দেলোয়ার বিন আব্দুল আজিজ
দেলোয়ার বিন আব্দুল আজিজ
রেজিস্ট্রার্ড নার্স (আর এন)
ডিপ্লোমা ইন কার্ডিয়াক নার্সিং (ডিসিএন)
নার্সিং কর্মকর্তা
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০২:২১ পিএম
নার্সদের পদোন্নতি কাঠামো: উচ্চশিক্ষা, মেধা ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন জরুরি
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় নার্সরা রোগীর শয্যাপাশে থেকে চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতা রক্ষা, রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, সংক্রমণ প্রতিরোধ, স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রদান, গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাস্থ্যসেবার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নার্সিং পেশার শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা ও কর্মপরিধি যেমন বিস্তৃত হয়েছে, তেমনি বেড়েছে উচ্চশিক্ষিত ও গবেষণায় দক্ষ নার্সের সংখ্যা। নার্সিংয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এমনকি পিএইচডি ডিগ্রিধারী পেশাজীবীরাও এখন এ খাতে অবদান রাখছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নার্সদের এই অর্জিত জ্ঞান, দক্ষতা ও গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর জন্য আমাদের পদোন্নতি ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার পরিকল্পনা কতটা কার্যকর? উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পরও যদি একজন নার্সের সামনে দায়িত্ব ও পদমর্যাদায় এগিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকে, তাহলে ব্যক্তির মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন যেমন বাধাগ্রস্ত হয়, তেমনি রাষ্ট্রের বিনিয়োগ থেকেও প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
একজন নার্স সরকারি চাকরিতে যোগদানের পর দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন, মাস্টার্স সম্পন্ন করেন, এমনকি পিএইচডি ডিগ্রিও অর্জন করেন। গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও কর্ম-অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তিনি স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, নার্সিং শিক্ষার বিকাশ, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নীতিনির্ধারণী কাজে অবদান রাখার সক্ষমতা অর্জন করেন। কিন্তু সেই যোগ্যতা কাজে লাগানোর উপযোগী পদ, দায়িত্ব ও পদোন্নতির সুযোগ সীমিত থাকলে তা ব্যক্তিগত হতাশার পাশাপাশি দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অতএব, নার্সদের পদোন্নতির বিষয়টি কেবল পদবি বা বেতন গ্রেড পরিবর্তনের প্রশ্ন নয় বরং এটি জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানবসম্পদ উন্নয়ন, পেশাগত মর্যাদা এবং স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
প্রয়োজন সুস্পষ্ট ও ধারাবাহিক ক্যারিয়ার কাঠামো
নার্সিং পেশায় পদোন্নতি ব্যবস্থার সংস্কারে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত, পদোন্নতির সুস্পষ্ট ধাপ নির্ধারণ করতে হবে। সিনিয়র স্টাফ নার্স থেকে শুরু করে উচ্চতর নার্সিং প্রশাসন, নার্সিং শিক্ষা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী পর্যায় পর্যন্ত যোগ্যতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে একটি সুসংহত ক্যারিয়ার কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। প্রতিটি পদের দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং পদোন্নতির শর্ত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হলে কর্মীদের মধ্যে পেশাগত অগ্রগতির বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে।
দ্বিতীয়ত, জ্যেষ্ঠতা ও মেধার মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।** দীর্ঘদিনের কর্ম-অভিজ্ঞতা একজন নার্সকে বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলা, রোগীর সেবা ব্যবস্থাপনা এবং সহকর্মীদের পরিচালনায় দক্ষ করে তোলে। অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞান, নেতৃত্বের সক্ষমতা, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও পেশাগত উৎকর্ষও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু জ্যেষ্ঠতা অথবা শুধু পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর না করে উভয়ের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মাস্টার্স, পিএইচডি, প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ, প্রকাশিত গবেষণা এবং পেশাগত অভিজ্ঞতাকে সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্যায়নের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। তবে শুধু ডিগ্রি অর্জন করলেই স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতি দেওয়া উচিত—এমন দাবি নয়; বরং ডিগ্রির প্রাসঙ্গিকতা, গবেষণার মান, বাস্তব কর্মদক্ষতা এবং পদের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে যোগ্যতার যথাযথ স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
চতুর্থত, পদোন্নতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পদ সৃষ্টি ও জনবল পরিকল্পনা করতে হবে। কতজন নার্স কোন পদে কর্মরত আছেন, অনুমোদিত ও শূন্য পদের সংখ্যা কত, আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে কতজন অবসরে যাবেন এবং ভবিষ্যতে কতজন দক্ষ প্রশাসক, শিক্ষক ও গবেষক প্রয়োজন হবে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। কেবল পদোন্নতির বিধান তৈরি করলেই হবে না; তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাঠামো, অনুমোদিত পদ ও বাজেটও নিশ্চিত করতে হবে।
৬০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতি, ৪০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ: একটি সম্ভাব্য প্রস্তাব
নার্সিং পেশায় অভিজ্ঞ ও যোগ্য কর্মীদের অগ্রগতির সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন মেধাবীদের আকৃষ্ট করতে নির্দিষ্ট উচ্চতর পদে ৬০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতি এবং ৪০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের একটি কাঠামো বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি কোনো বিদ্যমান সরকারি বিধানের বিবরণ নয়; বরং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার জন্য একটি নীতিগত প্রস্তাব।
এ ক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগ নন-ক্যাডার ব্যবস্থার মাধ্যমে অথবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় নার্সিং পেশাজীবীদের জন্য উপযুক্ত বিসিএস ক্যাডার বা সমমানের নিয়োগব্যবস্থা চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করা যেতে পারে। তবে কোন পদে কোন ব্যবস্থা কার্যকর হবে, তা নির্ধারণের আগে সংশ্লিষ্ট পদের দায়িত্ব, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা, বিদ্যমান জনবল কাঠামো, আর্থিক প্রভাব এবং প্রযোজ্য নিয়োগবিধি পর্যালোচনা করা জরুরি।
বিভাগীয় পদোন্নতির ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা, চাকরির অভিজ্ঞতা, কর্মমূল্যায়ন, প্রাসঙ্গিক উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিভাগীয় পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। পরীক্ষায় নার্সিংবিষয়ক একাডেমিক ও ক্লিনিক্যাল জ্ঞান, প্রশাসনিক দক্ষতা, নেতৃত্ব, পেশাগত নৈতিকতা, সরকারি চাকরির বিধিবিধান এবং প্রাসঙ্গিক সাংবিধানিক জ্ঞান মূল্যায়ন করা যেতে পারে। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রিলিমিনারি, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার সমন্বিত পদ্ধতিও বিবেচনা করা সম্ভব।
তবে এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে মূল্যায়নের স্বচ্ছতা। জ্যেষ্ঠতা, পরীক্ষার নম্বর, উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও কর্মদক্ষতার জন্য কত নম্বর বা কী ধরনের গুরুত্ব নির্ধারিত হবে, তা আগেই স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে ন্যূনতম যোগ্যতা, পরীক্ষার মানদণ্ড, মূল্যায়ন কমিটির দায়িত্ব এবং ফলাফলের বিরুদ্ধে আপিল বা পুনর্বিবেচনার সুযোগ নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এতে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের পরিবর্তে যোগ্যতা ও নির্ধারিত মানদণ্ডের ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
৬০:৪০ অনুপাতটি সব ধরনের উচ্চতর পদের জন্য অভিন্নভাবে প্রযোজ্য হওয়া উচিত কি না, তা তথ্যভিত্তিক পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। নার্সিং প্রশাসন, শিক্ষা, গবেষণা ও ক্লিনিক্যাল নেতৃত্বের পদের দায়িত্ব এক নয়। তাই পদের প্রকৃতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক নিয়োগ ও পদোন্নতি নীতি গ্রহণ অধিক কার্যকর হতে পারে।
এমআর/