ইউএইচএফপিওদের সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
জেলা হাসপাতালে রেফারেল সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় করে সেকেন্ডারি হেলথ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে বিশেষ রেফারেল সেন্টার গড়ার পরিকল্পনা কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
আজ শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ইউএইচএফপিওদের নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এ কথা বলেন।
দেশের সাধারণ মানুষের জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে বিভাগীয় শহর কিংবা ঢাকায় আসা-যাওয়ার কষ্ট তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সারাদেশের জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ের মধ্যে সমন্বয় করে সেকেন্ডারি হেলথ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে বিশেষ রেফারেল সেন্টার গড়ে তুলতে চাই। যেখানে হৃদ রোগ, ক্যান্সার, কিডনি ডায়ালাইসিস, ট্রামা কেয়ার, আইসিইউসহ এই জরুরি বিষয়গুলোকে আমরা সন্নিবেশিত করবো বলে আমাদের পরিকল্পনা আছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই, উপজেলা এবং জেলাকে কেন্দ্র করে এই বিশেষায়িত সেবাগুলো যেমন গড়ে উঠবে। একই সাথে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো হবে মা নবজাতক এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সেবার একটা মূল কেন্দ্র। আমরা সকলেই জানি সারাদেশে এই স্বাস্থ্য সেবাগুলোর ব্যাপক অপ্রতুলতা আছে এবং ব্যাপক চাহিদা আছে। তাই এগুলোকে আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সুন্দর ব্যবস্থা গড়ে তুললে, আপনাদের নেতৃত্বে প্রতিটি উপজেলায় মা এবং নবজাতকরা এই সেবাগুলো পাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।’
অ্যাম্বুলেন্স সমস্যা নিরসনে মন্ত্রী জানান, হাসপাতালের রোগীগুলোকে যখন একটা লেভেল থেকে আরেকটা লেভেলে যেতে হয়, আমাদের যোগাযোগে অ্যাম্বুলেন্স অপ্রতুলতা দেখা যায়। যোগাযোগের সুব্যবস্থা জন্য সেই অ্যাম্বুলেন্সকে নিয়ে আমরা ন্যাশনাল অ্যাম্বুলেন্স পুল গড়ে তুলতে চাই।’
ইউএইচএফপিওদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে ই-হেলথ কার্ড প্রদান করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এই কার্ডটি নগদ টাকা প্রদান করবে না, তবে যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, তা হলো সুস্বাস্থ্য এবং সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা। ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে আমরা একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারব, ইনশাআল্লাহ। এই ইউনিক নাম্বারটি ব্যবহার করে দেশের যেকোনো স্থানে চিকিৎসা গ্রহণের সময়, চিকিৎসকরা পূর্ববর্তী চিকিৎসা, প্রাপ্ত ওষুধ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারবেন। এর মাধ্যমে ম্যালপ্র্যাকটিস যেমন, অপ্রয়োজনীয় ওষুধ ও টেস্টের ব্যবহার রোধ করা সম্ভব হবে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আসবে, যা জনগণের দুর্দশা কমাতে সাহায্য করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি আরও বলেন, আমি নিজেকে আপনাদেরই একজন মনে করি এবং আমাদের দৈনন্দিন কাজের বাস্তবতাগুলো একটু তুলে ধরতে চাই। আপনাদের অনেকেই দূরবর্তী হাওড়, চর, পার্বত্য অঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় কাজ করেন, যেখানে অবকাঠামো দুর্বল, জনবল সংকট রয়েছে এবং স্বাস্থ্য সরঞ্জামগুলোর অভাব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আপনাদের কাজ করতে হয়।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে ড. এম এ মুহিত বলেন, আমাদের চিকিৎসকরা শুধুমাত্র চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন না, তারা প্রশাসনিক দায়িত্ব, তত্ত্বাবধায়ক দায়িত্ব এবং ক্লিনিক্যাল সেবা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। এজন্য এই তিনটি রোল সঠিকভাবে পালন করতে হলে আমাদের চিকিৎসকদের যথাযথ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন, যাতে তারা দক্ষ নেতা হিসেবে গড়ে উঠতে পারেন এবং একই সাথে আরও দক্ষ চিকিৎসক হিসেবে নিজেদের উন্নতি করতে পারেন।
এখন, একটি বিষয় আমি বলবো, যা হয়তো অনেকেই পছন্দ করবেন না কিন্তু আমি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে এ কথা বলার জন্য দায়বদ্ধ। আমরা বারবার বলছি যে আমাদের জনবলের অপ্রতুলতা রয়েছে। তবে এভিডেন্স আছে, বাস্তবতা চোখের সামনে রয়েছে যে, আমাদের ১০০ জন ডাক্তার থাকার জায়গায় ৫০ জনই থাকেন, ১০০ জন স্বাস্থ্যকর্মীর জায়গায় ৫০ জন কর্মী থাকেন। এর ফলে, অনেক সময় কর্মস্থলে অর্ধেক কর্মীকে পাওয়া যায় না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
আমি দেশের বিভিন্ন ইউনিয়ন কেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল এবং মেডিকেল ইনস্টিটিউটগুলো সরাসরি পরিদর্শন করেছি। আমার এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে চাই, ‘যদি আমরা এই ব্যবস্থাটিকে ঠিক না করতে পারি, তবে নতুন হাসপাতাল গড়লে বা নতুন ডাক্তার নিয়োগ করলে, সেটাও বর্তমান হাসপাতালের মতোই অব্যবস্থাপনার শিকার হবে। আমাদের কাজ হচ্ছে এই অব্যবস্থাপনা দূর করা। আমাদের নিজেদের জায়গায় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সৎ ও দৃঢ় হতে হবে, তাহলেই আমরা অনেক বড় সমস্যা একসাথে মিটিয়ে দিতে পারব—যোগ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন—আমরা প্রায়ই দেখি হাসপাতালের সামনে ময়লা পড়ে থাকে। আমরা কি বিশ্বাস করি, এই ময়লা শুধু আমাদের সম্পদের অপ্রতুলতার কারণে? নাকি আমাদের চিন্তা-চেতনার অপ্রতুলতা থেকেও? হয়তো আমরা এই বিষয়গুলিকে যথাযথ গুরুত্ব দিই না, কিন্তু আসুন আজকের সম্মেলন থেকে আমরা প্রতিজ্ঞা করি যে, এই সব জঞ্জালগুলো দূর করার জন্য আমরা প্রত্যেকে আমাদের নিজ দায়িত্ব থেকে কাজ করব। আমরা একসাথে তা করতে সক্ষম হবো, ইনশাআল্লাহ।’
শেষে, ইউএইচএফপিওদের উদ্দেশ্য আহ্বান জানিয়ে ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘যখন একজন বৃদ্ধ কৃষক, অন্তঃসত্ত্বা মা বা অপুষ্ট শিশুটি আপনার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসে, তখন তার জন্য আপনি ছাড়া আর কোনো বিকল্প চিকিৎসা নেই। সেই মা, সেই সন্তান আমাদেরই কারো মা ও সন্তান হতে পারতো। আপনারাই তাদের চিকিৎসক, আপনারাই তাদের সরকার। আসুন, আমরা যেন তাদের আর বঞ্চিত না করি, সেই নবজাতক শিশুটিকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করি। আমরা একসাথে সুস্বাস্থ্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’
এসময় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাতচন্দ্র বিশ্বাস, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এমআই/