২৭ জুলাই, ২০২৬ ০৬:৫২ পিএম

এনডিএফের সেমিনারে গণঅভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের অবদান স্মরণ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সংস্কারের আহ্বান

এনডিএফের সেমিনারে গণঅভ্যুত্থানে চিকিৎসকদের অবদান স্মরণ, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সংস্কারের আহ্বান
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের জীবনের সুরক্ষায় চিকিৎসকদের অবদান স্মরণ করে স্বাস্থ্যখাতে বৈপ্লবিক সংস্কার, মেধার ভিত্তিতে পদায়ন এবং আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। একই সঙ্গে চিকিৎসকদের বদলি-পদায়নে বৈষম্যের অভিযোগ এবং জুলাইয়ের ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তারা।

আজ সোমবার (২৭ জুলাই) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে জামায়াত সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ) আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: স্বাস্থ্য সেক্টরের অবদান ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিঞা গোলাম পরওয়ার অভিযোগ করেন, সরকার বৈষম্যের পথে হাঁটছে। সরকারবিরোধী মনে হলেই চিকিৎসকদের ঢাকার বাইরে বদলি করা হচ্ছে। যারা জুলাই বিপ্লবের সুফলভোগী, তারাই সংসদে জুলাই সনদের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, গণভোট অস্বীকার করছেন।

বিদেশি চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে দেশে জুলাইয়ে আহতদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ। বলেন, আহতদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি অঙ্গীকারাবদ্ধ।

সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ জুলাই যোদ্ধাদের ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাইয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের সেবা দেওয়া চিকিৎসকদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করে বর্তমান সরকার ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা শেষ হয়ে যেতে পারি, কিন্তু আমাদের এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমাদের এক প্রিয় ভাই একটি চোখ হারিয়েছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, সেই সময় এই আত্মত্যাগগুলো না হলে, এই চোখগুলো অন্ধকারে হারিয়ে না গেলে, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আলোর পথে ফিরে আসতে পারত না; বরং আরও গভীর অন্ধকারে নিমজ্জিত হতো।’

এই হারানো চোখগুলো জাতিকে নতুন আলো দেখিয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই হারানো পা-গুলো বাংলাদেশকে আবার নতুন করে দাঁড়াতে শিখিয়েছে।

‘কিন্তু দুঃখের বিষয়, ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারির নির্বাচনের পর সরকারের উচিত ছিল জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের ঐতিহাসিক দলিল, প্রামাণ্যচিত্র এবং বীর চিকিৎসকদের অবদান সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফটো গ্যালারি ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরা। বাস্তবে আমরা তার বিপরীত চিত্র দেখেছি’—যোগ করেন তিনি। 

দেয়ালে দেয়ালে জুলাই-আগস্টের স্মতিচিহ্নগুলো মুছে ফেলা হচ্ছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশন তাদের কর্মীদের দিয়ে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেয়ালে লেখা স্লোগানগুলো মুছে ফেলেছে। যে স্লোগানগুলো আন্দোলনের শক্তি ও প্রেরণার প্রতীক ছিল, সেগুলোর জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য আঁকা হয়েছে। এর মাধ্যমে এমন একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে যেন আন্দোলনের স্মৃতি ও স্লোগানের চেয়ে এসব দৃশ্যই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

ড. মাসুদ বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য ছিল জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের স্মৃতি ধীরে ধীরে মানুষের মন থেকে মুছে ফেলা।

সংসদ সদস্য হাফেজ রাশেদুল ইসলাম বলেন, জুলাই সনদ বিষয়ে অধিকাংশ মানুষের প্রত্যাশা বাস্তবায়নে সরকার দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এ নিয়ে ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক এই সভাপতি।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, চিকিৎসকেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আহতদের সেবা নিশ্চিত করেছেন। জাতি তাদের অবদান আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। গণঅভ্যুত্থান সফলতার পেছনে তাদের অবদান অনস্বীকার্য।

তিনি জুলাই যোদ্ধাদের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আহতদের সেবার কথা স্মরণ করেন। পাশাপাশি দুঃসহ দিনগুলোতে সমন্বয়কদের নিরাপত্তা ও আবাসনের ব্যবস্থা করতে চিকিৎসকদের সহযোগিতার কথাও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।

স্বাস্থ্য কাঠামোয় এখনও ফ্যাসিবাদী সিন্ডিকেট বিদ্যমান রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সর্বত্র মেধার ভিত্তিতে পদায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

ডাকসুর পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ জুলাইয়ে আহতদের সেবায় চিকিৎসকদের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যাদের জুলাইয়ে কোনো অবদান ছিল না, দলীয় পরিচয় বিবেচনায় তাদের ঢাকায় পদায়ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ে সেবা নিশ্চিত করা চিকিৎসকদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলি করা হচ্ছে।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জুলাইয়ের চেতনা বাঁচিয়ে রাখার আহ্বান জানান অধ্যাপক ডা. মাহফুজুর রহমান। তিনি বলেন, এটি একটি অসাধারণ বিপ্লব।

শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মুস্তাফিজুর রহমান জুলাইয়ে আহতদের সেবা, আন্দোলনে সম্পৃক্ততা এবং স্বৈরাচারের রোষানলে পড়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্দোলনে সম্পৃক্ত চিকিৎসকদেরও এখন বদলি করা হচ্ছে। লেজুড়বৃত্তিক নয়, বরং মেধার ভিত্তিতে চিকিৎসকদের পদায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

স্পাইন সার্জন অধ্যাপক ডা. শহীদুল ইসলাম আকন জুলাইয়ের ভয়াল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখন নিয়মিত রোগীদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক আহতের সেবা দিতে হয়েছে। চিকিৎসকেরা টানা ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারের চিন্তার বাইরে গিয়ে যারা আন্দোলনে আহতদের সেবায় আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, তাদের সরকার-সংশ্লিষ্টরা বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছেন। নতুন সরকারের সময়েও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বলে বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডা. মোহাম্মদ সুজন শরীফ। তিনি বলেন, নানামুখী চাপের মধ্যেও চিকিৎসকেরা স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছেন। এ সময় মেডিকেল শিক্ষার্থীরাও রাস্তায় নেমে আন্দোলনে অংশ নেন।

জুলাইয়ে শহীদ হওয়া একমাত্র চিকিৎসক সজীব সরকারের বোন তার ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করেন এবং শহীদ পরিবারগুলোর পাশে থাকার জন্য এনডিএফের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

ইবনে সিনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সাজিদ আবদুল খালেক চিকিৎসকদের অবদানের কথা জানিয়ে বলেন, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে যেসব চিকিৎসক আহতদের সেবা প্রদানে বাধা দিয়েছিলেন, তাদের নিবন্ধন স্থায়ীভাবে বাতিল করা উচিত।

অনুষ্ঠানে নবীন চিকিৎসকেরাও জুলাইয়ের দুঃসহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন এবং প্রকৃত মুক্তি নিশ্চিত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। এ সময় বক্তব্য দেন বিএমইউর ডা. মাহবুবুর রহমান মাজেদ এবং ডা. নাসির আক্তার কাকলী।

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন এনডিএফের সহ-সভাপতি ডা. আতিয়ার রহমান। সঞ্চালনা করেন ডা. মারুফ শাহরিয়ার। এতে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চিকিৎসক, চিকিৎসা শিক্ষার্থী ও পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

এমইউ/এমআর

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত