বিডিআরসিএস-আইএফআরসির জরিপ
হামে আক্রান্ত ৮৯ ভাগের চিকিৎসা ঋণ করে
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বাংলাদেশে হামের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে অধিকাংশ পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ছে—এমন চিত্র উঠে এসেছে এক জরিপে। এতে দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত প্রতি ১০টি পরিবারের প্রায় নয়টি (৮৯ শতাংশ) চিকিৎসার খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হয়েছে। এছাড়া ৬১ শতাংশ পরিবার নিজেদের সঞ্চয় শেষ করে ফেলেছে।
চলতি বছরের মে–জুন সময়ে ২,৭৪৬টি পরিবারের ওপর জরিপটি যৌথভাবে করেছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) ও আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ফেডারেশন (আইএফআরসি)।
জরিপ অনুযায়ী, জরিপে অংশ নেওয়া সব পরিবারই আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ ওষুধ, ৩৩ শতাংশ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) এবং ২২ শতাংশ খাদ্য সহায়তাকে সবচেয়ে জরুরি চাহিদা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এছাড়া ৪ শতাংশ পরিবার চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে সম্পদ বিক্রি করেছে এবং প্রায় তিন শতাংশ অনুদানের ওপর নির্ভর করেছে।
জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দুই হাজার ৪০০টি পরিবারকে প্রতি পরিবার ১০ হাজার টাকা করে জরুরি নগদ সহায়তার জন্য নির্বাচন এবং হামের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন করা। নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ড অনুযায়ী মূল্যায়নের পর দুই হাজার ৪০০টি পরিবারকে সহায়তার জন্য নির্বাচিত করা হয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী রোগীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের নিচে, ১৯ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ১৭ বছর এবং ছয় শতাংশের বয়স ১৮ বছরের বেশি।
তথ্য অনুযায়ী, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রতিটি পরিবার গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করেছে। অনেক অভিভাবক জানিয়েছেন, হাসপাতালে দীর্ঘদিন অবস্থান করায় তারা আয় হারিয়েছেন, এমনকি কেউ কেউ চাকরিও হারিয়েছেন।
রংপুরের হাজেরা খাতুন জানান, ১১ মাস বয়সী মেয়ের চিকিৎসার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসে তাদের পরিবার ইতোমধ্যে ৭০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় করেছে। তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া, খাবার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত থাকলেও চলতি মাসে বেতন না পাওয়ায় পরিবারটি আরও সংকটে পড়েছে।
জরিপে পেশাগত তথ্য দেওয়া পরিবারগুলোর মধ্যে ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের মাসিক আয় ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে হওয়ায় দীর্ঘ সময় অসুস্থতার কারণে আয় বন্ধ হলে তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল ড. কবির এম. আশরাফ আলম এনডিসি বলেন, এই মূল্যায়ন দেখিয়েছে যে অনেক পরিবার স্বাস্থ্য সংকটের পাশাপাশি গুরুতর আর্থিক সংকটেও পড়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশে আইএফআরসি-এর হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; অসুস্থ সদস্যের পরিচর্যায় অনেক পরিবার কঠিন আর্থিক চাপে পড়ছে। তাই জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিস্থিতিতে মানবিক সহায়তা ও শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা সমানভাবে জরুরি।
আইএফআরসি ও অংশীদারদের সহায়তায় বিডিআরসিএস সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতে সহযোগিতা করছে। পাশাপাশি এক হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক মাঠপর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কেন্দ্রে সহায়তা, ঝুঁকি বিষয়ে যোগাযোগ এবং মানুষকে টিকা গ্রহণ ও দ্রুত চিকিৎসা নিতে উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
এমআর/