০৭ জুলাই, ২০২৪ ০১:২৩ পিএম

ল্যানসেটে অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজের চতুর্থ গবেষণাপত্র

ল্যানসেটে অধ্যাপক বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজের চতুর্থ গবেষণাপত্র
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত এই গবেষণায় ডা. রিয়াজ কো-অথোর হিসেবে কাজ করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজের একটি গবেষণাপত্র। সাময়িকীটিতে প্রকাশিত এটি তাঁর চতুর্থ গবেষণাপত্র। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তত্ত্বাবধানে সম্পাদিত এই গবেষণায় ডা. রিয়াজ কো-অথোর হিসেবে কাজ করেছেন।

গবেষণাপত্রটির শিরোনাম: National, regional, and global trends in insufficient physical activity among adults from 2000 to 2022: a pooled analysis of 507 population-based surveys with 5·7 million participants. অর্থাৎ '১৮ বা তদূর্ধ্ব বয়সীদের অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমের জাতীয়, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক প্রবণতা'।

জানা গেছে, ২০০০-২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ ১৬৩টি দেশ ও এলাকায় ৫০৭টি জনসংখ্যা ভিত্তিক জরিপ চালানো হয়। সেখান থেকে ৫৭ লক্ষ মানুষের উপাত্ত (Data) ব্যবহার করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সদর দপ্তরের 'অসংক্রামক রোগ, পুনর্বাসন এবং ডিজ‌অ্যাবিলিটি বিভাগের’ উদ্যোগে গবেষণাটি সম্পাদন করা হয়।

গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম (Insufficient physical activity) অসংক্রামক রোগ, শারীরিক ও কগনিটিভ অক্ষমতা, স্থূলতা এবং মানসিক ভগ্নস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে থাকে।

অসংক্রামক রোগ বলতে ক্যান্সার, কার্ডিওভাসকুলার রোগ (উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ইত্যাদি), ডায়াবেটিস ও শ্বাসতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণকে বিবেচনা করা হয়েছে। কগনিটিভ কাজের উদাহরণ হচ্ছে শেখা, চিন্তা করা, স্মরণ রাখা, সমস্যার সমাধান করা ইত্যাদি। বৈশ্বিক একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে যে, ২০১০ সালের তুলনায় বিশ্বে অপর্যাপ্ত পরিশ্রমকারী মানুষের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫% কমিয়ে আনা হবে।

গবেষণার সংক্ষিপ্ত ফল

বিশ্বে ২০২২ সালে অপর্যাপ্ত পরিশ্রমকারী মানুষের হার ৩১.৩%, যা ২০০০ সালের তুলনায় বেশি (২৩.৪%) ছিল এবং ২০১০ সালের তুলনাতেও (২৬.৪%) বেশি। ১৯৭টি দেশ ও এলাকার মধ্যে ১০৩টিতে (৫২%) এবং ৯টি অঞ্চলের মধ্যে ৯টিতে (৬৭%) এই হার বেশি। পুরুষের তুলনায় নারীদের মধ্যে অপর্যাপ্ত পরিশ্রমকারীর হার ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি (নারী ৩৩.৮%, পুরুষ ২৮.৭%)। এভাবে চলতে থাকলে ২০১০ সালের তুলনায় বিশ্বে অপর্যাপ্ত পরিশ্রমকারী মানুষের হার ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫% কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হবে না। তবে দুটো অঞ্চল, ওশেনিয়া এবং সাব-সাহারান আফ্রিকা, এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সঠিক পথে এগুচ্ছে।

গবেষণার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ মেডিভয়েসকে বলেন, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব প্রিভেনটিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনে (নিপসম) কর্মকালীন আমি 'প্রধান গবেষক' হিসেবে অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি নিরূপণ সংক্রান্ত ডব্লিউএইচও স্বীকৃত জরিপ STEPS পরিচালনা করেছিলাম। সেটি ছিল STEPS-এর ৩টি ধাপ সম্পন্ন করে তৈরিকৃত বাংলাদেশের প্রথম গবেষণা। ২০১৮ সালে শুরু করে ২০২০-এ গিয়ে শেষ হয়েছিল। গত বছর ডব্লিউএইচও সদরদপ্তর থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হলো, উপরিল্লিখিত গবেষণাটির বিষয়ে; আমাদের ওই STEPS-এর ডেটা ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হলো এবং আমাকে 'সহ-গবেষক' হিসেবে কাজ করার আমন্ত্রণ জানানো হলো। আমি সাগ্রহে সম্মতি দিয়েছিলাম। ল্যানসেটের বিবেচ্য গবেষণাপত্রটি তার‌ই ফলাফল।

আর STEPS নিয়ে ইতোপূর্বে বিএমজে ওপেনে তাদের আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল। STEPS গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে: অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রমকারীদের শতকরা হার ছিল ২৯.১% (পুরুষ ৩৪.১%, নারী ২৪.৩%)। অর্থাৎ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ২৯ ভাগের বেশি মানুষ অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করে থাকে। একদিনের শারীরিক পরিশ্রমের গড় সময়ের মিডিয়ান ১২০.০। উচ্চমাত্রার পরিশ্রমের কাজে যুক্ত নয়, এমন মানুষের শতকরা হার (২৮.২%)।

অসংক্রামক রোগের সুনির্দিষ্ট 'কারণ' অদ্যাবধি জানা যায়নি। তবে লক্ষণ, বৈশিষ্ট্য বা আচরণজনিত কিছু ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো অসংক্রামক রোগ হ‌ওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

ঝুঁকি ২ প্রকার। যথা, আচরণজনিত এবং জৈবিক; আচরণজনিত ঝুঁকিগুলো হচ্ছে—

ধূমপান ও ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহার, অতিমাত্রায় মদ্যপান, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম।
 
ডব্লিউএইচও’র সংজ্ঞা অনুযায়ী 'অপর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম' বলতে ১ সপ্তাহে ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ভারী কাজ, ৭৫ মিনিট উচ্চমাত্রার ভারী কাজ অথবা এ দুটো মিলিয়ে সমপরিমান কাজ না করাকে বোঝায়।

উচ্চমাত্রার ভারী কাজ (যখন শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন অনেক বেড়ে যায়): যানবাহনে মুটেদের মাথায় করে মালামাল তোলা, নির্মাণ শ্রমিকের মাথায় ইট বহন করা, ক্ষেতে কৃষিকাজ করা, কোদাল দিয়ে মাটি কাটা, রিকশা/ভ্যান গাড়িতে ভারী মালামাল টানা ইত্যাদি। 

মাঝারি মাত্রার ভারী কাজ (যখন শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃদস্পন্দন সামান্য বাড়ে): দ্রুত হাঁটা, কাপড় ধোয়া, টিউব‌ওয়েল জাতা, ঘর ঝাড়ু দেয়া ও সাইকেল চালনা ইত্যাদি।

বিনোদনমূলক ভারী কাজ: ব্যায়াম, ফুটবল খেলা, দৌড়ানো, কুস্তি খেলা ইত্যাদি।

বিনোদনমূলক মাঝারি মাত্রার কাজ: জগিং, সাইকেল প্রতিযোগিতা, ভলিবল, সাঁতার ইত্যাদি। 

গবেষণাপত্রের ফলাফল উদ্বেগের

এ সম্পর্কে অধ্যাপক ডা. বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ বলেন, ‘ল্যান্সেটে গবেষণাপত্রের প্রকাশ আমার জন্য আনন্দের। তবে এর ফলাফল আমাদের জন্য বরং উদ্বেগজনক। অসংক্রামক রোগের আচরণজনিত ঝুঁকিসমূহ জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণে এগুলো পরিবর্তনযোগ্য অর্থাৎ আমাদের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই রয়েছে। আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সমস্ত রোগ তথা এসব রোগপ্রসূত মৃত্যু প্রতিরোধ করা সম্ভব। কাজেই কর্মক্ষেত্রে, বাড়িতে, যাতায়াতে ও অবসর সময়ে শারীরিক পরিশ্রম করতে আমাদের পরিকল্পনা থাকতে হবে, ব্যবস্থা থাকতে হবে, উদ্যোগীও হতে হবে। গবেষণাপত্রে তজ্জন্য বহু পক্ষের সমন্বিত প্রয়াসের কথা সুপারিশ করা হয়েছে।’

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
সাত কর্মদিবসের মধ্যে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহার

ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা নবম গ্রেডের বেসিক

মাসুদ কামালের প্রতি ড্যাবের হুঁশিয়ারি

ক্ষমা না চাইলে আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে প্রস্তুতি নিন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক