আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক নয়: বিপিএইচসিডিএ সভাপতি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনোস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএইচসিডিএ) সভাপতি ডা. মো. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল। তিনি বলেন, কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে মূল কারণ অনুসন্ধান করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই সমাধান, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়।
বুধবার (১৭ জুন) মেডিভয়েসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস বলেন, ‘আদ্-দ্বীন হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্তকে আমি সঠিক বলে মনে করি না। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (রামেকহা) আইসিইউ সংকটের কারণে প্রথমে ছয়জন এবং পরবর্তীতে আরও ১৮ জন শিশুর মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। এমন পরিস্থিতিতে যদি দায় নির্ধারণ করতে হয়, তবে একই যুক্তিতে রামেকহার নিবন্ধন বাতিল করা উচিত।’
তিনি বলেন, ‘কোভিড-১৯ মহামারির সময় ইউনাইটেড হাসপাতালে জরুরি বিভাগে অগ্নিকাণ্ড বা এসি বিস্ফোরণের ঘটনায় ছয়জন রোগীর মৃত্যু হলেও তখন সেই হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিল করা হয়নি।’
সমস্যার সমাধানে তদন্ত ও জবাবদিহিতার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘কোনো সমস্যা হলে মাথা কেটে ফেললেই এর সমাধান হয় না। সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি বিমান দুর্ঘটনায় মাইলস্টোন স্কুলের শিশুদের মৃত্যুর ঘটনায় যেমন পুরো বিমান বাহিনীর নিবন্ধন বাতিল করা হয়নি, তেমনি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার কারণে পুরো চিকিৎসক সমাজ, নার্স, হাসপাতাল কর্মী অথবা হাসপাতাল মালিকদের দায়ী করা ঠিক নয়।’
আদ-দ্বীন হাসপাতালে নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে ডা. মোসাদ্দেক বলেন, ‘আমি প্রথমেই গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি এবং নিহত শিশুদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। একই সঙ্গে, এ ঘটনার জন্য যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে যথাযথ শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানাই।’
তার মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বরং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান, দায় নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নের পথে বাধা সম্পর্কে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাতকে শক্তিশালী ও স্বনির্ভর করে তোলার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে যান এবং এ খাতে দেশের বাইরে পাঁচ থেকে ছয় বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়। এত বিশাল অংকের অর্থের জন্য বাইরের কোন শক্তি এ দেশের স্বাস্থ্য খাতকে স্বনির্ভর হতে বাধা প্রদান করতেই পারে।
বিপিএইচসিডিএ সভাপতি আরও বলেন, আদ্-দ্বীন ইস্যুতে কেউ হয়তো স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ভুল বুঝিয়েছে। কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্তের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে হাসপাতাল বন্ধ করা যেতে পারে, তবে তা হতে হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, ‘আমি সরকার ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন জানাই, প্রতিটি জেলার আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সঙ্গে আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করা হোক। কোনো হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হলে কিংবা সতর্কবার্তা দেওয়ার দরকার হলে তা সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করতে চাই। আমরা সরকারকে এসব বিষয়ে সহযোগিতা করতে চাই।’
আদ্-দ্বীনের বিষয়ে সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আদ্-দ্বীন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। তাই আমি চাই, আদ্-দ্বীনের বিষয়টি সরকার পুনর্বিবেচনা করুক, যাতে সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।’
ডা. মোসাদ্দেক আরও বলেন, আমাদের অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা রয়েছে যে, সরকার প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে হাসপাতাল বন্ধ করতে পারে, জরিমানা করতে পারে কিংবা আইনানুগ অন্যান্য ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে কোনো হাসপাতালের নিবন্ধন বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, রোগীদের ভোগান্তি এবং চিকিৎসাসেবার ধারাবাহিকতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
বাংলাদেশে সরকারের একার পক্ষে এত বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন। বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে প্রদান করা হয়। তাই স্বাস্থ্যখাতের সার্বিক উন্নয়নে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে বলে জানান তিনি।
এমআর/এমআই