রাসেলস ভাইপার: সারাদেশে অ্যান্টিভেনম সরবরাহ চেয়ে আইনি নোটিশ
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বিষধর রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ে মৃত্যুরোধে দেশের প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম সরবরাহ করতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে দক্ষ চিকিৎসক ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশ উপযোগী ভ্যাকসিন উৎপাদনের পদক্ষেপ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে নোটিশে।
আজ মঙ্গলবার (২৫ জুন) জনস্বার্থে এ নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. বাহাউদ্দিন আল ইমরান। নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি সন্ধ্যায় মেডিভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা সচিব মো. জাহাংগীর আলম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর আলম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম এবং ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফকে এই নোটিশ পাঠানো হয়।
নোটিশে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশের বেশ কিছু জেলায় রাসেলস ভাইপার সাপ নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে দেশবাসী উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। অনেকে প্রচার করছেন, সাপটি কামড় দিলে দ্রুত মানুষের মৃত্যু হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাসেলস ভাইপার সাপ মেরে ফেলার প্রচারণাও চালাচ্ছেন অনেকে। রাসেলস ভাইপার খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে। ফলে সহসা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে এই সাপের আধিক্য মানুষের জন্য হুমকি তৈরি করবে বলে ব্যাপক প্রচারণা রয়েছে। ফলে এ নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত ব্যাপক হারে প্রচারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।’
এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েকটি জেলায় রাসেলস ভাইপারের কামড়ে কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার কাছেই মানিকগঞ্জের কিছু এলাকায় গত তিন মাসে বিষধর রাসেলস ভাইপার সাপের কামড়ে অন্তত পাঁচজন মারা গেছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এরপর ভোলাসহ আরও কয়েকটি জেলায় এ ধরণনের সাপ ধরে ফেলার সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। ফলৈ কৃষকরা মাঠে ফসল উৎপাদন-আহরণের ক্ষেত্রে আতঙ্কে দিনাতিপাত করছেন।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসারে সাপের কামড়ের রোগীর চিকিৎসার জন্য স্থানীয় সাপ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি হলে তা সবচেয়ে কার্যকর হয় উল্লেখ করে নোটিশে আরও বলা হয়, ‘অন্য দেশের অ্যান্টিভেনম এই দেশে শতভাগ কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ, একেক দেশের সাপের প্রকৃতি একেক রকম। ভারতে যেসব সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা হয়, সেগুলোর পুরোপুরি বাংলাদেশের সাপের সঙ্গে মেলে না। অথচ বছরের পর বছর ধরে ভারতের অ্যান্টিভেনম দিয়েই বাংলাদেশের সাপের কামড়ের রোগীদের সেবা দেয়া হচ্ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা অ্যান্টিভেনমকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ বললেও বাংলাদেশ এখনও নিজেদের সাপের বিষের অ্যান্টিভেনম বানাতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।’
‘দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন নেই বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গত ২৩ জুন একটি জাতীয় দৈনিকে রাজশাহীজুড়ে ‘রাসেলস ভাইপার আতঙ্ক, নেই পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। যা রাজশাহীসহ সারাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য বড় আতঙ্কের বিষয়।’ যোগ করা হয় নোটিশে।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিতে রাষ্ট্র দায়বদ্ধ উল্লেখ করে এতে আরও বলা হয়, ‘নোটিশপ্রাপ্তির ৭ দিনের মধ্যে সারাদেশের হাসপাতাল, ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন সংরক্ষণ ও প্রচার, ভ্যাকসিন প্রদানকারী চিকিৎসকদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে উন্নত প্রশিক্ষণ, দেশের অভ্যন্তরে পরিবেশ উপযোগী সাপের বিষের প্রতিরোধক ভ্যাকসিন উৎপাদনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করা হলো। অন্যথায় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিকার চেয়ে মহামান্য হাইকোর্টের দ্বারস্থ হবো।
প্রসঙ্গত, দেশব্যাপী পরিচালিত অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনসিডিসি) সাপে কামড়ানোদের ওপর জরিপ চালিয়েছে। ২০২৩ সালে তাদের প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা গেছে, দেশে প্রতি বছর চার লাখ তিন হাজার ৩১৭ জন মানুষ সাপের কামড়ে আক্রান্ত হয়। এতে সাত হাজার ৫১১ জন মারা যায়। মোট আক্রান্তের ৯৫ ভাগই হলো গ্রামে।
এসব সাপের কামড়ের এক চতুর্থাংশ বিষধর সাপের কামড় হয়ে থাকে, যার মাঝে ১০.৬ শতাংশ শারীরিক এবং ১.৯ শতাংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে থাকে। সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে।
২৫ থেকে ৫৫ বছর বয়সী পুরুষেরা বাড়ির আশেপাশে সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাতের ভিতরে সবচেয়ে বেশি সাপের কামড়ের শিকার হন। মানুষ ছাড়া প্রাণীরাও সাপের কামড়ে আক্রান্ত হচ্ছে আশঙ্কাজনক হারে। প্রতি বছর প্রায় ১৯ হাজার গৃহপালিত পশু সর্পদংশনে আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে আড়াই হাজার গৃহপালিত পশু মারা যায়। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়।
এনএআর/
-
২২ জুন, ২০২৪