গেঁটেবাত: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা
গেঁটে বাত বা গাউট (ইংরেজি: Gout) হচ্ছে একটি প্রদাহজনিত রোগ; এতে সাইনোভিয়াল অস্থিসন্ধি ও এর আশেপাশের টিস্যুতে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট ক্রিস্টাল জমা হয়। সাধারণত মাত্র ১-২% লোক এই রোগে আক্রান্ত হয় তবে মহিলাদের তুলনায় পুরুষেরা ৫ গুণ বেশি আক্রান্ত হয়।
আমাদের শরীরে রক্তের মধ্যে ইউরিক এসিড নামে এক প্রকার উপাদান থাকে। এই ইউরিক এসিডের মাত্রা বেড়ে গেলে বিভিন্ন অস্থি-সন্ধি বা জয়েন্টে প্রদাহ হয়। এই প্রদাহকে গেঁটেবাত (গাউট) বলা হয়। ছেলেদের এই অসুখ বেশি হয়। যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল তাদের এই রোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি।
বিভিন্ন কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়। এসবের মধ্যে আছে—
১. দেহের অতিরিক্ত ওজন
২. প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেশি গ্রহণ
৩. মদ্যপান
৪. কিডনির অসুখ
৫. জেনেটিক বা পারিবারিক
৬. পলিসাইথেমিয়া বা লোহিত রক্ত কণিকা বেড়ে যাওয়া
৭. বিভিন্ন ওষুধের ব্যবহার
৮. হিমোলাইটিক এনিমিয়া ইত্যাদি।
গেঁটে বাতের লক্ষণ
গেঁটে বাতে বিভিন্ন উপসর্গ দেখা যায়। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পায়ের বুড়ো আঙুলের গোড়া ফুলে লাল হয়ে যায়। ভয়াবহ ব্যথা হয়। রোগী আক্রান্ত স্থান হাত দিতেই দেয় না। অন্যান্য জয়েন্টও ফুলে যেতে পারে এবং হাড় ও তরুণাস্থি ক্ষয় হতে থাকে। মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট নামে এক ধরনের ক্রিস্টাল জয়েন্টে জমে জয়েন্ট ফুলে যায়। জয়েন্টের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা আস্তে আস্তে হারাতে থাকে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
ভালোভাবে রোগের ইতিহাস নিয়ে রোগীকে শারীরিক পরীক্ষা করে এবং কিছু টেস্টের মাধ্যমে সহজেই এ রোগ নির্ণয় করা যায়। ল্যাবরেটরি টেস্টের মধ্যে রক্তে ইউরিক এসিডের লেভেল দেখা হয়। জয়েন্ট থেকে সাইনোভিয়াল ফ্লুইড বের করে অ্যানালাইসিস করলে মনোসোডিয়াম ইউরেট মনোহাইড্রেট ক্রিস্টাল পাওয়া যায়। এটি পেলে গেঁটে বাত রোগ নিশ্চিতভাবে ডায়াগনোসিস করা যায়। এ ছাড়া আক্রান্ত জয়েন্টের এক্স-রে করা হয়। এর ফলে অন্য কোনো রোগ আছে কিনা, তাও বোঝা যায়।
হঠাৎ গেঁটে বাতে আক্রান্ত হলে ননস্টেরয়েডাল এন্টিইনফ্লামেটরি ড্রাগ যেমন—ন্যাপ্রোক্সেন, ডাইক্লোফেনাক ও ইনডোমেথাসিন দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। এসব ওষুধ ব্যথা নিরাময়ে ভূমিকা রাখে। মুখে খাওয়ার ওষুধ কলচিসিন ব্যথা কমাতে খুব কার্যকর। তবে এই ওষুধে বমি ও ডায়রিয়া হতে পারে। তীব্র ব্যথার সময় আক্রান্ত জয়েন্ট থেকে ফ্লুয়িড বা তরল পদার্থ বের করে আনলে রোগী আরাম বোধ করেন। অনেক সময় জয়েন্টে ইনজেকশনের সাহায্যে স্টেরয়েডও দেয়া লাগতে পারে।
রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেলে, তা জয়েন্টে জমা হয়ে গেঁটে বাত হয়। খাসির মাংস বা লালজাতীয় মাংস কম খেতে হবে। এ ছাড়া শিম, মটরশুটি, মাশরুম, মাছের ডিম, কলিজা, অ্যালকোহলের পরিমাণ বেশি খেলে রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ বাড়তে পারে। তাই এসব খাবার কম খেতে হবে। ইউরিক এসিড কমানোর বিভিন্ন ওষুধ পাওয়া যায়। চিকিৎসক প্রয়োজন মনে করলে সেসব দিয়ে থাকেন।
গেঁটে বাত খুব পরিচিত অসুখ। তাই এই অসুখের ব্যাপারে সবারই সচেতনতা দরকার।