তাহলে আমরা কেন পারবো না?

মেডিভয়েস এর জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্ট গুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : করোনাভাইরাস
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি