আগাম প্রস্তুতি ও পূর্বাভাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমেছে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, রোগের পূর্বাভাস বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করায় মৃত্যুহার কমেছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এম এ মুহিত। তিনি বলেন, ডেঙ্গুর তথ্য বিশ্লেষণ করে আগেভাগে পরিকল্পনা গ্রহণ এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার সুফল পাওয়া যাচ্ছে।
আজ বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক ইন সেন্টারে নলেজ হাব ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সহনশীলতা’ শীর্ষক এক পলিসি ডায়ালগে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যগত প্রভাব’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন নলেজ হাবের প্রেসিডেন্ট খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুর পূর্বাভাস ও সংশ্লিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে জুলাই-আগস্ট থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও স্যালাইনের সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি আগাম জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়েছে। শুধু রোগীদের চিকিৎসা নয়, নীতিনির্ধারকদের জন্যও আগাম সতর্কতা গুরুত্বপূর্ণ। আগে থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য প্রস্তুতি যথাসময়ে নেওয়া যায়।
নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি, চিকিৎসা নিতে দেরি
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণের কথা তুলে ধরে এম এ মুহিত বলেন, পুরুষের তুলনায় নারীদের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। এর পেছনে চিকিৎসাগত কারণের পাশাপাশি সামাজিক কারণও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের অসুস্থতাকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অনেক রোগী অসুস্থ হওয়ার তিন দিনের বেশি সময় পর হাসপাতালে এসেছেন। দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছানোর কারণে রোগীর শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি ঘটে এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে পড়ে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, পুরুষ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার প্রবণতা থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অসুস্থতাকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ ধরনের সামাজিক আচরণ পরিবর্তনে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
ডেঙ্গুর পাশাপাশি তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতার তাগিদ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট তাপপ্রবাহ ও আর্দ্রতার স্বাস্থ্যগত প্রভাব মোকাবিলায়ও কার্যকর আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি আবহাওয়া অধিদপ্তর, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
স্বাস্থ্য খাতের বিদ্যমান তথ্য আরও কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করে নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, নারী, শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও প্রতিবন্ধীদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হবে। ডেঙ্গু ও তাপপ্রবাহের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকিতে এসব জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
প্রতিমন্ত্রী গবেষক ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ছয় থেকে আট মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ তৈরি এবং পরবর্তী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে তা নীতিনির্ধারকদের কাছে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
তিন বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ২ হাজার ৬৯২ জনের
অনুষ্ঠানে উপস্থাপিত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, বাংলাদেশে ডেঙ্গুতে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৭০৫ জন, ২০২৪ সালে ৫৭৫ জন এবং ২০২৫ সালে ৪১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ, এই তিন বছরে ডেঙ্গুতে মোট ২ হাজার ৬৯২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গুরোগীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ঢাকার বাইরের হলেও মোট মৃত্যুর ৫৭ থেকে ৬৪ শতাংশ ঘটে ঢাকা শহরের হাসপাতালগুলোতে। এ চিত্র ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় রোগী শনাক্তকরণ, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিকিৎসাসেবা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে।
এমআর/