মো. মোখলেছুর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, মেডিকেল ফিজিক্স ও বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়
০৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:৩৭ পিএম
প্রথমবার রেডিওথেরাপি সচেতনতা দিবস উদযাপন
ক্যান্সার চিকিৎসা গতিশীলতায় মেডিকেল ফিজিসিস্ট নিয়োগহীনতা ঘুচুক
আজ ৭ সেপ্টেম্বর, বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে বিশ্ব রেডিওথেরাপি সচেতনতা দিবস (World Radiotherapy Awareness Day, WRAD)। এই দিনটিকে ঘিরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অঙ্গনে একটি প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠছে—বাংলাদেশ কি ক্যান্সার চিকিৎসায় যথাযথ প্রস্তুত?
ক্যান্সার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি এক অনিবার্য পদ্ধতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য বলছে, ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের অন্তত অর্ধেকের জন্য রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। এটি শুধু একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি নয়, বরং রোগীর জীবন বাঁচানোর অন্যতম হাতিয়ার।
উচ্চশক্তিসম্পন্ন বিকিরণ ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা হয়, কিন্তু একই সঙ্গে সুস্থ কোষকে রক্ষা করার সূক্ষ্ম কৌশলও দরকার। আর সেই কাজের নেতৃত্ব দেন চিকিৎসা পদার্থবিদ বা মেডিকেল ফিজিসিস্ট।
জনবলের অভাবে পরিত্যক্ত রেডিওথেরাপি মেশিন, বঞ্চিত রোগীরা
বাংলাদেশ মেডিকেল ফিজিসিস্ট সোসাইটির (বিএমপিএস) দীর্ঘ প্রচেষ্টায় ২০১৮ সালে সরকারি চারটি হাসপাতালে ১২টি চিকিৎসা পদার্থবিদ পদ সৃষ্টি হয়। কিন্তু সাত বছর কেটে গেলেও নিয়োগ হয়নি একজনও। এদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা আধুনিক রেডিওথেরাপি যন্ত্র বিশেষজ্ঞের অভাবে পড়ে আছে অব্যবহৃত কিংবা অল্প ব্যবহৃত। এর ফলে রোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন সঠিক চিকিৎসা থেকে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, যেখানে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে মেডিকেল ফিজিসিস্ট থাকার কারণে যন্ত্র দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে, সেখানে সরকারি হাসপাতালে এই অভাব পুরো ব্যবস্থাকে ভঙ্গুর করে তুলছে। দক্ষিণ এশিয়ায় রেডিওথেরাপি সেবার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনিম্ন। এ তথ্য কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং রোগীদের জন্য নির্মম বাস্তবতা।
রেডিওথেরাপির অদৃশ্য নায়ক মেডিকেল ফিজিসিস্ট
মেডিকেল ফিজিসিস্টরা ক্যান্সার চিকিৎসার অদৃশ্য চালিকাশক্তি। তাদের কাজ কেবল যন্ত্র পরিচালনা নয়। সঠিক ডোজ নির্ধারণ, চিকিৎসা পরিকল্পনা, যন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণ, রেডিয়েশন সুরক্ষা প্রোটোকল বাস্তবায়ন—এমনকি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন পর্যন্ত সবকিছুই তাদের দক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। তবু তারা থেকে যাচ্ছেন অবহেলিত।
দ্য এশিয়া-ওশেনিয়া ফেডারেশন অব ওরগেনাইজেশন্স ফর মেডিকেল ফিজিক্সের (এএফওএমপি) ভাইস প্রেসিডেন্ট ও বাংলাদেশ মেডিকেল ফিজিকস সোসাইটির (বিএমপিএস) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. হাসিন অনুপমা আজহারী বলেন, ‘প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে যন্ত্র কেনা হলেও কেবল বিশেষজ্ঞের অভাবে তা অকেজো হয়ে পড়ছে। অথচ মেডিকেল ফিজিসিস্ট নিয়োগ দিলে এই যন্ত্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যেত, রোগীরাও পেতেন নিরাপদ ও কার্যকর চিকিৎসা।’
নীতিনির্ধারকদের দায়বদ্ধতা
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের দায়িত্বশীলরা প্রায়ই কাগজপত্রের জটিলতা, চেকলিস্ট বা প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতার কথা বলেন। কিন্তু এর মূল্য চুকাচ্ছেন রোগীরা। চিকিৎসা পদার্থবিদ ছাড়া রেডিওথেরাপি বিভাগ চালানো মানে ঝুঁকি নিয়ে চলা। এটা শুধু অবহেলা নয়, বরং রোগীর জীবনের সঙ্গে অবিচার।
বিশ্ব রেডিওথেরাপি দিবসের বার্তা
Radiotherapy is care, trust, and standing beside patients—এই স্লোগান কেবল শব্দ নয়, বরং এক বাস্তব সত্য। প্রতিটি রোগীরই অধিকার আছে নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা পাওয়ার। কিন্তু বাংলাদেশে মেডিকেল ফিজিসিস্টদের নিয়োগহীনতা সেই অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিশ্ব রেডিওথেরাপি সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রযুক্তি যেমন দরকার, তেমনি দরকার দক্ষ জনবল। মেডিকেল ফিজিসিস্টদের ছাড়া সেই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। তাই এখনই প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ, দ্রুত নিয়োগ এবং সবার জন্য সমান চিকিৎসা নিশ্চয়তা।
ক্যান্সারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুধু রোগীর নয়, বরং গোটা সমাজের। আর সেই যুদ্ধে চিকিৎসা পদার্থবিদদের স্বীকৃতি ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
এমইউ/