কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বস্তাবন্দি, বিঘ্নিত স্বাস্থ্যসেবা
তেরো মাস আটকে আছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট-ফার্মাসিস্টদের ফাইল, থমকে গ্রেড বাস্তবায়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া
জাহিদুল হক: অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে একাধিক চিঠির পরও দীর্ঘ প্রায় ১৩ মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে তা সরবরাহ করা হয়নি। ফলে একদিকে আটকে আছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন, অন্যদিকে ঝুলছে নতুন জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াও।
তবে বহুবিধ কাজের বিপরীতে লোকবল কম থাকায় এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বিলম্ব হচ্ছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এদিকে সংশ্লিষ্টদের কাজের ধীরগতির জন্য ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মাঝে।
মন্ত্রণালয়ের প্রাপ্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের গ্রেড উন্নয়ন ও নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয় এবং ২৯ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের প্রয়োজনীয় তথ্য চেয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে ১৯ জানুয়ারি এবং ২ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়। কিন্তু অধিদপ্তর থেকে দীর্ঘ আট মাসেও কোনো জবাব মেলেনি।
সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখার উপসচিব ইমতিয়াজ হোসেন স্বাক্ষরিত দ্বিতীয় তাগিদপত্রে (তাগিদপত্র-২) বিষয়টি আবারও সামনে আসে, যেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়—অদ্যাবধি তথ্য পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠি থেকে জানা গেছে, এর আগেও ২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের শূন্য পদের নির্ভুল তথ্য নির্ধারিত ছকে এবং পদ সৃজনের মূল আদেশ সংযুক্ত করে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
দীর্ঘ সময় তথ্য না পেয়ে একই বছরের ২৮ অক্টোবর প্রথম দফায় তাগিদ দেওয়া হয়। প্রায় এক বছর ধরে ফাইল চালাচালি হলেও তথ্য না আসায় চলতি বছরের ২২ সেপ্টেম্বর আবার অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে মন্ত্রণালয়। এক বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে সেই কাজ। তথ্য না পাওয়ায় শূন্য পদে ১১তম গ্রেডের সরাসরি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের প্রশাসনিক ছাড়পত্রও আটকে আছে।
খালি পড়ে আছে ৩০৬০ পদ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পরিচালিত সেন্ট্রাল হিউম্যান রিসোর্স ইনফরমেশন সিস্টেমের (এইচআরআইএস) সর্বশেষ হালনাগাদকৃত তথ্যমতে, দীর্ঘ ১৪ বছরেরও অধিক সময় প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতায় নিয়োগ কার্যক্রম কার্যত স্থবির থাকায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের অনুমোদিত মোট পদসংখ্যা পাঁচ হাজার ৯৮৩টির বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র তিন হাজার ৭৮৯ জন; ফলে পদ শূন্য রয়েছে দুই হাজার ১৯৪টি।
একইভাবে ডিপ্লোমা ফার্মাসিস্টদের অনুমোদিত মোট দুই হাজার ৯৬৬টি পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র দুই হাজার ১০০ জন, যেখানে খালি পড়ে আছে ৮৬৬টি পদ।
এইচআরআইএসর তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে মেডিকেলের গুরুত্বপূর্ণ এই দুই শাখায় মোট তিন হাজার ৬০টি পদ শূন্য থাকায় হাসপাতালগুলোতে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অবহেলা ও দ্বৈতনীতির অভিযোগ
অধিদপ্তরের এমন ভূমিকাকে সরাসরি প্রশাসনিক অবহেলা ও দ্বৈতনীতি হিসেবে দেখছেন ভুক্তভোগীরা।
এ প্রসঙ্গে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ফোরামের (এমটিএফ) কেন্দ্রীয় আইটি সম্পাদক মো. মওদুদ আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের ১০ম গ্রেডের ফাইল এক বছরের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আর স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরে অহেতুক আটকে রাখা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় তথ্য চেয়ে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিল, মন্ত্রণালয় দুই দফা চিঠি ও তাগাদা পাঠানোর পরও অধিদপ্তর থেকে কোনো তথ্য পাঠানো হচ্ছে না। কেন এবং কাদের স্বার্থে এই তথ্য আটকে রাখা হয়েছে, তা আজ পুরো স্বাস্থ্য বিভাগের জানতে চাওয়া উচিত।
পেশাজীবীদের চরম সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী, একজন চিকিৎসকের বিপরীতে তিনজন নার্স এবং পাঁচজন মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার বিধান রয়েছে। দেশে চিকিৎসক ও নার্সের আনুপাতিক হারে যেখানে ৮০ হাজারেরও বেশি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট থাকার কথা, সেখানে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত আছেন মাত্র চার হাজারের কিছু বেশি। চিকিৎসকদের তুলনায় এ হার শূন্য দশমিক দুই তিন শতাংশও নয়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, হাসপাতালগুলোতে কোটি কোটি টাকার এক্স-রে, সিটি স্ক্যান বা এমআরআইর মতো আধুনিক যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর বস্তাবন্দি অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে। কোথাও মেশিন সচল থাকলে টেকনোলজিস্ট নেই, আবার টেকনোলজিস্ট থাকলেও প্রয়োজনীয় কিট ও রি-এজেন্ট নেই। সরকারি হাসপাতালে রোগীরা যাতে সুলভ মূল্যে রোগনির্ণয় সেবা না পান এবং বেসরকারি ডায়াগনোস্টিক সেন্টারের কমিশন বাণিজ্য নির্বিঘ্নে চালু রাখা যায়, সেজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একটি সিন্ডিকেট চক্র পরিকল্পিতভাবে এই সংকট জিইয়ে রেখেছে।
আশ্বাসেও মেলেনি সমাধান
এ সংকট ঘোছাতে পূর্ববর্তী কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে মওদুদ আহমেদ বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও আমরা ১১তম গ্রেড থেকে ১০ম গ্রেডে উন্নীতকরণের দাবিতে পূর্ণদিবস কর্মবিরতিতে গিয়েছিলাম। তখন রাজধানীসহ সারাদেশের বড় বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর প্যাথলজি ও রেডিওলজি সেবা বন্ধ হয়ে ব্যাপক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। সে সময় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) আমাদের সুস্পষ্ট আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, আপনারা কর্মবিরতি প্রত্যাহার করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন, আমরা দ্রুত ১০ম গ্রেডের বিষয়টি নিষ্পত্তি করছি।’
কিন্তু তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী দফায় দফায় সব তথ্য ও নথিপত্র প্রস্তুত করে জমা দেওয়া হলেও প্রতিবারই নতুন কোনো অজুহাত বা কৃত্রিম ঘাটতি দেখিয়ে ফাইল ধামাচাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে।
ফের কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি যোগ করেন, সমমানের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নার্সিং, ডিপ্লোমা কৃষিবিদ কিংবা পলিটেকনিক ডিপ্লোমাধারীদের বহু আগেই ১০ম গ্রেড (২য় শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদা) দেওয়া হয়েছে। অথচ স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রাণশক্তি মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের ন্যায্য দাবি বছরের পর বছর লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বন্দি।
‘অবিলম্বে এই তালবাহানা বন্ধ করে ১০ম গ্রেড বাস্তবায়ন ও শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা না হলে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার পাশাপাশি আবারও সর্বাত্মক কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব। তখন রাজধানীর সব সরকারি হাসপাতালের প্যাথলজি, রেডিওলজি, ফিজিওথেরাপি ও ডেন্টালসহ সমস্ত ডায়াগনোস্টিক সেবা বন্ধ রেখে কঠোর কর্মবিরতি ঘোষণা করা হবে, যার সম্পূর্ণ দায়ভার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকেই নিতে হবে।’
যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ রুমী আজ মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) মেডিভয়েসকে বলেন, সারাদেশে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফার্মাসিস্টদের কোথায় কতটি পদ শূন্য রয়েছে, সেই তথ্য জানতে এবং নিয়োগবিধি আপডেট করে পাঠাতে ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
কাজের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, এ সংক্রান্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের আওতা অনেক বড় হওয়ার কারণে কাজের গতিতে কিছুটা ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
অধ্যাপক রুমী আরও বলেন, শূন্যপদের সঠিক তালিকা পাঠাতে সারাদেশে তিন দিনের সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। দাপ্তরিক প্রক্রিয়ায় সেটি হয়তো সর্বোচ্চ সাত দিনের মতো সময় নিতে পারে। এ সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য দ্রুতই সমন্বয় করা হবে।
স্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে যখন শূন্য পদ পূরণ ও পেশাজীবীদের ন্যায্য দাবির নিষ্পত্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন অধিদপ্তরের এমন উদাসীনতা ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য সরাসরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা ও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাপ্রাপ্তির অধিকারকেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এমইউ/
-
২০ ঘন্টা আগে
কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বস্তাবন্দি, বিঘ্নিত স্বাস্থ্যসেবা
তেরো মাস আটকে আছে মেডিকেল টেকনোলজিস্ট-ফার্মাসিস্টদের ফাইল, থমকে গ্রেড বাস্তবায়ন ও নিয়োগ প্রক্রিয়া
-
২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
-
১১ অগাস্ট, ২০২৬
-
৩০ নভেম্বর, ২০২৫
১০ম গ্রেড বাস্তবায়নের দাবি
টেকনোলজিস্ট-ফার্মাসিস্টদের দুই ঘণ্টার কর্মবিরতি
-
২১ জুলাই, ২০২৫
-
২৩ এপ্রিল, ২০২৫
বিশ্ব ল্যাবরেটরি দিবসে দাবি
হাসপাতালগুলোতে ২৪ ঘণ্টা রোগ নির্ণয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে