ডা. রতীন্দ্র নাথ মণ্ডল

ডা. রতীন্দ্র নাথ মণ্ডল

এমবিবিএস, এফসিপিএস (মেডিসিন),
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সহযোগী অধ্যাপক, প্রাইম মেডিকেল কলেজ, রংপুর


১৯ মে, ২০২৪ ০১:৪৭ পিএম

ডাক্তাররা কেন এতো টেস্ট দেন?

ডাক্তাররা কেন এতো টেস্ট দেন?
ছবি: সংগৃহীত

টেস্ট বা পরীক্ষা হলো রোগীর শরীরের রক্ত, প্রসাব, পায়খানা, এক্সরে, আলট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, এমআরআই ইত্যাদি পরীক্ষা করা। এগুলো করা হয় সাধারণত রোগীর রোগ নির্ণয় বা কনফার্ম করার জন্য। রোগটি কোন পর্যায়ে আছে, চিকিৎসায় উন্নতি হচ্ছে কিনা—এসব দেখার জন্যই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়।

আমি এখানে দু’টি রোগীর ইতিহাস বলছি। প্রথম ঘটনা—একবার দুই দিনের জ্বর নিয়ে ৩০ বছর বয়সী একজন রোগী আমাকে দেখালেন। আমি দেখার পর মনে হলো, ভাইরাল জ্বর। রোগীর প্রেসার কম এবং খেতে পারছে না, তাই রুটিন টেস্ট দিয়ে ভর্তি করলাম। ভর্তি হওয়ার ২ ঘণ্টা পর (তখনও রিপোর্ট আসেনি) রোগী হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। খুবই ছটফট করছে, প্রেসার ২০০/১২০, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হলে কিছুক্ষণ পর মারা গেলেন তিনি।

ওই সময় আমি আর ভাগ্যক্রমে মেডিসিনের একজন সিনিয়র ডাক্তার উপস্থিত ছিলাম। রোগী মারা যাওয়ার পর রিপোর্ট আসলো। আমরা দেখলাম প্লাটিলেট ৩০ হাজার। রোগীর স্বজনের কাছে ইতিহাস জানতে চাওয়া হলো। তারা বললেন, গতকাল অনেক জ্বর হওয়ার পর গ্রামের ওষুধের দোকানদার তাকে diclofen ট্যাবলেট দিয়েছিল। রোগীর প্লাটিলেট কম ছিল, তার উপর diclofen খেয়ে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে তিনি মারা গেছেন। মূলত প্লাটিলেট কাউন্ট দেখে তা নরমাল হলে তারপর ব্যথার ওষধ (NSAID) দেওয়া উচিত।

দ্বিতীয় ঘটনা ৩-৪ দিন আগের। এক ডায়াবেটিসের রোগী জ্বর নিয়ে আমাকে দেখালেন। আমার মনে হলো, তার মূত্রনালীতে ইনফেকশন হয়েছে। প্রস্রাবের পরীক্ষা দিলাম। কিডনির টেস্ট আগে করা ছিল। নরমাল ছিল, তাই আর করালাম না। কিন্তু রোগী বাসায় ফিরে গিয়ে দুই দিন পর আবারো হাসপাতালে ভর্তি হলেন। তেমন কোন উন্নতি নেই। কালচার রিপোর্ট দেখার পর অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন করার পরিকল্পনা। এরই মধ্যে ভাবলাম, কিডনি কেমন আছে দেখি।

কিন্তু আগের রিপোর্টটা খুঁজে পেলাম না, তাই কিডনির পরীক্ষাটা আবার করাতে দিলাম। রিপোর্ট আসার পর আমার কোনোভাবেই সঠিক মনে হয়নি, কারণ S. creatinine 12 mg/dl ছিল। ল্যাবে বললাম, রিপিট করো। রিপোর্ট একই আসলো। Serum electrolyes করে দেখলাম hyperkalaemia আছে। রোগীর গতকাল ডায়ালাইসিস করা হয়েছে।

তাহলে এসব টেস্ট কি অকারণে করা হয়েছিল? এই রোগীকে প্রথমেই কিডনির পরীক্ষা দিলে, রোগী বলতেন সামান্য জ্বর নিয়ে এলাম আর ডাক্তার এতগুলো পরীক্ষা অকারণে দিল! আবার রোগী যখন খারাপ হয়ে গেল, তখন রোগীর লোকের ভাষ্য—আপনি আগে কেন কিডনি টেস্ট করালেন না?

শিক্ষণীয় হচ্ছে, ডায়াবেটিস/হাইপ্রেসারের রোগীর মাঝে মাঝে (অন্তত ৬ মাসে ১ বার) এবং যে কোন গুরুতর অসুস্থতায় ভাইটাল অঙ্গগুলো চেক করা উচিত।

এবার আসি পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। আমরা সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষাকে রুটিন বলে থাকি। এগুলো হলো—CBC, RBS, S. creatinine, SGPT, Urine R/E, ECG (after 40 years)

সিবিসি টেস্টে যে তথ্য মেলে

সিবিসি করে আমরা অনেকগুলো তথ্য পাই। যেমন—শরীরে রক্তের পরিমাণ কেমন, শরীরে কোনো ইনফেকশন আছে কিনা, ব্লাড ক্যান্সার আছে কিনা এবং প্লাটিলেট কাউন্ট কেমন, যা কমে গেলে শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। যে কোনো রোগীর এই টেস্ট না করে তার শরীরে সার্বিক অবস্থা বোঝা সম্ভব না।

আরবিএস টেস্টে যে তথ্য পাওয়া যায়

এই পরীক্ষা দিয়ে কারো ডায়াবেটিস আছে কিনা, তা স্ক্রিনিং করি। ১৮ বছর পর এই পরীক্ষা বছরে অন্তত একবার করা উচিত। তবে যাদের বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস আছে আর যাদের ওজন বেশি তাদের বছরে অন্তত দুইবার (ছয় মাস পর পর) করা উচিত। কারো যদি ডায়াবেটিস untreated or uncontrolled থাকে তবে তার কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক ও অন্ধত্বসহ আরো অনেক জটিল রোগ হতে পারে।

S. creatinine টেস্টে যে তথ্য মেলে

এই টেস্ট দিয়ে কিডনি ঠিক আছে কিনা দেখা হয়। কিডনি রোগ যত তাড়াতাড়ি ধরা পরবে, ভালো হওয়ার সম্ভবনা তত বেশি। যাদের ডায়াবেটিস/হাইপ্রেসার আছে, তাদের কিডনি নষ্ট হওয়ার সম্ভবনা বেশি থাকে। তাছাড়া যে কোনো ধরনের ব্যথার ঔষধ (NSAID), কিছু প্রেসারের ঔষধ, কিছু ডায়াবেটিসের ঔষধ, বাত রোগের ঔষধ, ক্যান্সারের ঔষধ দেওয়া যাবে কিনা, কী ডোজে দিতে হবে তা  নির্ভর করে S. creatinine এর উপর। বছরে অন্তত একবার S. creatinine করা উচিত।

এসজিপিটি টেস্টে যেসব তথ্য পাওয়া যায়

এসজিপিটি টেস্ট করে সাধারণত লিভারে কোনো প্রদাহ আছে কিনা বা লিভার স্বাভাবিক আছে কিনা তা দেখা হয়। জন্ডিস হলে, ব্যথার ঔষধ, কিছু ডায়াবেটিসের ঔষধ, বাত রোগের ঔষধ, ক্যান্সারের ঔষধ দেয়ার আগে এই টেস্ট করা উচিত।

Urine R/E টেস্টে আমরা কী কী তথ্য পাই?

Urine R/E এটি খুবই সাধারণ একটি পরীক্ষা; কিন্তু খুবই ইনফরমেটিভ। এটি দিয়ে প্রসাবে ইনফেকশন আছে কিনা, কিডনিতে কোনো সমস্যা আছে কিনা, কিডনীতে কোনো পাথর আছে কিনা, ডায়াবেটিস আছে কিনা—ইত্যাদি জানা যায়। এছাড়াও কারো কিডনিতে সমস্যা কেবল শুরু হয়েছে কিনা—তাও বোঝা যায়।

ইসিজি টেস্টে আমরা কী কী তথ্য পাই?

গত সপ্তাহে এক ডায়াবেটিস রোগী দেখেছিলাম, যিনি ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন ঔষধ খাবার আর দরকার নেই। তার ডায়াবেটিসের পরীক্ষা, কিডনীর পরীক্ষা আর ইসিজি করতে দিলাম, ইসিজিতে Recent anterior MI আসলো। ইকো করার পর Ischaemic cardiomyopathy আসলো। ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেসারের রোগীর বছরে অন্তত একবার ইসিজি করা উচিত। কারণ হার্ট  অ্যাটাক বয়স্ক এবং ডায়াবেটিসের রোগীর বুকে কোন ব্যথা ছাড়াই হতে পারে।

আমার নন-মেডিকেল বন্ধুদের বলছি, কেউ যদি এসব টেস্ট (CBC, RBS, S. creatinine, SGPT, Urine R/E, ECG) করেন, তাহলে ভাববেন না আর জীবনেও এসব করা লাগবে না। আপনি যদি আজ সব টেস্ট করেন আর কালকেই যদি আপনার বুকে ব্যথা হয়, তবে আবারো ইসিজি করতে হবে। দয়া করে ভুল বুঝবেন না। ডাক্তার যে টেস্ট করতে দেন তা আপনার জন্যই, আপনার চিকিৎসার জন্যই।

আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের বলছি, তোমরা কোন রোগীকে চিকিৎসা দেবার আগে সবসময় চেষ্টা করবে রুটিন পরীক্ষাগুলো করাতে। কারণ একটা জিনিস মনে রাখবে, মেডিকেল সায়েন্সে হিরো কখনো তুমি হতে পারবে না, কিন্তু তোমার এক ভুলে তুমি জিরো হয়ে যাবে। রোগীকে পরীক্ষা করাতে বলবে, রোগী যদি করতে না চায়, চিকিৎসা দিবে।

রোগী ভালো না হলে তোমাকে বেশি চার্জ করবে না, কারণ চিকিৎসার দরকারি পরীক্ষা তারা করাননি। কিন্তু তুমি যদি পরীক্ষা না করাতে দাও, আর রোগীর উন্নতি না হয় বা ঔষধের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয়, তবে তোমার ঘাড় ধরে বলবে- আপনি কেন পরীক্ষা না করিয়ে চিকিৎসা দিলেন?

সবার জন্য বলছি, আপনি আপনার টিভি, ফ্রিজ, বাইক, গাড়ি মাঝে মাঝে চেক করেন, সার্ভিসিং  করেন; নিজের শরীরটাও বছরে একবার সার্ভিসিং করুন। বছরে একবার CBC, RBS, S. creatinine, SGPT, Urine R/E, ECG, Fasting lipid profiles করে একজন জেনারেল ফিজিশিয়ানকে (এমবিবিএস) দেখান। এসবের জন্য ৩ হাজার টাকার বেশি খরচ হবে না। নিজের জন্য বছরে অন্তত ৩ হাজার টাকা খরচ করুন, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক ভালো থাকবেন।

এনএআর/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : মেডিকেল টেস্ট
রাজধানীতে জামায়াতের মানববন্ধনে হুঁশিয়ারি

বাজেট বৈষম্য ও স্বাস্থ্যে অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না

রাজধানীতে জামায়াতের মানববন্ধনে হুঁশিয়ারি

বাজেট বৈষম্য ও স্বাস্থ্যে অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত