সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলের ছাত্রাবাসে এক মাসে দুইবার গ্যাস লিকেজ, আতঙ্কে শিক্ষার্থীরা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসে এক মাসে দুইবার গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল (শনিবার) বিকট শব্দে গ্যাস লিকেজের পর আতঙ্কে রয়েছেন অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা।
তারা জানিয়েছেন, গত ৪ এপ্রিল রাতে মেডিকেল কলেজের ছাত্র হোস্টেল এবং ছাত্রী হোস্টেলের মাঝে গ্যাস লাইন থেকে বিকট শব্দে লিকেজ হয়। এতে ছাত্রাবাসে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা হল থেকে বের হয়ে রাস্তায় নেমে আসেন।
‘সাথে সাথে কলেজের নতুন অধ্যক্ষ এবং হল সুপারকে জানানো হলেও তারা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে সাড়া দেননি। পরে হল কো-অর্ডিনেটর ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার মুনের হস্তক্ষেপে এর সমাধান হয়’—শিক্ষার্থীদের অভিযোগ।
তারা বলেন, ‘এর আগে গত ১১ মার্চ অল্প পরিমাণ গ্যাস লিকেজের ঘটনা ঘটে। তবে এ সম্পর্কে কলেজ কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তাদের অবহেলার কারণে দ্বিতীয়বার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এসএইচ-১৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী রাতুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, ‘মধ্যরাতে কিছু শিক্ষার্থী বিকট শব্দ শুনতে পান। এ সময় তাদের একটি অংশ ভয়ে হল থেকে বের হয়ে কলেজের দিকে চলে যায়। আরেকটি অংশ শব্দের উৎসের দিকে যায়। গিয়ে দেখতে পান, গ্যাসের লাইন থেকে লিক হচ্ছে, সঙ্গে বিকট আওয়াজ। পরে ডাইনিং ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন, গত ১১ মার্চও এ রকম লিকেজের কথা তারা মেডিকেল কলেজকে অবহিত করে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।’
এ ব্যাপারে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও ইন্টার্ন ডক্টরস প্রতিনিধি দলের সদস্য সাদিকুর রহমান ইফাত মেডিভয়েসকে বলেন, ‘গ্যাসের লাইন ও ময়লার ডাম্পিং জোন পাশাপাশি। আমাদের ধারণা, ময়লা বেশি রাখায় গ্যাসের লাইনে চাপ পড়া থেকে লিকেজ হয়ে থাকতে পারে। পরে হোস্টের সমন্বয়ক ও তিতাসের জরুরি নিয়ন্ত্রকদের হস্তক্ষেপে সমাধান হয়। কিন্তু এটা অস্থায়ী সমাধান। স্থায়ী সমাধান জরুরি।’
‘এজন্য গত এক মাস আগে থেকে কলেজ থেকে তিতাসকে চিঠি দেওয়া আছে। কিন্তু তাদের সঙ্গে অব্যাহতভাবে যোগাযোগ না করলে কাজ হয় না। এখানে সমস্যা হলো, কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানলে তারা পিডাব্লিউডিকে অবহিত করে, এখন পিডাব্লিউডির কঠোর নির্দেশনা—এখানে তিতাস ছাড়া কেউ হাত দিতে পারবে না। দায়িত্বের এই যে ডি-শোল্ডালিং এটা বড় সমস্যা। অন্যের কাঁধে যত দায়িত্ব চাপানো যায়! এখানে অবশ্যই আমাদের প্রশাসন, তিতাস, পিডাব্লিউডি—সবারই গাফিলতি আছে। প্রশাসনের কাছে গেলে বলে পিডাব্লিউডিকে জানানো হয়েছে, পিডাব্লিউডিকে বললে তারা বলেন, তিতাসকে জানানো হয়েছে—এখন এই তিতাসের খোঁজ নেবে কে?’
ভীতিকর একটি ঘটনা ঘটে গেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘এতো জোরে শব্দ হলো হলের শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে মেয়েরা বেশ আতঙ্কিত ছিল। তারা সবাই হল খালি করে নিচে এসে দাঁড়িয়েছিল। এ ব্যাপারে অবশ্যই প্রশাসনের টনক নড়া উচিত। সামনে যেন এর পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেগুলো যেন দৃঢ়ভাবে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের করণীয় থাকলে আমরা অবশ্যই প্রশাসনকে সহযোগিতা করবো।’
জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের নবনিযুক্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আইনুল ইসলাম খান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ওখানে মূলত গ্যাস লিকেজ হচ্ছিল। আমি তখনো দায়িত্ব বুঝে নিইনি। এর পরও ওই দিন রাতে তিতাস গ্যাসকে এ নিয়ে যা বলা দরকার, বলেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওখানে মূলত কিছু ময়লা-আবর্জনা ছিল, পরিষ্কার করার সময় পাইপটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আমরা পিডাব্লিউডিকে দেয়াল দিয়ে ওই জায়গাটা ব্যারিকেড করে দেওয়ার কথা বলেছি, যাতে ওখানে আর কিছু না রাখা যায়। কারণ পাইপের ওপর ভারি কিছু রাখলে ভেঙে যেতে পারে।’
আপনার নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়েছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি একটি প্রশিক্ষণে আছি। গতকাল বলে এসেছি। এর মধ্যে অগ্রগতির তথ্য নিতে পারিনি। তবে হয়ে যাবে। দুর্ঘটনা এড়াতে ওখানে কোনো ময়লা রাখা হবে না, এমন নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে আমাদেরও সতর্ক হতে হবে। পাশাপাশি পিডাব্লিউডির একজন লোক তো থাকেই। তাকে দেয়াল করে দেওয়ার বিষয়টি আবারও বলা হবে। আমার মনে হয়, পরবর্তীতে আর কোনো অসুবিধা হবে না ইনশাল্লাহ।’
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের হল সুপার অধ্যাপক ডা. আব্দুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তিতাস গ্যাসের সঙ্গে সব সময় আমাদের যোগাযোগ হয়। এবারও হয়েছে। তারা বিষয়টি দেখে একটি পরিপূর্ণ রিপোর্ট দেবে। তার পর যাতে আর এমন না হয়, সেজন্য স্থায়ীভাবে নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। আসলে গ্যাস ব্যবস্থাপনার কাজটি আমরা করতে সক্ষম নই বা ধরার ইখতিয়ারও আমাদের নেই। এমনকি পিডাব্লিউডিও এটা করতে পারে না। এটা আমরা তিতাস গ্যাসকে দিই, তারা একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে করেন। আর এটা হোস্টেল কর্তৃপক্ষও দেখে না, মেডিকেল কলেজের প্রশাসনিক বিভাগ দেখে। আমাদের তরফ থেকে এসব ব্যাপারে সব সময় হালনাগাদ জানানো হয়, যেহেতু ছাত্রাবাসের বিষয়গুলো আমাদের সর্বাধিক অগ্রাধিকারের বিষয়।’
এ সময় দুটি ছাত্রাবাসে একটি গ্যাস লাইন থাকার কারণে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা জানান হল সুপার। বলেন, এ সমস্যা সমাধানে আলাদা দুটি লাইন চালু হলে ডাইনিংয়ের বিদ্যমান সমস্যা কেটে যাবে। একটি ডাইনিং হওয়ায় নানা ঝামেলা পোহাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। এ ব্যাপারে একাধিক চিঠিতেও তিতাসের কাঙিক্ষত সাড়া মেলেনি। ফলে এ সমস্যার সমাধান হচ্ছে না।
জানতে চাইলে দ্রুতই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের আশ্বাস দেন হল কো-অর্ডিনেটর মেডিকেল কলেজের রক্তরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা গোলাম সারওয়ার মুন। তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, এটা আতঙ্কের বিষয়। কারণ আশপাশে অনেকে ধূমপান করে। উপর থেকে কেউ কিছু ফেলে দিতে পারে। এমন হলে এখান থেকে বড় কিছু হয়ে যেতে পারে। সংশ্লিষ্টদের অফিসিয়ালি জানানো হয়েছে। ওই দিন রাত আড়াইটার দিকে আমাদের সাধারণ মিস্ত্রি এ নিয়ে কাজ করে। আমার বাসার এসব সমস্যায় যে কাজ করেন তাকে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ে এসে এর সমাধান করি। পরে তিতাসকেও ডাকা হয়। তারা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সাড়া দেন। এটি খুব ভালো লেগেছে। তারা ওই দিন সকাল পর্যন্ত কাজ করে এটাকে সিল করে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এর আগে যে সমস্যা হয়েছিল, তখন আমাদের নিজস্ব লোক দিয়ে মেরামত করি। তখন তারা আমাদের নিশ্চিত করেছিল যে, আর সমস্যা হবে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে আবারও হলো।’
ডা. মুন বলেন, ‘আমাদের এখানে দুই পাশে পঞ্চাশ করে একশ’ শিক্ষার্থীর থাকার ব্যবস্থা ছিল। সেখানে ২২০-২৩০ জন থাকে। অর্থাৎ দ্বিগুনের বেশি। হোস্টেল বলতে যা বোঝায়, এটা আমাদের কৃষি বিদ্যালয়ে গেলেই বোঝা যায়। কত সুন্দর! অথচ এর বিপরীতে আমাদের ছেলে-মেয়েরা কত কষ্ট করে! এর পরও আবার ময়লা-আবর্জনাসহ কত রকমের সীমাবদ্ধতা। সবগুলো বিষয়ে আমাদের পদক্ষেপ শুরু হয়েছে।’
এমইউ/