৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:৪৪ পিএম

ছেলে ও মেয়েদের মস্তিষ্কের গঠন কি আলাদা? যা বলছে গবেষণা

ছেলে ও মেয়েদের মস্তিষ্কের গঠন কি আলাদা? যা বলছে গবেষণা
ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিশ্বের সবখানে ছেলে ও মেয়ে শিশুর মস্তিষ্কের গঠনে জন্মের পরপরই কিছু পার্থক্য দেখা যায়। আবার মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক সংযোগেও নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। দুটি পৃথক গবেষণায় উঠে এসেছে এমন তথ্য।

নারী ও পুরুষের মস্তিষ্ক কি জন্ম থেকেই আলাদা? মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায়ও কি তাদের মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করে? সাম্প্রতিক দুটি গবেষণায় এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা নবজাতকের মস্তিষ্কের গঠন বিশ্লেষণ করে লিঙ্গভেদে কিছু গড় পার্থক্য পেয়েছেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক সংযোগে পুরুষ ও স্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য শনাক্ত করেছেন।

জন্মের সময়ই মস্তিষ্কের গঠনে পার্থক্য

ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম রিসার্চ সেন্টারের গবেষকেরা ৫১৪ জন নবজাতকের মস্তিষ্কের এমআরআই (MRI) স্ক্যান বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, জন্মের পরপরই ছেলে ও মেয়ে শিশুর মস্তিষ্কের গঠনে কিছু গড় পার্থক্য থাকে। গবেষণায় অংশ নেয়া শিশুদের বয়স ছিল শূন্য থেকে ২৮ দিন।

গবেষণায় দেখা যায়, মেয়ে শিশুদের তুলনায় ছেলে শিশুদের মস্তিষ্কের মোট আয়তন গড়ে বেশি। তবে মস্তিষ্কের মোট আয়তনের পার্থক্য হিসাবের মধ্যে রাখার পর দেখা যায়, মেয়ে শিশুদের মস্তিষ্কে গড়ে বেশি ধূসর পদার্থ (গ্রে ম্যাটার) এবং ছেলে শিশুদের মস্তিষ্কে বেশি শ্বেত পদার্থ (হোয়াইট ম্যাটার) রয়েছে।

ধূসর পদার্থ নিউরনের কোষদেহ ও ডেনড্রাইট দিয়ে গঠিত। অনুভূতি, উপলব্ধি, শেখা, কথা বলা ও চিন্তাভাবনার মতো তথ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং ব্যাখ্যা করার কাজে এটি ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, শ্বেত পদার্থ অ্যাক্সন দিয়ে গঠিত। এসব দীর্ঘ স্নায়ুতন্তু মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের নিউরনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে।

মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অঞ্চল বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা আরও দেখতে পেয়েছেন, মেয়েশিশুদের স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু ধূসর পদার্থের অঞ্চলের আয়তন গড়ে বেশি। অন্যদিকে, ছেলেশিশুদের সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াকরণ ও চলাচল নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু অঞ্চলের আয়তন গড়ে বেশি।

গবেষণাটির নেতৃত্ব দেয়া অটিজম রিসার্চ সেন্টারের পিএইচডি শিক্ষার্থী ইউনমাহ খান বলেন, ‘জন্মের সময় ছেলে ও মেয়ের মস্তিষ্কের মধ্যে পার্থক্য থাকে কি না, আমাদের গবেষণা সেই দীর্ঘদিনের প্রশ্নের মীমাংসা করেছে। আমরা জানি, বড় শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের মস্তিষ্কে পার্থক্য রয়েছে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় দেখা গেছে, জীবনের একেবারে শুরুর দিনগুলোতেই এসব পার্থক্য উপস্থিত থাকে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জন্মের এত অল্প সময়ের মধ্যেই যেহেতু লিঙ্গভেদে এসব পার্থক্য দেখা যায়, তাই এগুলো আংশিকভাবে গর্ভে থাকাকালীন মস্তিষ্কের বিকাশে জৈবিক লিঙ্গগত পার্থক্যের প্রতিফলন হতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসব পার্থক্য পরিবেশগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে মস্তিষ্কে আরও পার্থক্য তৈরি করতে পারে।’

গবেষণাটির তত্ত্বাবধায়ক ড. অ্যালেক্স সোমপানিডিস বলেন, মস্তিষ্কের পার্থক্যগুলো শুধু নারী ও পুরুষের সামগ্রিক শারীরিক আকারের কারণে তৈরি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে গবেষকেরা জন্মের সময় ওজনের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নিয়েছেন। কেন নারী ও পুরুষের মস্তিষ্কে ধূসর ও শ্বেত পদার্থের পরিমাণে পার্থক্য দেখা যায়, তা জানতে তারা এখন গর্ভকালীন পরিবেশ, হরমোন ও প্লাসেন্টার ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করছেন।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, এসব পার্থক্য গড়পড়তা। সব ছেলে বা সব মেয়ের ক্ষেত্রে একই বৈশিষ্ট্য দেখা যায় না। দুই দলের মধ্যেই ব্যক্তিভেদে অনেক বৈচিত্র্য রয়েছে এবং তাদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে যথেষ্ট মিলও আছে। গবেষকদের মতে, এসব পার্থক্যের অর্থ কোনো এক দলের মস্তিষ্ক অন্য দলের চেয়ে ভালো বা খারাপ নয়।

মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণেও স্নায়বিক পার্থক্য

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির (সিএসইউ) গবেষকেরা পুরুষ ও স্ত্রী ইঁদুরের মস্তিষ্কে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়বিক সংযোগ নিয়ে গবেষণা করেছেন। এতে দেখা গেছে, এই সংযোগের গঠন ও সংকেত আদান-প্রদানের প্রক্রিয়ায় তাদের মধ্যে বেশ কিছু পার্থক্য রয়েছে।

গবেষণাটি পরিচালনা করেছে বায়োমেডিকেল সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ব্রেন্ট মায়ার্সের গবেষণাগার। গবেষকেরা প্রিফ্রন্টাল-হাইপোথ্যালামিক স্নায়বিক সংযোগের বহির্গামী অংশের নির্দিষ্ট কিছু নিউরন নিয়ে পরীক্ষা করেন। মস্তিষ্কের এই সংযোগ শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ও মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে।

গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, পুরুষ ও স্ত্রী ইঁদুরের ক্ষেত্রে স্নায়বিক সংযোগের সামগ্রিক বিন্যাস, এক অংশ থেকে অন্য অংশে সংকেত পাঠানো নিউরনের সংখ্যা এবং নিউরনগুলো কোন ধরনের কোষকে লক্ষ্য করে সংকেত পাঠায়, সেসব ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে।

এ ছাড়া নিউরনগুলো কতটা সহজে সক্রিয় হয়, সেটিও দুই দলের মধ্যে ভিন্ন। স্ত্রী ইঁদুরের ক্ষেত্রে ঋতুচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের ওপর নির্ভর করে নিউরন সক্রিয় হওয়ার প্রবণতায় পরিবর্তন দেখা গেছে। এর প্রভাব মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়ায় পড়তে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

এর আগে মায়ার্সের গবেষণাগারের এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, প্রিফ্রন্টাল-হাইপোথ্যালামিক স্নায়বিক সংযোগ সক্রিয় হলে পুরুষ ইঁদুরের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া কমে যায়। তবে স্ত্রী ইঁদুরের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া যায়নি। বরং কিছু ক্ষেত্রে তাদের মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া বেড়ে যায়।

গবেষণাটির প্রধান লেখক কোর্টনি বুশে বলেন, ‘এই গবেষণা উৎসাহব্যঞ্জক। কারণ, আমরা জানি মেজাজজনিত রোগের সঙ্গে হৃদ্‌রোগের সহাবস্থান রয়েছে। এই দুই ধরনের রোগের যোগসূত্র মস্তিষ্কের কোথায় তৈরি হতে পারে, তা নিয়ে এই গবেষণাগার গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই স্নায়বিক সংযোগ কীভাবে কাজ করে, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপে কীভাবে পরিবর্তিত হয় এবং নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে কীভাবে ভিন্ন, তা বোঝা হৃদ্‌রোগ, মেজাজজনিত রোগ এবং নারীদের মধ্যে বেশি দেখা যায় এমন সহাবস্থানকারী রোগ সম্পর্কে আমাদের ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।’

গবেষকেরা এখন অনুসন্ধান করছেন, পুরুষ ও স্ত্রী ইঁদুরের ক্ষেত্রে এই স্নায়বিক সংযোগ কেন ভিন্নভাবে কাজ করে এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপের প্রতি তাদের ভিন্ন প্রতিক্রিয়ার পেছনে কী কারণ রয়েছে। গবেষণাটি দ্য জার্নাল অব নিউরোসায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

এমআই/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।