২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৪ ১১:১৮ এএম

ঢামেকে সফল অস্ত্রোপচার: আলাদা হলো শিশু শিফা-রিফা

ঢামেকে সফল অস্ত্রোপচার: আলাদা হলো শিশু শিফা-রিফা
ঢামেক হাসপাতালে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জোড়া লাগানো থেকে আলাদা হওয়া শিশু শিফা ও রিফা। ছবি সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে বুকে-পেটে জোড়া লাগানো শিশু শিফা ও রিফাকে সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে আলাদা করা হয়েছে। ১০ ঘণ্টাব্যাপী এই অস্ত্রোপচারের পর প্রায় দেড় বছর বয়সী রিফা ভালো থাকলেও কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হওয়ায় শিফা পিআইসিইউতে রয়েছে। সোমবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢামেক হাসপাতালে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা.শাহানূর ইসলাম।

জানা গেছে, গত বছরের ৭ জুন বরগুনা জেলার বেতাগী থানার মাহমুদা একটি হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে বুক-পেটে জোড়া লাগানো অবস্থায় যমজ কন্যা শিশুর জন্ম দেন। এরপর চলতি বছরে ঢাকা মেডিকেলে যোগাযোগ করলে কয়েক মাস পর্যবেক্ষণে রেখে গত ৭ সেপ্টেম্বর ১০ ঘণ্টাব্যাপী সফল পৃথকীকরণ অপারেশন সম্পন্ন হয়। অপারেশন শেষে দুজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয় ভেন্টিলেটরে। তবে শিফার এনাস্টমোসিস ছুটে যাওয়ায় গত ২১ সেপ্টেম্বর পুনরায় অপারেশন করতে হয়েছে।

এই অস্ত্রপচারে শিশু সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান ডা. শাহানূর ইসলামের নেতৃত্বে ৮০ জনের একটি টিম ছিল। পরিবারটি অনেক দরিদ্র হওয়ায় তাদের চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই চিকিৎসার খরচ বহনে এগিয়ে আসে ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, সমাজসেবা অধিদপ্তর, ঢাকা মেডিকেল কলেজ,আকিজ গ্রুপ, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন কর্তৃপক্ষ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট, বিএসএমএমইউ, বারেডেম, ট্র্যান্সফিউশন মেডিসিন ও ল্যাবরেটরি মেডিসিন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক ডা.শাহানূর ইসলাম বলেন, ছয় বছর বয়সী মেয়ের পর জোড়া লাগানো শিশু জন্ম নিলে শিশুর পরিবার চলতি বছরের ১৪ জুন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেই মোতাবেক ২১ জুন শিশু দুটিকে এই হাসপাতালে ৫ম (এ) ইউনিটে ভর্তি করানো হয়। পরীক্ষা নিরীক্ষার পর মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক একমাস পর আসতে বলা হয়। একমাস পর ভর্তি হবার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পূর্ণ হবার পর পুষ্টিজনিত সমস্যা সমাধান দিয়ে একমাস পর পুনরায় দেখা করতে বলা হয় এবং ছয়মাস পর অপারেশনের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

তিনি আরও বলেন, এই শিশু দুটির প্রত্যেকের আলাদা করে মাথা, দুই হাত, দুই পা, মলদ্বার, প্রস্রাবের রাস্তা, যোনিপথ রয়েছে। শুধুমাত্র বুক পেটে জোড়া লাগানো রয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল দুজনের পেরিকার্ডিয়াম, সাধারণ যকৃত নালি, পোর্টাল শিরা, ক্ষুদ্রান্তে ভাগ রয়েছে। রিফা খেতে পারলেও শিফা খেত না, কিন্তু শিফার ওজন বাড়তে থাকে। যার কারণে আমাদের ধারণা হয়, ওদের অন্ত্রে শেয়ার্ড রয়েছে যার প্রমাণ পরবর্তীতে অপারেশনের মাধ্যমে পাই। দুজনের যেহেতু বুক-পেটে জোড়া লাগানো তাই অপারেশনের জন্য আলাদা করার পূর্বে চর্মের স্বল্পতা যাতে না হয় তার জন্য টিস্যু এক্সপান্ডার বসানো হয় গত ৩ আগস্ট। টিস্যু বর্ধিতকরণের পর মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত ৭ সেপ্টেম্বর ১০ ঘণ্টাব্যাপী সফল পৃথকীকরণ অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়।

অপারেশন শেষে দুজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিই) ভেন্টিলেশন দিয়ে রাখা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর রিফাকে ভেন্টিলেটর থেকে বের করা হয়। ৯ সেপ্টেম্বর শিফাকেও ভেন্টিলেটর থেকে বের করা হয়। পরে ১১ সেপ্টেম্বর সকালে শিফার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হলে কার্ডিয়াক এম্বুলেন্সে করে তাকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে ভর্তি করা হয়।

অধ্যাপক শাহানূর ইসলাম জানান, ১৮ সেপ্টেম্বরে হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে শিফাকে ঢাকা মেডিকেলে ফেরত আনা হয়। এরপর রিফা ও শিফার সেলাইগুলো অপসারণ করা হয়। রিফা আল্লাহর রহমতে ভালো আছে। তবে শিফার এনাস্টমোসিস ছুটে যাওয়ায় গত ২১ সেপ্টেম্বর পুনরায় অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। অপারেশন পর এক্সটিউবেট করা হয়েছে এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। ওর রক্তে মারাত্মকভাবে সংক্রমণ রয়েছে। তবে দ্রুতই তাকে কেবিনে দেয়া হতে পারে। ওদেরকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। শিফার ঝুঁকি রয়েছে এবং ওর পর্যায়ক্রমে আরও অপারেশন লাগবে।

এ সময় হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ১৫ জুলাই বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে চিকিৎসা সেবা নিয়ে আমি অনেক ব্যস্ত ছিলাম। তার মধ্যেও শিফা ও রিফার চিকিৎসার বিষয় নিয়ে আমার সাথে সবসময় যোগাযোগ পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহানূর ইসলাম। আমি ধন্যবাদ জানাই শিফা এবং রেফার অস্ত্র প্রচারে যেসব চিকিৎসক জড়িত ছিলেন এবং যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের সকলকে। এই অপারেশনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চিকিৎসা সেবায় উন্নত বিশ্বের মত এক ধাপ এগিয়ে গেল। এর আগেও ঢাকা মেডিকেলে জোড়া লাগানোর তোফা তহুরা লাবিবা ও লামিসার সফল অস্ত্র পাচার এই ঢাকা মেডিকেলেই করা হয়েছে।

এই জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি অস্ত্রপোচারে ছিলেন—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে অধ্যাপক ডা. মো মোজাফফর হোসেন, অধ্যাপক ডা. শুব্রত কুমার মন্ডল, সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোসলেমা বেগম, সহযোগী অধ্যাপক ডা. সিদ্দিকুর রহমান, অধ্যাপক ডা. নূর হোসেন ভুইয়া, সহযোগী অধ্যাপক ডা. এইচ এ নাজমুল হাকিম, সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাওন শাহরিয়ার, হেপাটোবিলিয়ারী সার্জন ডা. বিধান সরকার, আবাসিক সার্জন ডা. রওনক খুরশিদ, থোরাসিক সার্জন অধ্যক্ষ ডা. মো কামরুল আলম। ঢাকা শিশু হাসপাতাল থেকে সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. মকবুল হোসেন, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে সহকারী অধ্যাপক ডা. শামীম উল হাসনাইন ও অন্যান্যরা।

বার্ন, প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জন হিসেবে ছিলেন জাতীয় বার্ণ ইনস্টিটিউট থেকে অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নোয়াজেস খান, সহযোগী অধ্যাপক ডা. কাজী ইমরান, সহকারী অধ্যাপক ডা. মাজহারুল হক ইমরান। কার্ডিয়াক সার্জন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে প্রধান কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক শরিফুজ্জামান, ঢামেক হাসপাতাল থেকে বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. ইসতিয়াক, আহমেদ দিপু। ভাস্কুলার সার্জন ন্যাশনাল হৃদরোগ ইন্সটিটিউট থেকে বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল হাসান মুহাম্মদ বাসার, সহকারী অধ্যাপক ডা. মো মোকলেসুর রহমান।

আরও ছিলেন—ঢামেক হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. ওসমান গনি, আবাসিক সার্জন ডা. গোলাম মুরসালিন, শিশু সার্জারি থেকে অধ্যাপক ও ইউনিট প্রধান ডা: শাহনূর ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক ডা. এ কে এম খায়রুল বাশার, আবাসিক সার্জন ডা. কামরুন্নাহার, সহকারী রেজিস্ট্রার ডা. এন এ এম নাহিদুজ্জামান, ডা. তাসনিয়া তারান্নুম, রেডিওলজী এবং ইমেজিং-এ বারডেম থেকে অধ্যাপক ডা. নুসরাত গফুর, বিএসএমএমইউ থেকে সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারজানা আলম, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অধ্যাপক ডা. সাহারা হক জেরিন, সহকারী অধ্যাপক ডা. সাজিদা নাহিদ, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন থেকে সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. নূরুল আকতার হাসান, ঢামেক হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. অমিত, ডা. মাসুরা মোশাররফ, ট্রান্সফিউশান মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. কাসফিয়া আলম, ল্যাবরেটরি মেডিসিনের সিনিয়র ক্লিনিক্যাল প্যাথলজিস্ট শায়লা সারমিন, মাইক্রোবায়োলজিষ্ট অধ্যাপক সাজ্জাদ বিন শাহিদ, কার্ডিওলজিষ্ট সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আজিজুল হক, নার্সবৃন্দ ও অন‍্যান‍্যরা।

এনএএন/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক