স্বাস্থ্যের সকল প্রকল্প মূল কার্যক্রমে নিয়ে আসার পরিকল্পনা
সেক্টর কর্মসূচি ছাড়াই স্বাস্থ্যের এক বছর, ২৫ হাজার কর্মীর চাকরি অনিশ্চয়তায়
নবাব আব্দুর রহিম: চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) মেয়াদ শেষ হয়েছে এক বছর আগে। ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো সেক্টর কর্মসূচি ছাড়া একটি বছর অতিক্রম করলো স্বাস্থ্য খাত। এ সময়ে ঢিমেতালে চলছে জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে চলমান বিভিন্ন প্রকল্প। এতে নানা স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ৩৮ অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) চিকিৎসকসহ প্রায় ২৫ হাজার কর্মীর চাকরি অনিশ্চয়তায় পড়েছে। এক বছর বেতন-ভাতা না পাওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাদেরকে।
তবে স্বাস্থ্যখাতের এই পরিচালন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনছে সরকার, এমনটাই জানাচ্ছেন মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা। বলছেন, অপারেশন প্ল্যানভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে সরকারের আর্থিক সামর্থ্য, নাগরিকের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারের আলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে এ খাত। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই দুই বছরের ট্রানজিশন প্ল্যান নেওয়া হয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে ২০২৬ সালে। এ সময়ে সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ থাকায় সৃষ্ট গতিহীনতা পূরণ করা হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, দেশের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে দক্ষ, সাশ্রয়ী ও সমন্বিতভাবে পরিচালনার উদ্দেশ্যে ১৯৯৮ সালে প্রথম সেক্টর কর্মসূচি চালু হয়। পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি স্থায়ী হয় ২০০৩ সাল পর্যন্ত। এরপর ২০০৩-২০১১ দ্বিতীয় এবং ২০১১-২০১৭ সালে তৃতীয় সেক্টর কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি শুরু হয়। করোনাকালে এর মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়। ফলে ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয় চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচি।
মেয়াদ শেষ হলেও নতুন পরিকল্পনা নেয়নি আ.লীগ সরকার
সাধারণত প্রতিটি সেক্টর কর্মসূচির শেষে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সুপারিশে পূর্বের জনবল পরবর্তী কর্মসূচিতে বহাল রাখা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার ভেঙে যাওয়ার এক মাস আগেই চতুর্থ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হলেও তারা নতুন কোনো পরিকল্পনা নেয়নি। আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর এ খাতের হাল ধরেন উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান। এর আগেই সেক্টর কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হলেও স্বাস্থ্যখাত রক্ষায় ওপিসহ পূর্বের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ‘বাধ্য’ হন তারা।
সেক্টর কর্মসূচি (ওপি) কর্মকর্তা ও কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, বর্তমানে ৩৮টি অপারেশন প্ল্যানে মোট ১৯ হাজার ৪৯২ জন কর্মী কর্মরত রয়েছেন। তবে অপর এক পরিসংখ্যান বলছে, ওপির অধীনে বর্তমানে কর্মরত ২৪ হাজার ৬৩৪ জন কর্মী। ওপির বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মীরা বলছেন, গত বছরের জুন পর্যন্ত তারা বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধা নিয়মিত পেয়েছেন। ৪র্থ সেক্টর কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হলে বন্ধ হয়ে যায় তাদের বেতন। এমনকি নিয়মিত অফিস করলেও তারা জানেন না—তাদের চাকরি বহাল আছে কি-না।
ব্যাহত স্বাস্থ্যসেবা, দেশজুড়ে ওষুধ ও টিকার সংকট
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) শাখার অধীনে অপারেশন প্ল্যানের আওতায় জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন হাসপাতালে র্যাবিস ভ্যাকসিন বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু অপারেশন প্ল্যান না থাকায় এসব বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেছে। গত এক মাস ধরে জলাতঙ্কের টিকা পাওয়া যাচ্ছে না চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে। ২৬ জুন থেকে টানা তিন দিন রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালেও ভ্যাকসিন সেবা বন্ধ ছিল। এ ছাড়া দুই মাস ধরে র্যাবিস ইমিউনো গ্লোবিলিন (আরআইজি) মিলছে না হাসপাতালটিতে। এর আগেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জলাতঙ্কের টিকা সংকটের খবর গণমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে।
জানতে চাইলে রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক (ভারপ্রাপ্ত) ডা. আরিফুল বাসার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘র্যাবিস ভ্যাকসিনের সংকট এবার প্রথম হলো। এর আগে একবার সংকটের কাছাকাছি গেলেও আমরা ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম। এবার একটানা তিন দিন আমরা ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করতে পারিনি। ঢাকার বাইরে অনেক জায়গায় ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘কিছু রোগীকে শুধুমাত্র ভ্যাকসিন দিলেই হয় না, তাদের আরআইজিও দিতে হয়। কিন্তু গত দুই মাস যাবৎ আমরা তা পাচ্ছি না।’
এ ছাড়া সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় জন্মের পর থেকে ২৩ মাস বয়সের মধ্যে শিশুদের ১০টি বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু ওপি বন্ধ থাকার কারণে গত বছর থেকেই পিসিভি, আইপিভি, পেন্টা ভ্যালেন্ট, এমআর—প্রভৃতিসহ প্রায় সবগুলো শিশু টিকার সংকট দেখা দেয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে টিকা কেনে সরকার।
এমনকি অর্থ সংকটের কারণে দেশেও চার হাজার ৫৬২টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রে সেবা কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। অনেক কেন্দ্রে বিনামূল্যের ওষুধ মিলছে না। বন্ধ আছে সন্তান প্রসবের আগে জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষাও। অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রগুলোতেও সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ থাকার প্রভাব পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার অভিঘাতে বিঘ্ন ঘটছে অপারেশন প্ল্যানের মাধ্যমে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকল্পে। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা যেমন মিলছে না, তেমনই বিনামূল্যের ওষুধ ও টিকা সাধারণ মানুষকে বাইরে থেকে নিতে হচ্ছে অতিরিক্ত দামে। এতে নাগরিকের স্বাস্থ্যের মানোন্নয়নে সরকারের নানা উদ্যোগ থমকে দাঁড়িয়েছে।
এক বছর বেতন পান না প্রায় ২৫ হাজার কর্মী
সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার পর অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যানের আওতায় কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ প্রায় ২৫ হাজার জনশক্তির চাকরি। এর মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থায় কোনো কোনো প্রকল্পের কর্মীদের বেতন হলেও বঞ্চিত থেকে গেছেন অধিকাংশই। গত বছরের জুন মাসে শেষবার বেতন পেয়েছিলেন তারা। টানা এক বছর বেতন-ভাতা কিছুই পাননি এসব কর্মী। তারা বলছেন, তাদের চাকরি আছে, কি নেই—এমন কোনো নিশ্চয়তাও মিলছে না সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে। এর মধ্যেই দুটি ঈদ অতিবাহিত হয়েছে তাদের। তবে মাস শেষে মাসিক রিপোর্ট আদায় করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রকল্প ছেড়ে গেছেন অসংখ্য কর্মী। অর্থাভাবে বেতনের অপেক্ষায় থেকে মৃত্যুও হয়েছে কারো কারো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছরের ৭ মে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ (সিওমেক) হাসপাতাল শিশু বিকাশ কেন্দ্রের এক কর্মীর মৃত্যু হয়। মেহেরজান বেগম মেরি (২৮) নামের চার মাসের অন্তঃসত্তা ওই নারী কেন্দ্রটির পরিচ্ছন্নকর্মী ছিলেন। এর আগে শিশু বিকাশ কেন্দ্রের আরেক কর্মীর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছেন সহকর্মীরা। এ ছাড়া সারাদেশে কর্মরত শিশু বিকাশ কেন্দ্রের বেশ কয়েকজন কর্মী চাকরি ছেড়েছেন। একই অবস্থা ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্র, অল্টারনেটিভ মেডিকেল কেয়ারসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কর্মীদের।
জানতে চাইলে নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল শিশু বিকাশ কেন্দ্রের শিশু মনোবিজ্ঞানী মো. মশিউর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘পুরো এক বছর বিনা বেতনে সেবা দিয়ে আসছি। নতুন অর্থবছরও শুরু হলো। চাকরির নিশ্চয়তাটুকুও নাই আমাদের। ১২টি মাস অতিবাহিত হলেও সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। আমরা বেতন-ভাতা পাচ্ছি না। যে দেশে মৌলিক মানবাধিকার আদায় করতে হলেও রাস্তায় নামতে হয়, সে দেশের কর্মকর্তাদের কাছে কতটুকু আশা করা যায়?’
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে শিশু বিকাশ কেন্দ্রের মাল্টিডিসিপ্লিনারি সেন্টারের সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর (শিশু মনোবিজ্ঞান) ড. ফায়েজা আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত অবস্থা পরিবর্তিত হচ্ছে। সরকার কখন কোন দিকে যাচ্ছে, সুস্পষ্ট কোনো ধারণা আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। ডিসেম্বরে আমাদের ছয় মাসের বেতন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখনও আমরা সেটি পাইনি। অর্থ মন্ত্রণালয় অর্থ ছাড় না দিলে এটি হওয়া সম্ভব না।’
‘মাস শেষে জানতে চাওয়া হয়, সব কাজ ঠিক আছে কিনা। আমাদের সব কিছু চলমান আছে। আবার ছুটিও দেওয়া হচ্ছে না। আবার বেতন-ভাতা নেই’—যোগ করেন ড. ফায়েজা।
তিনি বলেন, ‘একজন ডাক্তার, একজন সাইকোলজিস্ট, থেরাপিস্ট—যারা নবম গ্রেডের অফিসার, তাদের যদি এ রকম মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়, তাহলে আমরা কোথায় আছি?’
ক্যারিড ওভার ও রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের দাবি
চতুর্থ সেক্টর কর্মসূচির অধীনে অপারেশন প্ল্যানের জনশক্তিকে ৫ম সেক্টর কর্মসূচিতে ক্যারিড ওভার করার প্রস্তাব দিয়েছে সেক্টর কর্মসূচি (ওপি) কর্মকর্তা ও কর্মচারী অ্যাসোসিয়েশন।
প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত চারটি সেক্টর কর্মসূচির আওতায় কর্মরত বিভিন্ন পদের জনবলকে জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী এবং বাৎসরিক ইনক্রিমেন্টসহ ৪র্থ সেক্টর কর্মসূচির সকল জনবলকে ৫ম সেক্টর কর্মসূচিতে ক্যারিড ওভার করতে হবে। এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বিধিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সেক্টর কর্মসূচির আওতায় কর্মরত সকল জনবলকে চাকরিতে যোগদানের তারিখ থেকে সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান ও পদ সৃজনসহ রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে।
ওপির কর্মীদের রাজস্ব খাতে স্থানান্তরে সুপারিশ এসেছে স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনেও। গত ৫ মে প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেওয়া কমিশনের প্রতিবেদনের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো ও কার্যপ্রণালীকে পুনর্গঠন ও বিকেন্দ্রীকরণে বেশ কিছু প্রস্তাব উঠে এসেছে। এতে সেবা ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো শক্তিশালীকরণে উন্নয়ন খাতের কর্মচারীদের অবিলম্বে রাজস্বখাতে আত্মীকরণ এবং ভবিষ্যতে সব নবসৃষ্ট পদ সূচনা থেকেই রাজস্বখাতে সৃষ্টির প্রস্তাব দেওয়া হয়।
একই সাথে লাইন ডিরেক্টরের পরিবর্তে রাজস্বখাতের পরিচালকদের দিয়ে উন্নয়ন কর্মসূচি পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয় ওই প্রতিবেদনে।
সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত সরকারের
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্বে সেক্টর কর্মসূচিতে উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন বেশি ছিল। পরবর্তীতে তাদের অবদান ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে সেক্টর কর্মসূচির সিংহভাগ অর্থায়ন সরকারের নিজস্ব সম্পদ নির্ভর হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার সেক্টর কর্মসূচি থেকে বের হয়ে স্বাস্থ্যের মূল কাঠামোতে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। এ অবস্থায় জুলাই-২০২৪ থেকে জুন-২০২৯ মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবিত ৫ম স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচির অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণ না করে সেক্টর কর্মসূচিভিত্তিক উন্নয়ন ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জনবল, ওষুধ, যন্ত্রপাতি, এমএসআর, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ, সিকিউরিটি প্রভৃতি সেক্টর কর্মসূচির অত্যাবশ্যকীয় খাতের ঝুঁকি এড়াতে জুলাই-২০২৪ থেকে জুন-২০২৬ পর্যন্ত দুই বছরের জন্য কয়েকটি প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হবে। এ ছাড়া ৪র্থ সেক্টর কর্মসূচির দক্ষ ও কারিগরি যোগ্যতাসম্পন্ন জনবলের বেতন ভাতার সংস্থান ও যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণসহ অত্যাবশ্যকীয় সার্ভিসের জন্য তিনটি প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৬ সালের জুন মাসের পরে ওপির জনবল কোনোভাবে চাকরিতে বহাল থাকবে না—এমন সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফর মুঠোফোনে কথা বলতে রাজি হননি। তবে জানান, সেক্টর কর্মসূচি বন্ধ থাকলেও কিছু কিছু প্রকল্প এখনও চলমান আছে। এসব প্রকল্পের রাজস্ব বাজেটের অর্থ ‘এডজাস্ট’ করে চালানো হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সকল প্রকল্পের নিয়ন্ত্রক হবে সরকার
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ট্র্যানজিশনাল প্ল্যানের মাধ্যমে ব্রিজ (সংযোগ) করে এটাকে মন্ত্রণালয়ের কোর অ্যাক্টিভিটিজের মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। এর কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকার নিজস্ব অর্থায়ন করছে, আর কোনো কোনো ক্ষেত্রে দাতাদের সঙ্গে প্রকল্প আকারে ব্রিজিং প্ল্যান করছে।
তিনি বলেন, ‘এখন থেকে অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকবে সরকারের হাতে। সরকার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে, সে অনুযায়ী উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নিবে। প্রকল্পের অগ্রাধিকার পরিবর্তন তো হয়ই। ফলে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা গ্রহণ করবে। সে কারণে একটি ব্রিজিং প্ল্যান করা হচ্ছে, যেটিকে আমরা বলছি ‘ট্রানজিশনাল প্ল্যান’। যেহেতু ২৭ বছর যাবৎ প্রকল্প (সেক্টর কর্মসূচি) চলেছে, তা থেকে বের হয়ে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দুই বছরের এই ট্রানজিশনাল প্ল্যান করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১২ মাস চলে গেছে, আগামী বছর এটি শেষ হবে। তখন সকল প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি সরকারের হাতে থাকবে।’
সেক্টর কর্মসূচি না থাকলেও বড় কোনো অসুবিধা হয়নি বলে দাবি করে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘দুয়েকটা জায়গায় কিছু সমস্যা হয়েছে। অনেকের স্যালারি এবং নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সরবরাহ বন্ধ হয়েছে। তবে এসব ছাড়া মোটা দাগে সরকার তার সামর্থ্য প্রমাণ করেছে।’
টিকা ও সাপ্লাই চেইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সবগুলো টিকা সরবরাহ সরকারের টাকায় হয়, এর সাথে ওপির কোনো সম্পর্ক নেই। র্যাবিস ভ্যাকসিনের মজুদ ফুরিয়ে যায়নি কখনো। এটি সরকার নিজের টাকায় কেনে। বাংলাদেশে কোনো মানুষ কুকুরের কামড় খেয়েছে, কিন্তু র্যাবিস ভ্যাকসিন পায়নি, এই ঘটনা ঘটেনি। সাময়িক কিছু ঘাটতি হয়েছে, তবে অর্থায়নের কারণে এটি হয়নি। মূলত সঠিক সরবরাহ পরিকল্পনার অভাবে মাঝে মাঝে সাপ্লাই চেইন বিঘ্নিত হয়ে যায়।’
প্রকল্পের কর্মীদের বিষয় বিবেচনাধীন
জনবলের বেতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের কর্মীদের আসলে কন্টিনিউ করার কথা ছিল না। তবুও আমরা যেহেতু আগস্টে দায়িত্ব নিয়েছি, ততদিনে এটা কন্টিনিউ করে চলে আসছে, সে কারণে বিষয়টা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে বেতন এখনই নিশ্চিত করা কঠিন। প্রথম কথা, আমরা আগস্টের পরে এসেছি। খুবই স্পষ্ট যে, এটা জুনে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে বাধ্য হয়েছি। সে কারণে গত ১২ মাসের বিষয়টা আমরা চেষ্টা করছি, যতটুকু করা যায়। এগুলো চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, কিন্তু যেহেতু আমরা মনে করেছি, তারা গুরুত্বপূর্ণ কর্মী, সেজন্য কন্টিনিউ করা হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি, যারা কাজ করেছে, তারা যেন বঞ্চিত না হয়।’
বিশেষ সহকারী বলেন, ‘আমাদের কিছু মানুষের বেতন, নির্দিষ্ট দুয়েকটি ওষুধের সরবরাহ অথবা ছোটখাটো যন্ত্রের রিপেয়ার ফ্যাসিলিটি ছাড়া গত ১২ মাসে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে বাকি গ্যাপগুলো কাভার করেছে। আর ব্রিজিং প্ল্যানটা পার হয়ে গেলে সরকার সম্পূর্ণভাবে এটার দায়িত্ব নিয়ে নিতে পারবে। এটা একটা ট্রানজিশনাল অবস্থা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ চার-পাঁচটা ওপির ছোট ছোট সমস্যা হয়েছে। ট্র্যানজিশনাল প্ল্যান পার হয়ে গেলে এগুলো নির্বিঘ্ন রাখা যাবে। বাকিগুলো স্মুথলি চালানো হয়েছে। আমরা এ রকম একটা দায়িত্ব নিয়ে এতগুলো ওপি কন্টিনিউ করা হয়েছে। স্পষ্টত, সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ১২ মাস আমরা ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছি। ঘাটতিগুলো আগামী দুই মাসের মধ্যে পূরণ হয়ে যাবে। যেহেতু ১২ মাস কন্টিনিউ করেছি, আরও ১২ মাস কন্টিনিউ করবো। এরপর থেকে মূলত সরকার রাষ্ট্রের সক্ষমতা অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে। প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে।’
ট্র্যানজিশনাল প্ল্যানের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বলেন, ‘অনেকগুলো কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু কাজ বার্ষিক পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত আছে, এগুলোর প্রক্রিয়া চলছে। এই ধরনের প্রকল্প যে প্রক্রিয়ায় চলে, সেগুলো চলমান। বড় জোর দুই মাস লাগবে প্রশাসনিক ও আর্থিকসহ সামগ্রিক কাঠামোতে আনতে। কোনোটা হয়তো দুই মাস লাগবে, কোনোটা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে।’
প্রয়োজন ও আর্থিক সামর্থ্যের ভিত্তিতে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা হবে জানিয়ে স্বাস্থ্যের বিশেষ সহকারী বলেন, ‘সব কাজ পাঁচ বছরের জন্য, এটা একটা অদ্ভুত আইডিয়া। একটা জিনিস তো সব সময় পাঁচ বছর মেয়াদি হওয়ার দরকার পড়বে না। কোনো কোনোটা এক বছর মেয়াদি হবে, তাৎক্ষণিক করে ফেলতে হবে। কোনোটা তিন বছরে হবে। এখন অগ্রাধিকার, আমাদের আর্থিক সামর্থ্য এবং জনবলের সাথে সামঞ্জস্য করে পরিকল্পনা করা হবে। কোনো প্রকল্পের ওভারল্যাপিং হবে না। কারণ এটি ডিজিটালভাবে তদারকি করা হবে।’
এমইউ
-
৮ ঘন্টা আগে
-
৮ ঘন্টা আগে
-
২১ মে, ২০২৬