আহত ও শহীদ পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান শুরু
মেডিভয়েস রিপোর্ট: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদ পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক সহায়তা প্রদান শুরু করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিটি শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরেই জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে এসব পরিবারকে ১০ লাখ টাকা দেওয়া হচ্ছে। বাকি ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাইয়ে।
সোমবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নিজ কার্যালয়ে ২১টি জুলাই শহীদ পরিবার ও সাতজন আহতের মাঝে আর্থিক চেক হস্তান্তরের মধ্য দিয়ে এ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদগণ ‘জুলাই শহীদ’ নামে অভিহিত হবেন। আর আহতরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ নামে অভিহিত হবেন। আহতদের ক্ষেত্রে জুলাই যোদ্ধা পরিচয়পত্রও দেওয়া হবে সরকার থেকে।
অর্থ সহায়তা প্রদান অনুষ্ঠান উদ্বোধনকালে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সবসময় ভাবি, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে দেশটাকে আমরা নতুন বাংলাদেশ বলার সাহস করছি, তাঁদের এই ত্যাগ কোনো নিক্তি দিয়ে মাপা যায় না।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ও শহীদদের ইতিহাসের স্রষ্টা আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, ‘আপনারা জীবন্ত ইতিহাস। মনের গভীর থেকে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। যে জাতি ইতিহাসকে স্মরণ করতে পারে না সে জাতি জাতি হিসেবে গড়ে ওঠে না।’
শহীদ পরিবার ও আহতের সরকারের অংশ বলেও মন্তব্য করেন ড. ইউনূস। বলেন, ‘আজকে থেকে তারা সরকারের অংশ হলেন। এটা হলো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এর বাইরেও আপনাদের দায়িত্ব সমাজের সবাইকে গ্রহণ করতে হবে।’
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সকল হত্যাকাণ্ড ও গুম-খুনের বিচার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘বিচার তাৎক্ষণিকভাবে করতে গেলে অবিচার হয়ে যায়। বিচারের মূল জিনিসটা হলো এটা সুবিচার হতে হবে, অবিচার যেন না হয়। আমরা অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম বলেই এই সংগ্রাম হয়েছে, এই আত্মত্যাগ হয়েছে। আমরা যদি অবিচারে নামি তাহলে তাদের আর আমাদের মধ্যে তফাৎটা থাকল কোথায়। আমরা অবিচারে নামবো না। যারা অপরাধী তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। যারা অপরাধী নয় তাদের সৎ পথে নিয়ে আসতে হবে।’
এ সময় সাধারণ আওয়ামী সমর্থকদের এ দেশের সন্তান উল্লেখ করে তাদেরও দেশ গড়ার সংগ্রামে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান প্রধান উপদেষ্টা। একই সাথে দেশে যেন কোনো সহিংসতা ও হানাহানি না হয় সেদিকে জুলাইয়ের যোদ্ধাদের সজাগ দৃষ্টি রাখার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমরা জানি, আপনাদের আকাঙ্ক্ষা ছিল আরও আগেই আমরা প্রাতিষ্ঠানিক কাজগুলো করতে পারব। আমাদের আন্তরিকতার কম ছিল না। আমাদের প্রধান উপদেষ্টাসহ সরকারের প্রত্যেকে আপনাদের ন্যায্য সম্মাননা দেওয়ার জন্য কাজ করেছেন। সংকটকালীন সময়ে আমাদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে, সে কারণে আপনাদের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী আমরা করতে পারিনি। এ কারণে আমি দুঃখপ্রকাশ করছি।’
এ সময় তিনটি শহীদ পরিবার ও তিনজন যোদ্ধা বক্তব্য রাখেন। তাঁরা হত্যাকাণ্ডের বিচার, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রাপ্তি, আর্থিক সহযোগিতা ও পুনর্বাসনসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন। জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে এসময় তাঁরা কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, প্রতিটি শহীদ পরিবার এককালীন ৩০ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জুলাইয়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ২০ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এর পাশাপাশি প্রতিটি শহীদ পরিবারকে প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকা করে ভাতা প্রদান করা হবে। শহীদ পরিবারের কর্মক্ষম সদস্যগণ সরকারি ও আধা-সরকারি চাকরিতে অগ্রাধিকার পাবেন।
জুলাই যোদ্ধারা দুটি মেডিকেল ক্যাটাগরি অনুযায়ী সুবিধাদি পাবেন। গুরুতর আহতদের ‘ক্যাটাগরি এ’ অনুযায়ী, এককালীন পাঁচ লাখ টাকা প্রদান করা হবে। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) দুই লাখ টাকা প্রদান করা হবে এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) তিন লাখ টাকা প্রদান করা হবে। এর পাশাপাশি, গুরুতর আহত প্রত্যেক জুলাই যোদ্ধা মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা পাবেন। বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে আজীবন চিকিৎসা সুবিধা প্রাপ্ত হবেন ও মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশে দেশি-বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা পাবেন। তারা কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন সুবিধা পাবেন।
‘ক্যাটাগরি বি’ অনুযায়ী, জুলাই যোদ্ধাদের এককালীন তিন লাখ টাকা প্রদান করা হবে; এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) এক লাখ টাকা প্রদান করা হবে। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে নগদ (ব্যাংক চেকের মাধ্যমে) দুই লাখ টাকা প্রদান করা হবে। এর পাশাপাশি, মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা প্রদান করা হবে; কর্মসহায়ক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরকারি/আধা-সরকারি কর্মসংস্থান প্রাপ্য হবেন।
জুলাই যোদ্ধাদের পরিচয়পত্র প্রদান করা হবে। তারা পরিচয়পত্র প্রদর্শন করে সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সুবিধাদি পাবেন। এখন পর্যন্ত জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ৮৩৪ জন শহীদের তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার। এ ছাড়া আহতদের তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। খুব শিগগিরই তালিকাটি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
এ সময় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ডা. মো. সায়েদুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এমআই/এনএআর/