ওজিএসবির ৩৪তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে বক্তারা
তৃণমূলে নিরাপদ প্রসবে বড় প্রতিবন্ধক জনবল ও অবকাঠামো সংকট
মেডিভয়েস রিপোর্ট: নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও আরও দক্ষ জনবল জরুরি। এখনও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রসব বাড়িতে হওয়ায় জটিল পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে চিকিৎসক, ধাত্রী, অবেদনবিদসহ প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতি, রক্তের ব্যবস্থা, রোগ নির্ণয়ের সুবিধা ও নিবিড় পরিচর্যা সেবার সীমাবদ্ধতা নিরাপদ প্রসবের পথে বড় প্রতিবন্ধক। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রসবের হার বাড়ালেই হবে না; মানসম্মত ও সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য জেলা হাসপাতালগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দক্ষ ধাত্রী ও স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি এবং তাঁদের যথাযথ পদায়নের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত অবসটেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) বার্ষিক সম্মেলন একটি বৈজ্ঞানিক প্রোগ্রাম, যা সংগঠনটির জন্মলগ্ন থেকেই অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ওজিএসবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ৫৩ বছর আগে, আর এ বছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে আমাদের ৩৪তম আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলন।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Shaping the Women’s Health Through Science, Innovation and Leadership।’ প্রতিপাদ্যের আলোকে নারীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন জ্ঞান ও উদ্ভাবন এবং পেশাগত নেতৃত্বের বিভিন্ন দিক নিয়ে সম্মেলনে আলোচনা হয়।
দিনব্যাপী বৈজ্ঞানিক আয়োজনে মোট ১২টি সেশনে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, গবেষক ও শিক্ষাবিদরা অংশগ্রহণ করেন। এসব সেশনে প্রায় ৫৭ জন বক্তা তাঁদের গবেষণার ফলাফল, অভিজ্ঞতা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতি তুলে ধরেন।
সম্মেলনে নবীন ও প্রবীণ প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞরা তাঁদের নিজস্ব গবেষণার ফলাফল উপস্থাপনের পাশাপাশি দেশ-বিদেশের অভিজ্ঞ গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ পান।
ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বক্তাদের আমন্ত্রণ জানানোর মূল উদ্দেশ্য হলো পারস্পরিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়। আমরা তাঁদের কাছ থেকে এমন বিষয় শিখতে চাই, যা আমাদের জানা নেই; একইভাবে তাঁরাও আমাদের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান থেকে কিছু শিখতে পারেন। মূলত জ্ঞান ভাগাভাগি ও পারস্পরিক শিক্ষাই এই সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য। আশা করি, সেই উদ্দেশ্য পূরণে এবারের সম্মেলন সফল হয়েছে।’
সম্মেলনে প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসাপদ্ধতি নিয়ে বৈজ্ঞানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় মাতৃ-ভ্রূণ চিকিৎসাবিজ্ঞান, গাইনিকোলজিক্যাল অনকোলজি, রিপ্রোডাক্টিভ অ্যান্ডোক্রাইনোলজি অ্যান্ড ইনফার্টিলিটিসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অগ্রগতির ওপর।
প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসার মানোন্নয়নে গুরুত্বারোপ
অনুষ্ঠানে ওজিএসবির সভাপতি অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, দ্রুত পরিবর্তনশীল চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে দেশের চিকিৎসকদের আরও সম্পৃক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জ্ঞান, গবেষণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়নে এ ধরনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞদের পারস্পরিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আধুনিক জ্ঞান এবং নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা লাভের সুযোগ তৈরি করে। এর মাধ্যমে মা, নারী, কিশোরী ও নবজাতকের জন্য আরও উন্নত ও আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ইতিবাচক অবদান রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন সংশ্লিষ্টরা।
তরুণ গাইনোকোলজিস্টদের উপস্থাপন দক্ষতার প্রশংসায় জ্যেষ্ঠরা
অধ্যাপক ডা. ফিরোজা বেগম বলেন, ‘আমাদের তরুণ নারী গাইনোকোলজিস্টরাও অত্যন্ত চমৎকার উপস্থাপনা করেছেন। এই ধরনের বৈজ্ঞানিক সেমিনারে তাঁদের বক্তব্য উপস্থাপনের ধরন ও দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়।’
মাতৃমৃত্যু কমাতে ওজিএসবির ভূমিকা
ওজিএসবির সভাপতি বলেন, ‘আমাদের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো মানুষের মধ্যে এখনও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাব। বর্তমানে প্রায় ৩৫ শতাংশ প্রসব বাড়িতে হয়। অথচ বাড়িতে প্রসবের ক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনা বা জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত পরিবহনব্যবস্থা থাকে না। অনেক পরিবারের আর্থিক সক্ষমতাও সীমিত। তাই প্রথমেই প্রয়োজন নারীদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের সচেতন করা। এই সচেতনতা যত বাড়ানো যাবে, তত বেশি মানুষ নিরাপদ প্রসবের জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার বিষয়ে আগ্রহী হবে।’
এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার সাফল্যের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘শ্রীলঙ্কায় প্রতি এক লাখ প্রসবের মধ্যে প্রায় ৮.৭ জন মায়ের মৃত্যু হয়। বিপরীতে বাংলাদেশে এই হার ১৩৬-এর কাছাকাছি। শ্রীলঙ্কা এই অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করার মাধ্যমে। সেখানে প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রসব স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে হয়, যেখানে বাংলাদেশে এই হার প্রায় ৬৫ শতাংশ।’
‘তবে স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে প্রসব নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল ও বেসরকারি ক্লিনিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত জনবল, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, রক্তের ব্যবস্থা এবং প্যাথলজি সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি’—মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক ফিরোজা বলেন, এই সেবাগুলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানুষকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যতদিন স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো ও সক্ষমতা নিশ্চিত না হবে এবং মানুষকে সচেতন ও উৎসাহিত করা না যাবে, ততদিন সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং মা ও নবজাতকের জীবন রক্ষা করা কঠিন হবে।
জেলা-উপজেলায় নারী স্বাস্থ্যসেবার জনবল ও সক্ষমতা
সভায় জানানো হয়, উপজেলা পর্যায়ে এখনও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞের অনেক পদ শূন্য রয়েছে। কোনো কোনো উপজেলায় প্রায় ৫০ শতাংশ পদই খালি। তবে শুধু স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। আমাদের সংগঠনে নিবন্ধিত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৪০০। অনিবন্ধিতদের হিসাব ধরলে মোট সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৫১ শতাংশ নারী। অর্থাৎ পুরুষের তুলনায় নারীর সংখ্যাই বেশি। এই বিপুলসংখ্যক নারীকে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে কর্মক্ষম ও সুস্থ রাখতে পারলে শুধু তাঁদের জীবন রক্ষা হবে না, দেশের অর্থনীতিতেও এর বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
‘বর্তমানে যে সংখ্যক স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন, তা একেবারে অপ্রতুল নয়। তবে নারীর সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা শুধু স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। উন্নত দেশগুলোতে প্রসবসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ধাত্রীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা দিয়ে থাকেন।’
প্রসবসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আমাদের বিপুলসংখ্যক ধাত্রী নিয়োগ করতে হবে। ধাত্রীরা প্রসবের সময় দীর্ঘ সময় ধরে একজন মাকে পর্যবেক্ষণে রাখতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তাও দিতে পারেন। একটি প্রসব এক-দুই ঘণ্টার মধ্যে সম্পন্ন হয় না; অনেক ক্ষেত্রে ছয় থেকে আট ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এই দীর্ঘ সময়ের প্রসবকালীন সেবায় ধাত্রীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
তবে আমাদের দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রীদের দক্ষতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। তাই প্রথমে তাঁদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তুলতে হবে, এরপর তাঁদের সঠিকভাবে পদায়ন করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে ওজিএসবি কাজ করছে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের সহযোগিতায় আমরা ধাত্রী, নার্স এবং চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। দক্ষ জনবল তৈরি ও যথাযথভাবে পদায়নের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
তিনি বলেন, ‘আমাদের তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোতে তুলনামূলকভাবে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, সরঞ্জাম ও সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। কিন্তু জেলা হাসপাতালগুলোতে অনেক ক্ষেত্রেই এসব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। ধরুন, একজন রোগীর জরুরি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হলো। তখন একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পাশাপাশি অবেদনবিদও প্রয়োজন। কিন্তু অনেক জেলা হাসপাতালে প্রয়োজনের সময় অবেদনবিদ পাওয়া যায় না।
এ ছাড়া একজন চিকিৎসককে পদায়ন করলেই ২৪ ঘণ্টা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে একাধিক পরামর্শক চিকিৎসক এবং পর্যাপ্ত অবেদনবিদ প্রয়োজন। একই সঙ্গে রক্ত পরিসঞ্চালনের ব্যবস্থা, রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষাগার, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র এবং তা পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত জনবলও থাকতে হবে।
‘অন্যদিকে প্রসবের সময় একজন মাকে ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা প্রয়োজন হতে পারে। একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পক্ষে একটানা এত সময় দায়িত্ব পালন করা সবসময় সম্ভব নয়, কারণ চিকিৎসকদের দায়িত্ব সাধারণত পালাক্রমে পরিচালিত হয়। ফলে দীর্ঘ সময়ের পর্যবেক্ষণ ও জরুরি পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি’—বলেন তিনি
অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান সেকশন কমানোর উদ্যোগ
সিজারিয়ান সেকশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিজারিয়ান সেকশনের হার সারা বিশ্বেই বেড়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগে ১২ থেকে ১৫ শতাংশের কথা বললেও বর্তমানে এ বিষয়ে তাদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। আগে পরিবারগুলোতে ছয়, আট, দশ বা বারোটি পর্যন্ত সন্তান নেওয়ার প্রবণতা ছিল। বর্তমানে নারীরা বেশি শিক্ষিত ও সচেতন হওয়ায় সন্তানসংখ্যাও কমেছে। অনেক পরিবার একটি বা দুটি সন্তান নিতে চায়। ফলে একটি সন্তানের নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করার বিষয়ে পরিবারের প্রত্যাশাও বেড়েছে।
‘এ জন্য নিয়মিত ভ্রূণের হৃদস্পন্দন পর্যবেক্ষণের যন্ত্রসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত কর্মী এবং সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু একটি যন্ত্র কিনে দিলেই হবে না; সেটি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও প্রশিক্ষিত জনবল থাকতে হবে। এসব সুবিধা নিশ্চিত না করে শুধু সিজারিয়ান সেকশনের হার কমানোর কথা বলা বাস্তবসম্মত নয়।’
তার অভিযোগ, ‘বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে দালালচক্রের একটি সমস্যা রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থে সিজারিয়ান সেকশনকে উৎসাহিত করা হয় এবং দালালদের মাধ্যমে রোগীদের এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে সচেতনতা তৈরির বিষয়ে কাজ করছি। তবে এই সমস্যার সমাধানে শুধু সমাজ বা কোনো একটি সংগঠনের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।’
তিনি বলেন, সরকারকে চিহ্নিত করতে হবে কোন কোন ক্লিনিকে মাতৃমৃত্যু বা সিজারিয়ান সেকশনের হার বেশি এবং কীভাবে রোগীরা সেখানে যাচ্ছে। একই সঙ্গে একজন রোগীকে বাড়ি থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা, তাঁর পরবর্তী চিকিৎসাসেবা ও প্রসবের সময় কোথায় যাচ্ছেন—এসব তথ্য অনুসরণ করার জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।’
‘এ জন্য স্বাস্থ্য কার্ডের মাধ্যমে রোগীর মোবাইল নম্বর, পরবর্তী সাক্ষাতের তারিখ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। রোগী কখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আসবেন এবং প্রসবের সময় কোন প্রতিষ্ঠানে যাচ্ছেন, সেটিও পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা সম্ভব। প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্সের চলাচলও অনুসরণ করার ব্যবস্থা থাকতে পারে।’
ওজিএসবি সভাপতি বলেন, ‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীরা যে মানের সেবা প্রত্যাশা করেন, অনেক ক্ষেত্রে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। রোগীরা চান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেলে তাঁরা মানসম্মত চিকিৎসা ও যথাযথ আচরণ পাবেন। এই প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় অনেকেই তুলনামূলক বেশি খরচ হলেও বেসরকারি ক্লিনিককে বেছে নেন। এমনকি অনেকে বাড়িঘর বা সম্পদ বিক্রি করেও চিকিৎসার ব্যয় বহন করেন। তাই মানসম্মত ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে সরকারকে আরও কার্যকর ও তৎপর হতে হবে।’
বন্ধ্যত্ব বৃদ্ধির কারণ ও জীবনযাপনের প্রভাব
সভায় জানানো হয়, বন্ধ্যত্বের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। এটি নারী বা পুরুষ—উভয়ের কারণেই হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের কারণ একসঙ্গে কাজ করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয় না। ভবিষ্যতে গবেষণার মাধ্যমে এসব অজানা কারণ সম্পর্কে আরও জানা সম্ভব হতে পারে।
‘তবে পরিবেশগত কারণগুলোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ একটি বড় সমস্যা। বায়ুর বিভিন্ন দূষিত উপাদান শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানব দেহে প্রবেশ করে এবং তা প্রজননস্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। একইভাবে প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহারও উদ্বেগের বিষয়। প্লাস্টিক থেকে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান শরীরে প্রবেশ করতে পারে, যা প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
এ ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাসও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে কৃষিতে বিভিন্ন ধরনের সার ও রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করা হয়। এসব উপাদানের কিছু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষ করে যারা সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত এবং হাতে সার ছড়ানোর সময় তা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে এবং শুক্রাণুর সংখ্যা কমে যেতে পারে।
‘এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশের অনেক নাগরিক দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপের মধ্যে কাজ করেন। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে পুরুষের শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অর্থাৎ জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশ—সবকিছু মিলেই বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি দিন দিন বাড়তে পারে।’
ওজিএসবি সদস্য সচিব অধ্যাপক মুশাররাত সুলতানা বলেন, একটি জাতির সামগ্রিক অগ্রগতির জন্য মা ও নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মা ও নারীর সুস্বাস্থ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য ও উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ অর্জন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দেশের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞদের অন্যতম বৃহৎ এই বার্ষিক বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উপস্থিত ছিলেন। অংশ নেন আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কয়েকজন বক্তা। শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর ও ভারত থেকে বক্তারা এসেছেন এবং মালয়েশিয়া থেকেও অংশগ্রহণ করেছেন।
সম্মেলন সফলভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, অংশগ্রহণকারী চিকিৎসক, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ওজিএসবি। ভবিষ্যতেও দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেছে সংগঠনটি।
এমইউ/