ওষুধ প্রমোশনে কোম্পানির বার্ষিক খরচ শত কোটি টাকা: অধ্যাপক সায়েদুর রহমান
মেডিভয়েস রিপোর্ট: শুধু ওষুধ প্রমোশনে কোনো কোনো কোম্পানি বছরে ১০০ কোটি টাকার বেশি খরচ করে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। তার প্রশ্ন, এই টাকা কে দেয়, কোথা থেকে আসে?
আজ শনিবার (৩০ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে বণিক বার্তার উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ-২০২৫’-এ এ মন্তব্য করেন তিনি।
এর আগে অনুষ্ঠানে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের বক্তব্য ঘিরে হট্টগোল তৈরি হয়। স্কয়ার হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এস কে মো. বাহার হোসেন ডা. তাহেরের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করতে উদ্যত হয়েছিলেন অধ্যাপক সায়েদুর রহমান। পরে আয়োজকদের অনুরোধে মঞ্চে ফিরে আসেন তিনি।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন কোম্পানির অডিট রিপোর্ট দেখেছি। আজকে আমি বলতে চাইনি, যেজন্য আমি চলে যাচ্ছিলাম। (ওই) রিপোর্টে দেখা যায়, প্রমোশনাল খরচ কারও কারও একশ’ কোটি টাকারও বেশি। তখন বলা হয়, এটা হলো রিপ্রেজেন্টেটিভের বেতন। তারা কত হাজার? তাদের বেতন কত? আমরা এগুলো বিশ্লেষণ করেছি।’
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, এই পাঁচ তারকা হোটেলে আমরা আসি, একটা সন্ধ্যায় এক কোটি টাকা খরচ হয়। একদম সোজা প্রশ্ন, এটা কে দেয়? ধরে নিলাম, আমরা (চিকিৎসকরা) টাকা নিই না। কিন্তু এক কোটি টাকায় এক সন্ধ্যা, গালানাইট করি তিন কোটি টাকায়। এই টাকা কে দেয়? এটা তো কেউ না কেউ দেয়! কোম্পানি দিতে পারে না। তারা নিশ্চয় এটা ওষুধের ওপর বসায়। এই গালাইনাইটের গান শোনার সময় অথবা ফাইভ স্টারে ভাত খাওয়ার সময় কী আমাদের মনে পড়ে ওই মানুষের কথা?’
বিভিন্ন কোম্পানির অর্থে বিদেশ ভ্রমণ করা চিকিৎসকদের উদ্দেশ্য করে তিনি আরও বলেন, ‘যারা একসঙ্গে স্পেনে যান, আমাদের কাছে তাদের তালিকা আছে। কারা কারা স্পেনে গেছেন, ব্রাজিলে গেছেন, কত দিন গেছেন, সেই টাকা কে পরিশোধ করেছে? অতএব প্লিজ এইভাবে বিতর্ক করবেন না। আমরা স্পষ্ট জানি, জেনেই কথাটা বলছি। কত টাকা আনুমানিক খরচ হয়। আপনি-আমি নিই না। হয় তো এক লক্ষ চল্লিশ হাজারের মধ্যে এক লক্ষ বা এক লক্ষ বিশ হাজার চিকিৎসকই নেন না। কিন্তু তার মানে এই না যে, টাকা নেওয়া হয় নাই।’
তিনি বলেন, ‘আপনারা যে কোনো একটি হোটেলের তালিকা নেন তো গত বছরের। কয়টা অনুষ্ঠান প্রফেশনাল বডি করেছে, দেখেন? কত টাকা প্রফেশনাল বডির অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া হয়েছে, কত টাকা অন্যরা দিয়েছে? এই প্রশ্ন তোলার জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু যেই অবস্থায় আপনি (অধ্যাপক ডা. এস কে মো. বাহার হোসেন) নিয়ে গেছেন, এজন্য আজকে এই কথাটা উঠাতে বাধ্য হলাম। আমাদেরকে এইগুলোর উত্তর চিন্তা করা উচিত।’
অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ‘মূল কথা বলতে চাই, বেসরকারি খাতের উন্নতি এবং সরকারের পাশে চলার জন্য যতটা আরামদায়ক ও সহায়ক পরিবেশ (Congenial Atmosphere) নিশ্চিত করা যায়, ততটুকুই আমাদের করতে হবে। অবশ্যই আমরা একটা বাজে প্রতিশ্রুতিও দেই না। আমরা যে আলোচনা ফার্মা ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে ইফতারির টেবিলে করি, ওটার বাইরে কখনো কোনো কাজ করি না। যে আলোচনা বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির (বাপি) সঙ্গে করি, তার বাইরে আমরা কোনো কাজ করি না।’
স্বাস্থ্যের প্রতিটি বিষয়ে সকল অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে কাজ করেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে সবার মতামত বোঝার করেছি।’
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী বলেন, ‘রাষ্ট্রের উপস্থিতি প্রমাণের জন্য পুলিশ-সেনাবাহিনী যেমন প্রয়োজন, ওইভাবে স্বাস্থ্যে নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। তবে নিয়ন্ত্রণ মানে নিবর্তন নয়, অত্যাচার নয়। নিয়ন্ত্রণ নিবর্তন বা অত্যাচারের পর্যায়ে গেলে অবশ্যই আপত্তিকর। কিন্তু কোন খাতটা নিয়ন্ত্রিত হওয়া দরকার, কোন খাতটা নিরাপদ হওয়া দরকার? যদি একটি খাত নিরাপদ হওয়া দরকার হয়, সেটাই স্বাস্থ্যখাত। নিরাপদ হওয়ার জন্য একটি মাত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামো দরকার। সেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ যেন অত্যাচারী না হয়, যেন দুর্নীতিগ্রস্ত না হয়। নিয়ন্ত্রটা যেন একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্য দিয়ে হয়।’
স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কোনো আইন নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অবিশ্বাস্য সত্য হচ্ছে, বাংলাদেশে সরকারি মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করার জন্য কোনো আইন নেই। এটা আজ পর্যন্ত নেই। আমরা সরকারি-বেসরকারি পার্থক্যটা মুছে দিয়েছি। এখন থেকে সরকারি এবং বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার এক আইন মেনে চলবে।’
সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজর অভিন্ন নীতিমালা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ এক মেট্রিক্সে ইভালুয়েট হবে। খারাপ শোনা গেলেও সত্য, এতো দিন যাবৎ এটা বায়বীয় ছিল। আমরা এটাকে নম্বর হিসেবে উল্লেখ করতে চাই। একটি মেডিকেল কলেজ একশতে কত স্কোর পাচ্ছে, কোন জায়গায় কত পেতে হবে এবং এটা একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হবে। উল্লেখ করা হবে, একটি মেডিকেল কলেজ অবকাঠামোর জন্য কত নম্বর, শিক্ষকের জন্য কত, ল্যাবরেটরির জন্য কত নম্বর পেয়েছে। এটা সকল মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হবে। এভাবে মেডিকেল কলেজলগুলো স্তর বিন্যাস হবে। এখানে সরকারি-বেসরকারি কোনো বিষয় না।
‘পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার, মানের ব্যাপারে আপস করে চিকিৎসক তৈরি হলে, তিনি কতটা ঝুঁকি তৈরি করেন’—যোগ করেন তিনি। বলেন, ‘একটি মেডিকেল কলেজ যদি ‘ডি ক্যাটারি’ নিয়ে তিন বছর চলে এবং তিনশ’ ডাক্তার তৈরি করে, তারা তাদের সারাজীবন রোগীদের মানহীন চিকিৎসা দেন। কত লক্ষ্য মানুষ ওই তিন মেডিকেল কলেজের তৈরি করা চিকিৎসকের ঝুঁকির মুখে পড়বে, তা নিশ্চিত হওয়া না যায় না। সে কারণে দুনিয়াজুড়ে এই বন্দোবস্তগুলো রাখা হয়। এটা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল নাকি, মেডিকেল ডেন্টাল কাউন্সিল—সেটা আলোচনা হতে পারে।’
তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে একই নিয়ম মেনে পরিচালিত হতে হবে। একই শর্ত মানতে হবে। এখানে যিনি সেবাগ্রহণ করতে যাবেন, তাঁকে দুই জায়গা থেকেই একই মানের সেবা পেতে হবে। এক জায়গায় ব্যয় বহন করবে রাষ্ট্র, আরেক জায়গার দায়িত্বে বেসরকারি সেবা সংস্থা, আরেক জায়গায় সম্পূর্ণ রোগী বহন করবে। কাঠামো তিনটা ভিন্ন হতে পারে। মূল্য ব্যবস্থাপনায় পার্থক্য হতে পারে, তবে মানে নয়।
এ সময় সকল হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান এক হওয়ার অপরিহার্যতা তুলে ধরেন অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান। বলেন, ঢাকায় অসুস্থ হওয়া আর কুড়িগ্রামের অসুস্থ হওয়ার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। অতএব ঢাকায় যে মানের পরীক্ষা হবে, এই মানটাই কুড়িগ্রামের নিশ্চিত হতে হবে। ঢাকার পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানই হবে সারাদেশের মানদণ্ড। একেক জেলার মানদণ্ড একেক রকম হতে পারে না। জমির দামে, স্থান ভেদে বিনিয়োগের পার্থক্যের কারণে খরচের পার্থক্য হতে পারে, মানে নয়। তা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে চৌদ্দশ’ ওষুধ আছে, তার মধ্যে তিনশ’ বা তার কাছাকাছি ওষুধে পঁচাশিভাগ চিকিৎসা করা যায়। এটা ১৯৭৭ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত। এই ধারণার আলোকে এই চৌদ্দশ ওষুধের মধ্যে রাষ্ট্র অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলোর দায়িত্ব নিতে চায়। তারা কী অচিরেই এই দায়িত্ব নিতে পারবে? না। ধরলাম এখানে পাঁচ হাজার কোটি টাকার ওষুধ আছে, সরকার এই মুহূর্তে দুই হাজার বা দেড় হাজার কোটি টাকা খরচ করে। তাহলে বাকিটুকু কোত্থেকে যাবে। অবশ্যই বেসরকারি খাত থেকে কিনতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব হচ্ছে, সাধারণ মানুষের কাছে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধগুলো পৌঁছে দেওয়া।
‘রাষ্ট্র এসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ না, নির্ধারণ করে দেবে। মূল্য নির্ধারণে পৃথিবীতে যৌক্তিক আট থেকে ১২টি পদ্ধতি আছে। এর সবগুলো স্বীকৃত। এর কোনটি আমাদের কোন ওষুধের জন্য প্রয়োগযোগ্য সেটা আমরা পৃথিবীর সেরা বিশেষজ্ঞদেরকে এনে আলোচনা করেছি। মূল্য নির্ধারণে ১৯৮৫ সালের মান্নান স্যার যে কাঠামো করেছেন। এর আওতায় ওষুধ শিল্প বিকশিত হয়েছে। গত ৪২-৪৩ বছরে যাদের পাঁচ কোটি টাকার টার্ন ওভার ছিল, তাদের টার্ন ওভার আজকে ১৫শ’ কোটি টাকা। এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে, সরকার চাইবে, একটি শিল্প নষ্ট হয়ে যাক। এর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হোক। নিশ্চয় না। তবে সাধারণ মানুষের প্রাপ্যতা এবং শিল্পের বিকাশ—এর মধ্যে অবশ্যই একটি ভারসাম্য থাকা দরকার’—যোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘ওষুধ শিল্প খারখানাগুলোকে এক জায়গায় রেখে ৫ থেকে ১০টা শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের গ্রোথ কার্ড দেখেন, দেখবেন আকাশ-পাতাল পার্থক্য। বিষয়টি সততার সঙ্গে ভেবে দেখবেন। এটি একটি যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে নিয়ে আসা উচিত। স্বাভাবিক বিকাশের জন্য যা অবশ্যই হওয়া দরকার। একটি কোম্পানরি ওষুধ দুই থেকে তিনশ’র মধ্যে হবে, দুই থেকে চারশ’র মধ্যে হবে। কিন্তু সেটা কত দিনের মধ্যে?’
তিনি আরও বলেন, তিন ধরনের ওষুধের মধ্যে একটি প্রতিরোধমূলক, যা পুরোপুরি রাষ্ট্র বহন করে। এখানে বেসরকারি দাতা সংস্থাগুলো সামান্য পরিমাণ অবদান থাখে। এর পর প্রোমোটিং, যা মোটামুটি ৯০ ভাগই রাষ্ট্র বহন করে। অল্প কিছু বেসরকারি খাত নেয় কিউরেটিভ কেয়ার। মানুষের মূল খরচ কিউরিটিভে। টিকা, ক্যাপসুল ইত্যাদির মাধ্যমে প্রিভেনটিভ এবং প্রোমোটিভটা সরকার নিজে করছে।
দেশের মানুষ সুস্থ থাকলে সকল উন্নয়ন অর্থবহ হবে বলেও মনে করেন তিনি।
অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, দেশের ৮৫ ভাগ মানুষের জন্য তিনশ’ ওষুধ নিয়ন্ত্রণ করবো। বাকি এগারশ’ আপনারা নিয়ন্ত্রণ করেন। তখন আপনারা বলবেন, তাহলে তিনশ’র মূল্যটা সহনীয় পর্যায়ে রাখেন। আমরা কি চাইবো, আপনারা যেই দামে প্যারাসিটামল বানান, তার চেয়ে কম দামে বিক্রি করেন। সুতরাং আমরা বলছি, ৮৫ ভাগ চিকিৎসার জন্য যে ওষুধগুলো লাগে, সেগুলো উৎপাদনে আপনারা মনোযোগ দিন, আর লাভ করার জন্য অবশ্যই বাকি ওষুধগুলো থাকলো। এখন লাভ মানে কী? কত লাভকে লাভ বলা যায়, লাভ বলা উচিত, এই কথাটা চিন্তা করা দরকার। বছরে রিইনভেস্টমেন্ট কত করা উচিত? আপনারা এ ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। এর যৌক্তিক সীমা থাকা উচিত। এ ব্যাপারে নিজেরা আলোচনা করে বলুন। বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতি (বাপি) বলুক যে, যৌক্তিক দাম হতে পারে ২১ শতাংশ বা ১৫-২২ শতাংশ। কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু এটা একটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্যে হোক।
এমইউ/এনএআর/