ডা. উম্মে তাহমিনা সীমা
কনসালটেন্ট, গাইনি অ্যান্ড অবস বিভাগ, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
১০ মে, ২০২৬ ০৫:০৬ পিএম
গর্ভের শিশুর ওজন বৃদ্ধি: মা ও পরিবারের যা জানা জরুরি
গর্ভকালীন অবস্থা প্রতিটি প্রসূতি মায়ের জীবনে একটি রোমাঞ্চকর এবং সংবেদনশীল অধ্যায়। এই সময়ে গর্ভের সন্তান ঠিকঠাক বাড়ছে কি-না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ থাকে না। অনেক সময় আমরা বুঝতে পারি না ঠিক কোন সময়ে বাচ্চার ওজনের দিকে নজর দেওয়া উচিত। শিশুর ওজনের তারতম্যই বলে দেয় তার ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য কেমন হবে। তাই প্রতিটি মা ও পরিবারেরই উচিত এই সময়টাতে অনাগত নবজাতকের স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা।
প্রথম তিন মাস ওজন নয়, লম্বাই মাপকাঠি
গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাস বা প্রথম ধাপে বাচ্চার ওজন নিয়ে চিন্তিত হওয়ার বিশেষ কারণ নেই। এই সময়ে বাচ্চার ওজন পরিমাপ করা সম্ভব হয় না, বরং বাচ্চা কতটুকু লম্বা হচ্ছে সেটিই দেখা হয়। এই লম্বার পরিমাপ দেখেই মূলত প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়। তাই এই সময়ে ওজনের চেয়ে ভ্রূণের গঠনগত বিকাশের দিকেই বেশি নজর দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় ধাপ: সতর্ক হওয়ার সময়
চতুর্থ মাস থেকে ষষ্ঠ মাস পর্যন্ত সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় থেকেই বাচ্চার ওজন দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এই পর্যায়ে নিয়মিত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করা জরুরি, যাতে বাচ্চার ওজন চার্ট অনুযায়ী বাড়ছে কি-না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়। মায়ের ওজন বৃদ্ধি এখানে একটি বড় সংকেত। যদি মায়ের ওজন নিয়মিত বাড়ে, তবে ধরে নেওয়া হয় বাচ্চার বৃদ্ধি ঠিক আছে। যদি মায়ের ওজন স্থির থাকে বা কমতে থাকে, তবে বুঝতে হবে গর্ভস্থ শিশুটি সঠিক পুষ্টি পাচ্ছে না।
ওজনের আদর্শ মাপকাঠি ও ঝুঁকি
একটি সুস্থ শিশুর বৃদ্ধির নির্দিষ্ট চার্ট রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ৩২ সপ্তাহে শিশুর ওজন হওয়া উচিত প্রায় ১৯ শ’ গ্রাম থেকে দুই কেজির কাছাকাছি। ৩৬ সপ্তাহে বাচ্চার ওজন আড়াই কেজি হওয়া বাঞ্ছনীয়। যদি ৩২ সপ্তাহে ওজন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হয় এবং সঠিক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে এটি শিশুর জীবনের জন্য ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে। এমনকি গর্ভস্থ শিশুর মৃত্যুও হতে পারে।
জন্মের সময় কম ওজন: পরবর্তী জটিলতা
জন্মের সময় একটি শিশুর আদর্শ ওজন হলো আড়াই কেজি। এর কম ওজনে জন্ম নেওয়া শিশুরা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় পিছিয়ে থাকে। এদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে ভোগার ঝুঁকি থাকে, ফলে বারবার হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে। এ থেকে উত্তরণের জন্য মায়ের খাদ্যাভ্যাস ও সচেতনতা ও বাচ্চার সঠিক ওজন নিশ্চিত করতে মায়ের পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। মা যদি অপুষ্টিতে ভোগেন, তবে শিশুটিও অপুষ্টি নিয়েই জন্মাবে।
গর্ভাবস্থায় খাবার তালিকা
গর্ভাবস্থায় বাচ্চার সঠিক ওজন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে মায়ের দৈনিক খাবার তালিকায় বৈচিত্র্য এবং পর্যাপ্ত পুষ্টি থাকা অত্যন্ত জরুরি। মায়ের শরীরের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অবশ্যই মাছ, মাংস অথবা ডিম রাখা উচিত, যা বাচ্চার কোষ ও শারীরিক গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ক্যালসিয়াম ও ভিটামিনের জোগান দিতে প্রতিদিন অন্তত এক গ্লাস দুধ খাওয়া প্রয়োজন। উদ্ভিজ প্রোটিনের চমৎকার উৎস হিসেবে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের ডাল এবং এক মুঠো বাদাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা বাচ্চার হাড় ও মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করে।
এ ছাড়া আয়রন ও ফলিক অ্যাসিডের অভাব দূর করতে প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি এবং রঙিন ফলমূল খেতে হবে। মনে রাখতে হবে, মা যদি নিয়ম মেনে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ করেন, তবেই গর্ভস্থ শিশুটি সঠিক ওজন নিয়ে পৃথিবীতে আসবে এবং পরবর্তী বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থেকে মুক্ত থাকবে।
ডাক্তারের পরামর্শগ্রহণ
সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য গর্ভাবস্থায় নিয়মিত ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। বাচ্চার ওজন কম হলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া এবং মায়ের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব। সঠিক যত্ন আর পুষ্টিই পারে একটি সুস্থ ও সবল শিশুর জন্ম নিশ্চিত করতে।
জেএইচ/এমইউ