স্বাস্থ্যের উন্নয়নে ফিজিওথেরাপিস্টদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি
মেডিভয়েস রিপোর্ট: স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে ফিজিওথেরাপিস্টদের যথাযথ অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, ব্যাপক উন্নতি হলেও স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ শাখা ফিজিওথেরাপি এখনও অবহেলিতই আছে। অথচ অসংক্রামক রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্তদের পুনর্বাসন, ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে এ পেশায় জড়িতদের ভূমিকা অপরিসীম।
আজ সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) সকালে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এ আহ্বান জানান তারা।
অ্যালায়েন্স অব হেলথ রিফর্ম বাংলাদেশের আয়োজনে এই আলোচনা সভা সঞ্চালনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।
প্রারম্ভিক আলোচনায় ঢাবির স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজানা করিম বলেন, অসংক্রামক রোগে আক্রান্তদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় দরকার পড়ে। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত ওষুধ সেবনের পাশাপাশি ফিজিওথেরাপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সে হিসেবে বলা যায়, ফিজিওথেরাপি এমনটি একটি সেবা, যার মাধ্যমে সরাসরি ওষুধ বা অস্ত্রোপচার না করে দীর্ঘ সময় ধরে থেরাপির মাধ্যমে রোগীর জীবন-যাপন মানকে উন্নত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপিস্টদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, এসব রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে আর্থিক বিষয়টিও জড়িত। তারা যদি যথাসময়ে যথাযথ চিকিৎসা না পান, তাহলে সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারেন না। এ কারণে তাদের পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়।
অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন।
তিনি বলেন, চিকিৎসা খাতে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ভূমিকা, পরিধি ও পারস্পরিক সম্পর্ক-মর্যাদাবোধ নিশ্চিত ও নির্ণিত হওয়া দরকার। এ ক্ষেত্রে সবার আগে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করা জরুরি। চিকিৎসকদের মধ্যেও বৈষম্য আছে। সুতরাং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্টদের সবার সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্য প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে চিকিৎসকরা যেমন যেতে পারেন, তেমনি অচিকিৎসকেরও সেখানে যেতে বাধা থাকা উচিত নয়।
চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সংকটে ফিজিওথেরাপিস্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের সঙ্গে ফিজিওথেরাপিস্টদের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। সমস্যাগুলো সমাধান করা দরকার। এই দূরত্ব কমিয়ে আনতে আইইডিসিআরের তত্ত্বাবধানে কয়েকবার বসা হয়েছিল। তবে এরপর বিষয়টি আর এগুয়নি।
এ সময় চিকিৎসা খাতে ফিজিওথেরাপির গুরুত্ব তুলে ধরেন ডা. মুশতাক হোসেন। বলেন, ‘আমার মা খুবই বয়স্ক মানুষ। নিয়মিত ফিজিওথেরাপি ছাড়া আমরা তাকে সচল রাখতে পারতাম না।’
অনুষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্টদের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. তসলিম উদ্দিন।
তিনি জানান, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ১৬ ভাগ মানুষ কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতা নিয়ে বেঁচে আছেন। এই জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন সমন্বিত টিমওয়ার্ক ছাড়া একার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে অতিজরুরি স্বাস্থ্যসেবায়ও ফিজিওথেরাপি উপেক্ষিত বিষয়।
চিকিৎসক-ফিজিওথেরাপিস্ট পেশার সীমা নির্ণয় দরকার
তিনি বলেন, আমি একজন ডাক্তার, উনি থেরাপিস্ট। কিন্তু সমস্যাটা হলো—আমি ডাক্তার হয়েও থেরাপিস্ট হতে চাই, আবার তিনি থেরাপিস্ট হয়ে ডাক্তার হতে চান। আমরা নিজেদের পেশার সীমারেখা ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি, এমনকি সমাজকেও বোঝাতে পারিনি।
ফিজিওথেরাপিস্টদের স্বীকৃত স্বাস্থ্যকর্মী হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ তসলিম উদ্দিন। বলেন, এ ছাড়া তারা আইনগতভাবে চিকিৎসা দিতে পারবেন না। রিহ্যাবিলিটেশন কাউন্সিল স্বাস্থ্যকর্মী স্বীকৃতি দেয়নি, ফলে কার্যকর ভূমিকা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
ডা. তসলিম উদ্দিন রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, আমি নিজে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা করেছি। ফিজিওলজি বিভাগের চেয়ারম্যান থাকাকালে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার কারণে আমাকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। খালেদা জিয়া লন্ডনে কয়েকদিন থেরাপি নিয়ে হাঁটতে সক্ষম হয়েছেন, এ প্রমাণ করে ফিজিওথেরাপির কার্যকারিতা। দেশের ভেতরেও যদি আমরা শক্তিশালী ইনস্টিটিউট ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তুলতাম, রোগীদের বিদেশে যেতে হতো না।
পক্ষাঘাতগ্রস্থদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) চাপ কমানোর জন্য সারাদেশে সরকারি পর্যায়ে ফিজিওথেরাপি বিভাগ খোলার আহ্বান জানান বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন। একই সঙ্গে এই পেশার জড়িত স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে চলা বৈষম্য দূর করারও পরামর্শ দেন তিনি।
উপজেলায় ছোট পরিসরে ফিজিওথেরাপি ইউনিট খোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে অন্তত একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রাখা জরুরি। তাদের অবর্তমানে এসব অঞ্চলে থেরাপি দিচ্ছেন মেডিকেল টেকনোলজিস্টরা।
তিনি আরও বলেন, টারশিয়ারি লেভেলে ফিজিওথেরাপিস্ট, অকুপেশন থেরাপিস্টসহ মাল্টিডিসিপ্লিনারি বা ইন্টারডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রোচে কাজ করা সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে সেই সক্ষমতা তৈরি হয়নি।
অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন বলেন, প্রতিবছর ৮-৯শ’ ফিজিওথেরাপিস্ট বের হলেও দেশে বর্তমানে মাত্র ছয় হাজারের বেশি ফিজিওথেরাপিস্ট আছেন।
সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ বলেন, ‘দিন দিন প্রয়োজন বাড়ছে। জুলাই বিপ্লবে আহতদের পুনর্বাসনেও ফিজিওথেরাপি অপরিহার্য। এক্সিডেন্ট-ইমারজেন্সি বিভিন্ন কারণে ফিজিওথেরাপি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
তিনি আরও বলেন, ‘দেশে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) এবং বাংলাদেশ রিহ্যাব কাউন্সিল নামে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিল আছে। উভয়কে কেন্দ্র করে কীভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করা যায়, সেটি আলোচনা করা হচ্ছে। সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে আমরা আরও অগ্রসর হতে পারবো। মানুষ ভয়াবহভাবে কষ্ট পাচ্ছে। দেশে ফিজিওথেরাপিস্টও আছে, ফিজিক্যাল মেডিসিনও আছে, আবার মেডিকেল টেকনোলজিস্টও আছে। কিন্তু সমন্বয় না থাকার কারণে আমরা কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি পাচ্ছি না।’
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য সাংবাদিকদের সংগঠন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সভাপতি এমএম রাশেদ রাব্বি ফিজিওথেরাপি পেতে জটিলতা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। বলেন, দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ফিজিওথেরাপিস্টের কাছে গিয়েও কাঙিক্ষত সেবা পাননি তিনি। পরে একজন নবীন চিকিৎসকের পরামর্শে এখন সুস্থ জীবন যাপন করছেন।
চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টদের দ্বন্দ্ব-দূরত্ব কমিয়ে আনতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করেন বিএইচআরএফ সভাপতি।
এর আগে যৌথ উপস্থাপনায় একাংশ প্রবন্ধ পেশ করেন অগ্রণী কলেজ অব ফিজিওথেরাপি অ্যান্ড হেলথ সায়েন্সের সহযোগী অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ফিজিওথেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম শাহাদাত হোসেন। আরেক অংশ তুলে ধরেন বিআরবি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ফিজিওথেরাপিস্ট আহমাদুল্লাহ হিল গালিব।
অনুষ্ঠানে কথা বলেন বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ফিজিউথেরাপিস্ট ও স্বাস্থ্য প্রতিনিধিরা।
এমইউ/