ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া

ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া

নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ
এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ)
বিসিএস (স্বাস্থ্য),
এমডি, নিওনেটোলজি
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
রেজিস্ট্রার, শিশু বিভাগ
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


১০ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:৩৮ পিএম

রোগী-স্বজনদের সাথে সফল যোগাযোগে চিকিৎসকের যেসব দক্ষতা অর্জন খুব জরুরি

রোগী-স্বজনদের সাথে সফল যোগাযোগে চিকিৎসকের যেসব দক্ষতা অর্জন খুব জরুরি
ছবি: সংগৃহীত

রোগী ও রোগীর স্বজনদের সাথে সঠিক যোগাযোগ (Effective Communication) চিকিৎসা প্রক্রিয়ার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসাসেবা কেবলমাত্র পরীক্ষাগার বা ওষুধের উপর নির্ভর করে না, বরং এটি নির্ভর করে চিকিৎসক, রোগী ও তার পরিবারের মধ্যে গড়ে ওঠা বিশ্বাস, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার উপর।

বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে—যেখানে রোগী নিজে তার সমস্যার কথা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না, সেখানে অভিভাবকের সঙ্গে স্পষ্ট, সম্মানজনক ও সহানুভূতিশীল যোগাযোগই চিকিৎসার সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখা জরুরি। তাহলো—

প্রস্তুতি (Preparation and Environment)

পরিবেশকে এমনভাবে তৈরি করতে হবে, যাতে রোগী বা অভিভাবক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং আপনি মনোযোগ সহকারে তাঁদের কথা শুনতে পারেন। এজন্য করণীয় হলো—

ক. রোগীর সাথে কথা বলার সময় চেয়ার টেনে বসে পড়ুন, দাঁড়িয়ে কথা না বলাই ভালো।
খ. ফোন সাইলেন্ট রাখুন, চোখের যোগাযোগ বজায় রাখুন।
গ. অপ্রয়োজনীয় লোকজন (অতিরিক্ত আত্মীয়-স্বজন) থাকলে বিনয়ের সাথে বাইরে অপেক্ষা করতে বলুন।

উদাহরণ: ‘আপনারা একটু বসুন, আমি একটু মনোযোগ দিয়ে শিশুর ব্যাপারে কথা বলতে চাই। বাকিরা যদি বাইরে একটু অপেক্ষা করেন, তাহলে আমি ভালোভাবে বিষয়টা বুঝতে পারবো।’

সম্পর্ক স্থাপন ও পরিচয় দেওয়া (Rapport Building)

•   সালাম বা শুভেচ্ছা জানান।
•    নিজের নাম বলুন ও পরিচয় দিন।
•    নম্র ও সহানুভূতিশীল হোন।

‘আসসালামু আলাইকুম। আমি ডা. হাবিবুর রহমান, আমি শিশু বিশেষজ্ঞ, আপনার বাচ্চাকে আমি চিকিৎসা দিচ্ছি এখানে। আপনি ভালো আছেন তো? বুঝতে পারছি বেশ কঠিন একটা সময় যাচ্ছে এখন। ইনশল্লাহ আল্লাহ সব সহজ করে দিবেন এক সময়।

এতে অভিভাবক তৎক্ষণাৎ নিরাপত্তা ও বিশ্বাসবোধ অনুভব করেন।

মনোযোগ দিয়ে শোনা (Active Listening)

•    প্রথমে রোগীর লোকের কাছ থেকে শুনুন কি হয়েছে। প্রশ্ন করতে পারেন, আচ্ছা বাবুর কি কি সমস্যা হয়েছিল বিস্তারিত বলুন তো।
•    এরপর রোগীর অভিভাবককে অবিরতভাবে বলতে দিন (কমপক্ষে ১-২ মিনিট)।
•    মাঝে মাঝে বলুন ‘হুঁ’, ‘বুঝেছি’, ‘তারপর?’—যেন বোঝা যায় আপনি শুনছেন।
•    মুখের অভিব্যক্তি ও মাথা নাড়ার মাধ্যমে সহানুভূতি দেখান।

উদাহরণ:

মা বললেন: ‘ডাক্তার সাহেব, ওর তিনদিন ধরে জ্বর। রাতে বেশি হয়। এর আগে মোটামুটি ভালোই ছিল।’
আপনি: ‘ঠিক আছে, রাতে বেশি হয় বলছেন—সেই সময় জ্বর সর্বোচ্চ কতো উঠেছিল?’
এভাবে প্রশ্ন করে বিস্তারিত বুঝে নিন, কিন্তু মাঝপথে বাধা দেবেন না।

তথ্য সংগ্রহ ও পরিষ্কার করা (Information Gathering)

ধাপে ধাপে প্রশ্ন করুন

• খোলা প্রশ্নে (Open ended question) শুরু করুন: ‘আপনি কবে প্রথম লক্ষ্য করেছেন ওর জ্বর শুরু হয়েছে?’
• তারপর বন্ধ প্রশ্নে (close ended question) আসুন: ‘ওর প্রস্রাব ঠিক আছে তো?’
• অস্পষ্ট জায়গায় পরিষ্কার করুন: ‘আপনি বলেছিলেন ও খেতে চায় না, মানে একদমই খায় না, নাকি আগের তুলনায় কম?’ 

শিশুর রোগে প্রায়শ অভিভাবক আবেগপ্রবণ থাকেন, তাই ধৈর্য ধরুন। কৌশলীভাবে দরকারি তথ্য গুলো বের করে নিন।

সহজ ভাষায় রোগের ব্যাখ্যা (Explaining the Disease Simply)

•   ডায়াগনোসিস করে ফেলার পর রোগীকে রোগ সম্পর্কে করণীয় সম্পর্কে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন।
•   মেডিকেল টার্ম বাদ দিয়ে সাধারণ ভাষায় বলুন।
•   প্রয়োজনে ছবি একে বা হাতে ইঙ্গিত দিয়ে বোঝান।
•   মূলত তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিন:
১. রোগটা কী?
২. কেন হয়েছে?
৩. এখন কী করতে হবে?

উদাহরণ: ‘আপনার বাচ্চার নিউমোনিয়া হয়েছে। মানে ওর ফুসফুসে ইনফেকশন হয়েছে, তাই ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। এটা সাধারণত ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস থেকে হয়। আমরা কিছু ওষুধ দেবো, অক্সিজেন দিতে হতে পারে। বেশিরভাগ বাচ্চাই ৪-৫ দিনের মধ্যে কিছুটা ভালো হয়ে যায়।’

সিদ্ধান্তে অভিভাবককে যুক্ত করা (Shared Decision-Making)

•    চিকিৎসার বিকল্প উপায় থাকলে ব্যাখ্যা করুন।
•    অভিভাবকের মতামত শুনুন।
•    বিশ্বাসযোগ্য করে করণীয়গুলো তুলে ধরুন।

উদাহরণ: ‘দুটি উপায় আছে—আমরা এখনই ভর্তি করে ওষুধ শুরু করতে পারি, এতে রোগ দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসে। আর যদি আপনি খুব দূরে থাকেন, ওর অবস্থা একটু স্থিতিশীল হলে ওষুধ নিয়ে বাড়ির কাছের কোন হাসপাতালে বাকি চিকিৎসা নিতে পারেন। আপনি কী ভাবছেন?’ এতে তারা মনে করেন আপনি তাদের সহযোগী, কর্তৃত্ববাদী নন।

চিকিৎসা পরিকল্পনা ব্যাখ্যা (Treatment Explanation)

•    ওষুধের নাম, ডোজ, সময় স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলুন।
•    খাবার ও বিশ্রামের নিয়ম বলে দিন।
•    বিপদ সংকেতগুলো (warning signs) ভালো করে বুঝিয়ে দিন।

উদাহরণ: ‘এই সিরাপটা দিনে তিনবার দিতে হবে—সকাল, দুপুর, রাতে। খালি পেটে নয়, খাবারের পর। যদি জ্বর না কমে বা শ্বাস দ্রুত হয় বা বাচ্চা খেতে না চায়, সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে চলে আসবেন। চেম্বারের জন্য অপেক্ষা করবেন না।’
অভিভাবককে পুনরাবৃত্তি করতে বলুন, যেন আপনি নিশ্চিত হন যে, তারা কথাগুলো বুঝেছে।

মানসিক সহায়তা দেওয়া (Emotional Support)

•    ভয়, দুশ্চিন্তা বা অপরাধবোধের প্রতি সহানুভূতি দেখান।
•    ইতিবাচক ও বাস্তব কথা বলুন।

উদাহরণ: ‘আমি বুঝতে পেরেছি, আপনারা অনেক চিন্তায় আছেন। এখানে নিজেদের দোষী ভাববেন না, আপনারা চিকিৎসা শুরু করেছিলেন সঠিক সময়েই। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে হয়তো যথাযথ ফল পাওয়া যায়নি। তারপরও আপনারা এখন হাসপাতালে নিয়ে আসার কারণেই তো এখন যথাযথ চিকিৎসা শুরু করা গেছে। চিন্তা করবেন না, ও এখন সঠিক চিকিৎসা পাচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। আমরা সবসময় আপনাদের পাশে আছি।’

এই অল্প কিছু কথা অভিভাবকের মনোবল কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সারসংক্ষেপ ও পুনরাবৃত্তি (Summarize & Reinforce)
•    গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আবার বলুন।
•    লিখে দিন বা প্রেসক্রিপশনে টিক চিহ্ন দিন।
•    ফলো-আপ তারিখ নির্দিষ্ট করুন।

উদাহরণ: ‘তো সংক্ষেপে বলি, ওষুধ তিনবার, পানি বেশি, ঠাণ্ডা থেকে বাঁচাবেন, আর তিন দিন পর আবার দেখাতে আসবেন। ঠিক আছে তো?’

সুন্দরভাবে সমাপ্তি (Closing the Session)

•    কৃতজ্ঞতা জানান।
•    আশ্বস্ত করুন।
•    হাসিমুখে বিদায় দিন।

উদাহরণ: ‘ধন্যবাদ, আপনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আশা করি, বাসায় গেলে কথাগুলো ঠিকভাবে অনুসরণ করতে পারবেন। তাহলে বাচ্চা দ্রুত ভালো হবে, ইনশাআল্লাহ। আর এর মধ্যে কোনো সমস্যা হলে যেকোনো সময় চলে আসবেন।’

সফল কাউন্সেলিংয়ের অতিরিক্ত কিছু টিপস

        বিষয়                                      করণীয়
সময় ব্যবস্থাপনা   : পাঁচ মিনিটেও কার্যকর যোগাযোগ সম্ভব, যদি আপনি লক্ষ্যভিত্তিক কথা বলেন।
শরীরের ভাষা           : রোগীর চোখে তাকিয়ে কথা বলুন, মুখের হাসি বজায় রাখুন।
ভাষা সহজ রাখুন                     : ‘ইনফেকশন” শব্দের বদলে বলুন ‘জীবাণুর সংক্রমণ’।
সহানুভূতি দেখান                     : বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি আপনি কতটা চিন্তিত’।
সাংস্কৃতিক সম্মান                     : ধর্মীয় অনুভূতি বা পারিবারিক মূল্যবোধকে শ্রদ্ধা করুন।
দোষারোপ নয়    : ‘আপনার দোষে এমন হয়েছে’ নয়, বলুন, ‘এই অবস্থায় যে কেউ পড়তে পারে’।
লিখিত নির্দেশনা দিন           : বাড়ি গিয়ে ভুল না করার জন্য প্রেসক্রিপশন বা ছোট নোট দিন।
উভয় অভিভাবককে যুক্ত করুন: বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায়।
রাগান্বিত অভিভাবককে সামলান: নিজেকে শান্ত রাখুন, নিচু স্বরে বলুন, ‘আপনার কষ্ট আমি বুঝতে পারছি, একটু সময় দিন, সব ব্যাখ্যা করছি।’

যেসব ভুল এড়াতে হবে

•    রোগীর কথা মাঝপথে থামিয়ে দেওয়া।
•    খুব দ্রুত বা যান্ত্রিকভাবে কথা বলা।
•    অস্পষ্ট প্রেসক্রিপশন লেখা।
•    ভীতিকর ভাষা ব্যবহার করা (এই রোগে অনেক সময় বাচ্চা খারাপ হয়ে যায়)।
•    অভিভাবকের শিক্ষার অভাব নিয়ে উপহাস করা।

সহজে মনে রাখার সূত্র: EASY

E–Establish rapport→সম্পর্ক তৈরি করুন,
A–Assess & Listen→শুনুন ও বোঝার চেষ্টা করুন,
S–Simplify information→সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করুন,
Y–Yield empathy→সহানুভূতি ও আশ্বাস দিন।

টিআই/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত