২৮ জুলাই, ২০২০ ০৪:১৬ পিএম

ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সে অভিন্ন ভর্তি ফি নির্ধারণের দাবি 

ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সে অভিন্ন ভর্তি ফি নির্ধারণের দাবি 

মো. মনির উদ্দিন: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সহ (বিএসএমএমইউ) দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজগুলোতে চলমান ডিপ্লোমা কোর্সগুলোর ভর্তি ফিতে রয়েছে বিস্তর ফারাক। কোনো কোনো সরকারি মেডিকেলে দুই বছরের এ কোর্সে ভর্তি ফি ধরা আছে ১০ হাজার টাকা, আবার কোথাও প্রায় অর্ধলক্ষ টাকা। অন্যদিকে বেসরকারি মেডিকেলের চিকিৎসকদের প্রায় পৌনে এক লাখ থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত গুণতে হয়।

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক ও বৈষম্যমূলক এ ফি পরিশোধ করতে গিয়ে সবেমাত্র গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা তরুণ অনেক চিকিৎসককে হতে হয় ঋণের মুখোমুখি। এফসিপিএস-রেসিডেন্টের মতো এ কোর্সে ভাতার ব্যবস্থা না থাকা এবং কোর্স চলাকীন প্রাইভেট প্রাকটিস বিধিবহির্ভূত হওয়ায় এ ঋণ পরিশোধ উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি তাঁদের জন্য হয়ে দাঁড়ায় আরেকটি উদ্বেগের কারণ। বাড়তি এ মানসিক চাপ তাদের জীবনকে অনেকখানি প্রভাবিত করে।

তাই মারাত্মক এ বৈষম্য ঘোচাতে এ বিষয়ে সংশিষ্টদের আন্তরিক বিবেচনার পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন চিকিৎসকরা। 

কোর্স ফির বৈষম্যের ব্যাপারে অন্ধকারে বিএসএমএমইউ

একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম ফি নেওয়ার ব্যাপারে অবগত নয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) কর্তৃপক্ষ। জানতে চাইলে বিএসএমএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া মেডিভয়েসকে বলেন, ‘একেক প্রতিষ্ঠান একেক রকম ফি নিচ্ছে, এ বিষয়টি তো আমাদের অবগত করতে হবে। আমরা না জানলে কিভাবে ব্যবস্থা নেবো? আমরা তো কেন্দ্রীয়ভাবে ফি’সহ সব কিছু কমিয়ে দিয়েছি। আমি দায়িত্বে আসার পর রেসিডেন্টদের ভর্তি ফি, পরীক্ষা ফি, কোর্স ফি কমালাম। আগের চেয়ে অনেক কমানো হয়েছে। এফসিপিএস’র কোর্স ফিও কমানো হয়েছে। এটা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স না তারপরও কমিয়ে দিয়েছি। কিন্তু ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকদের ভর্তি ফি একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম নেওয়া হচ্ছে—এ বিষয়টি যদি আমাদের নলেজে আসে তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো। আমাদের কোনো প্রার্থী তো এ রকম কিছু বলেনি! আমরা এ বিষয়ে জানলে সংশ্লিষ্ট ইনস্টিটিউটে বলতে পারি বিষয়টি সমতায় আনার জন্য।’

প্রাইভেট কোনো প্রতিষ্ঠানে লক্ষাধিক টাকাও নেওয়া হয়—এমন তথ্যে বিস্ময় প্রকাশ করে বিএসএমএমইউ উপাচার্য বলেন, ‘তাই নাকি? এটা তো আমাদের নলেজে নাই। এমন হলে আমরা এসব কোর্স বন্ধ করে দেবো। আমরা চাই উচ্চশিক্ষা বিস্তার ঘটুক। আমাদের ভাষ্য তাই। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি অস্বাভাবিকভাবে বেশি ফি নেয়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নেবো।’ 

এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ দপ্তর ও প্রোভিসির (শিক্ষা) দপ্তর বিষয়টি দেখে। বিষয়টি আমি তাদের নজরে আনছি। কোনো প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করে থাকলে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। তারা প্রয়োজনে বিষয়টি উপাচার্যের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবেন।’    

একই নিয়ম চলছে ১৭ বছর ধরে 

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. খান মো. আবুল কালাম আজাদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এমবিবিএসে ভর্তির সময় একেক মেডিকেলে একেক রকম ফি নেয়, এটাও একেক রকম হয়েছে। এ ব্যাপারে ঢাকা মেডিকেল কলেজ অর্থ মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের যৌথ নিয়মের মধ্য দিয়ে যায়, যা ২০০৩ সাল থেকে চলে আসছে। অর্থাৎ গত ১৭ বছর ধরে একই রকম চলছে। এ নিয়ে আমরা কাজ করবো। আসলে নন-রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে যখন ছাত্র ভর্তি হতো, তখন এগুলো সরকারি হিসেবে আসতো। তখন সরকারি-বেসরকারি প্রার্থী সরকারই ঠিক করে দিতো। এবার ছাত্ররা বিষয়টি আমাদের অবগত করলে আমরা পুরনো কাগজ ঘেঁটে দেখলাম, ওই যে ২০০৩ সাল থেকে চলছে তা এভাবেই আছে। এর মধ্যে এ নিয়ে আর কথা হয়নি। এবার যেহেতু কথা উঠেছে, আমাদের দেখতে হবে।’

একই প্রশ্নে উত্তীর্ণ হয়ে একেকজন একেক প্রতিষ্ঠানে একেক রকম ফিতে ভর্তি হওয়াটাকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘একই দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে এটা হতে পারে না। এজন্য আমাদের কাজ করতে হবে। ঢাকা মেডিকেলে একজন ছাত্র এমবিবিএসে ভর্তির সুযোগ পেলে ১০ হাজার টাকায় তার পড়াশোনার জীবন শেষ হয়। কিন্তু বেসরকারিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০-২৫ লাখ টাকা লেগে যায়। কত পার্থক্য! এ দুয়ের মধ্যে একটি বৈষম্য তো আছেই। তার পরও বেসরকারি মেডিকেলে কিন্তু সিট খালি থাকে না। আমাদের কথা হলো, সুষম হোক। এখানে ডিপ্লোমা কোর্সের টাকা সেটা সরকারকে দিয়ে দেওয়া হয়। আমরা চাই, একটা ছাত্র যেন কম পয়সায় পড়তে পারে। পাশাপাশি উল্টো যদি স্কলারশিপ দেওয়ার সুযোগ থাকতো তাহলে সেই ব্যবস্থা করতাম। যে কোনো শিক্ষার্থী আমার নিজের ছেলের মতো। তাকে যতটুকু সুবিধা দেওয়া যায় তা দেবো। এটা নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব সচিব মহোদয়ের সঙ্গে বসবো। আমরা মনে করি, যে কোনো পোস্ট গ্রাজুয়েট কোর্স ফিতে সমতা থাকা উচিত।’ 

অভিন্ন ‘যৌক্তিক ফি’ নির্ধারণের দাবি বিএমএ’র 

প্রতিষ্ঠান ভেদে কোর্স ফির ভিন্নতা নিয়ে বাংলাদেশ মেডিক্যাল এসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. মো. ইহতেশামুল হক চৌধুরী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ভর্তি ফি থাকবে, এটা নিয়ে কোনো কথা নাই। যে কোনো পরীক্ষা বা কোনো কোর্সের জন্য ফি নির্ধারণ করা থাকে। শুধু ফি’র তারতম্য হওয়াটা সমীচীন নয়। এখন শিক্ষার্থীরা কোথাও কাজ করে নাকি বাড়ি থেকে ফি এনে দেবে, সেটা অন্য বিষয়। ফির তারতম্য ও প্রতিষ্ঠান ভেদে ফিতে বৈষম্য—এটা কাম্য না। আসলে এগুলো সমতায় আনা উচিত। এটা তো পণ্য না, যে একজন দুই টাকা লাভ করবে, আরেকজন পাঁচ টাকা লাভ করবে। একজন শিক্ষার্থীর কোর্স করতে গিয়ে যতটুকু খরচ হবে সেই খরচের একটা স্ট্যান্ডার্ড ধরে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত যে—প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বোচ্চ এতো টাকা নিতে পারবে। অথবা সব প্রতিষ্ঠানের ফি এক রকম হয়ে যাবে। ঢাকা মেডিকেল কলেজে যা, সিলেট মেডিকেল কলেজে তা এবং বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়েও তা। এমন না থাকা কোনোভাবেই কাম্য না। ফির তারতম্য এবং অস্বাভাবিক ফি—কোনোটাই উচিত না। একটি যৌক্তিক ফি নেওয়া যেতে পারে। পরীক্ষার আয়োজন, পুরো কোর্স চালাতে গিয়ে কত খরচ হবে তার একটি যৌক্তিক খরচ নির্ধারণ হওয়া জরুরি।’ 

ফি কমানোর দাবি বিডিএফ’র 

চিকিৎসকদের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ ডক্টর ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) প্রধান সমন্বয়ক ডা. নিরুপম দাস মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডিপ্লোমায় ভর্তিতে এক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আরেক প্রতিষ্ঠানের টাকার এতো পার্থক্য থাকবে কেন? এটা কেন কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না? এ কোর্সে বিএসএমএমইউর অধীনে ভর্তি চলছে। তারা কেন সব প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি অংক নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না?’ 

তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের স্পষ্ট কথা হচ্ছে, এ ফি কমাতে হবে। সেই সঙ্গে সকল প্রতিষ্ঠানে একই ভর্তি ফি নির্ধারণ করে দিতে হবে।’

মেডিভয়েস এর জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্ট গুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : ডিপ্লোমা
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি