ডিন নির্বাচন
বিএসএমএমইউ শিশু অনুষদের উন্নয়নে অধ্যাপক সঞ্জয় কুমারের পরিকল্পনা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: আগামী ৭ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ডিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন পাঁচজন স্বনামধন্য অধ্যাপক। তাঁদেরই একজন নিওনেটোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে, যিনি একাধারে গবেষক, একাডেমিশিয়ান ও সংগঠক হিসেবে ইতিমধ্যে যথেষ্ট আলো ছড়িয়েছেন। নিজ বিভাগ ও বিভিন্ন সংগঠনের অর্পিত দায়িত্ব নিষ্ঠা ও সফলতার সঙ্গে নিরলসভাবে পালন করে যাচ্ছেন এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে প্রখ্যাত এ নবজাতক রোগ বিশেষজ্ঞের মুখোমুখি হয় মেডিভয়েস। একান্ত আলাপচারিতায় তুলে ধরেন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রেক্ষাপট ও ডিন হিসেবে বিজয়ী হলে তাঁর কর্মপরিকল্পনার নানা দিক। বলেন, ডিন হতে যে ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন, সবই রয়েছে তাঁর।
অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, বিএসএমএমইউ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যে সংবিধান বা নিয়মনীতি রয়েছে, তার মধ্যে ডিন নির্বাচন একটি। ডিন দুই বছর মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালে ফ্যাকাল্টি অব পেডিয়াট্রিক আত্মপ্রকাশ করে। এটি প্রতিষ্ঠার পর প্রথম একটি নির্বাচন হওয়ার কথা ছিলো। সেখানে দুই জন প্রার্থী ছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে বুঝাপড়ার কারণে নির্বাচন হয়নি। এর পরে যারা ডিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, তারা ছিলেন মনোনীত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, বিএসএমএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. শারফুদ্দিন আহমেদ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সেক্টরে নির্বাচন পরিচালনা করছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ডিন নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছেন তিন। কিছু দিন আগে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) প্রতিনিধি নির্বাচন হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রতিনিধি যাতে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আসেন, সে সংস্কৃতি তিনি প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন।
অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে ২০১০ সালে বিএসএমএমইউতে সহকারী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। পর্যায়ক্রমে অধ্যাপক হয়েছেন তিনি। প্রায় ১৩ বছর বিএসএমএমইউতে কর্মরত রয়েছেন। নিওনাটোলজির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন গত আড়াই বছর ধরে।
ডিনের কাজ
তিনি বলেন, ডিন একটি একাডেমিক পোস্ট। বিএসএমএমইউ পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন কোর্স পরিচালনা করে। ডিনের কাজ হচ্ছে কোর্সের ছাত্রদের একাডেমিক, গবেষণা ও শিক্ষকদের ভালোমন্দের বিষয়গুলো দেখাশোনা করা। ডিনের কাজের ধরন শিক্ষার বিষয়ে শিক্ষক ও ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব করা।
সঞ্জয় কুমার দের যত অর্জন
২০২২ সালে ডব্লিউএইচওর যে গাইডলাইন করা হয়, সেখানে নবজাতকের স্বাস্থ্যের বিষয়ে কয়েকটি পরিবর্তন আসছে। সেটির সাউথ ইস্ট এশিয়ান রিজনের বাংলাদেশ থেকে টেকনিক্যাল এডভাইজার কমিটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে। এটিকে টেকনিক্যাল এডভাইজারি গ্রুপ বলা হয়, যা একটি সম্মানজনক অবস্থান।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে এ পর্যন্ত তাঁর ৭১টি পাবলিকেশন রয়েছে। ল্যানসেটের মতো বিখ্যাত জার্নালেও পাবলিকেশন আছে সঞ্জয় কুমারের। প্লসওয়ানে দুইটি পাবলিকেশন রয়েছে এবং তিনি সেখানে একাডেমিক এক্সিকিউটিভ হিসেবে কাজ করছেন। শুধু তাই নয়, বাংলা জার্নাল অব চাইল্ড হেলথ, এটি বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের একটি জার্নাল, যেটিকে অফিসিয়াল অর্গান বলা হয়। এ জার্নালের এডিটর হিসেবে কাজ করছেন তিনি।
বিএসএমএমইউর গবেষণা এবং ইনস্টিটিশনাল রিভিউ বোর্ড, যেটি প্রোটোকলগুলো রিভিউ করে। যোগ্যতার কারণে প্রশাসন তাকে সে দায়িত্ব দিয়েছেন। গত ১৩ বছর ধরে বিএসএমএমইউর বোর্ডের সদস্য হিসেবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গত মাসে চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (সিএইচআরএফ) সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। এ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক সমীর কুমার সাহা। সমীর কুমার সাহা একুশে পদক প্রাপ্ত একজন অনুবিজ্ঞানী।
সঞ্জয় কুমার দের নেতৃত্ব গুণ
যে কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান চালাতে গেলে লিডারশিপের প্রয়োজন পড়ে। বাংলাদেশ পেডিয়াট্রিক এসোসিয়েশনের সঙ্গে অনেক দিন ধরে জড়িত অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার দে। সাইন্টিফিক সেক্রেটারি হিসেবে দুইবার এসোসিয়েশনে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বাংলাদেশ জার্নাল চাইল্ড হেলথের এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এ বিশেষজ্ঞ। নিওনাটোলজিস্টদের একটি সংগঠন আছে বাংলাদেশ নিওনেটোল ফোরাম। এ ফোরামের সেক্রেটারি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেনি তিনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ প্যারিডন্টাল সোসাইটি, যেটি নিউবর্ন এবং প্রেগনেন্ট মাদার দুটি পক্ষের লোকজন এখানে থাকেন। তিনি ওই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।
নির্বাচনে সঞ্জয় কুমার দে’র অঙ্গীকার
অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার দে বলেন, নির্বাচিত হলে রেসিডেন্ট এবং ফ্যাকাল্টির শিক্ষকদের উন্নতির জন্য কাজ করবো। এটি আরও কিভাবে উন্নত করা যায়, তার জন্য একটি স্লোগান তৈরি করেছি, ‘কোলাবোরেশন ফর কোয়ালিটি’। আমি একা যথেষ্ট নই, মানুষ একা কোনো কাজ করতে পারে না। সবাই মিলে কাজ করবো। নির্বাচনে যখন ভোট চাইতে যাই, সবার প্রতি আমার দাবি হলো—আমি প্রতিনিধি হতে ভোট চাইতে এসেছি, তবে নির্বাচিত না হলেও সবার সঙ্গে কাজ করে যাবো। যখন নির্বাচিত ছিলাম না, তখনও কাজ করেছি, ভবিষ্যতেও করে যাবো। আমরা সবাই এক সঙ্গে চলতে চাই।
মানোন্নয়নে সমন্বিত প্রচেষ্টা
অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার বলেন, ডিন হতে হলে একাডেমিশিয়ান, গবেষক ও লিডার হতে হয়। এখানে চলমান রেসিডেন্সি প্রোগ্রামকে আমি ধারণ করি। কারণ ২০০১ সালে যখন রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম যখন শুরু হয়, আমি প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলাম। সেই হিসেবে এ কোর্সের সঙ্গে আমার আবেগ জড়িত। আমি মনে-প্রাণে চাই রেসিডেন্সি কোর্সটা বিশ্বমানের হোক। আমি সিঙ্গাপুর থেকে প্রশিক্ষণ করে আসছি। ওখানের রেসিডেন্সি ও ভারতের রেসিডেন্সি কোর্স দেখেছি। স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইনের জন্য সুপারবাজেটশিপ যেটা হয়, সেটা আমি শক্তিশালীভাবে মেইনটেইন করি।
তিনি আরও বলেন, ম্যানেজার অব দি মানথ একটা পোস্ট আছে, এটি মেডিকেল কলেজের সহকারী রেজিস্ট্রারের মতো একটি পোস্ট। নিওনেটলোজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সহিদুল্লাহ এ পদের অনুমোদন দেন। আমাদের ডিপার্টমেন্টে প্রথম শুরু করেছিলাম। এখানে সিনিয়র রেসিডেন্টরা ম্যানেজার হন। তিনি ডিপার্টমেন্টে রোগী ভর্তি, চিকিৎসা প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য যে বিষয়গুলো আছে, সেগুলো দেখভাল করেন। বর্তমানে বিএসএমএমইউর প্রতিটি ডিপার্টমেন্টে ম্যানেজার অব দি মানথ চালু আছে, এটি খুব কাজ করছে।
অনলাইন শিক্ষা যুগোপযোগীকরণ
কোভিডকালীন থেকে অনলাইন লার্নিং ও টিচিং একটি পপুলার বিষয়ে হিসেবে দাঁড়িয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিএসএমএমইউর পেডিয়াট্রিক ফ্যাকাল্টির অধীনে ৭টি ডিপার্টমেন্ট চালু আছে। প্রথমে আমরা নিওনাটোলজিতে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইন্সের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে ডব্লিউএইচওর সাপোর্টে অনলাইন প্রোগ্রাম চালু করেছি, সেটি এখনও চালু আছে। এর সুবিধা হচ্ছে, এর মাধ্যমে আমাদের প্রশিক্ষণার্থীরা ইন্ডিয়াতে কি হচ্ছে, ওখানের প্র্যাক্টিস কেমন, আমাদের এখানে কেমন আপগ্রেডেশন হবে, সে জিনিসগুলো সহজে বুঝতে পারছে। ছাত্রদের জন্য অনলাইন লার্নিংয়ের বিষয়টিকে যোগপোযোগী করার জন্য আমি চেষ্টা করে যাবো।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা
শিক্ষকদের যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার। তিনি বলেন, মেডিকেল শিক্ষক হিসেবে এখানে যারা নিয়োগ পান, তাদের শিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠার যে প্রক্রিয়া সেটি চালু নেই। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষদের ট্রেনিং আছে, হাইস্কুলের শিক্ষকদের ট্রেনিং আছে। মেডিকেল সাইন্সে এখন শিক্ষদের ট্রের্নিং চালু হয়েছে। বিএসএমএমইউতে আমরা দাবি করে আসছি যে, প্রত্যেক শিক্ষক যোগদানের পর তাকে শিক্ষক হিসেবে গড়ে উঠার জন্য কমপক্ষে ৬ মাস মেডিকেল ট্রেনিং দেওয়া উচিত। শিক্ষক কিভাবে ক্লাস নেবেন, কিভাবে চলবেন এগুলো প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিখবেন। আমার অঙ্গীকার হলো, যোগদানের পর সব শিক্ষককে ট্রেনিংয়ের উদ্যোগ নেবো। ভিসি স্যারকে বিভিন্ন সময় মিটিংয়ে বলে আসছি।
শিক্ষক কল্যাণ তহবিল
শিক্ষকদের ওয়েল ফেয়ার ফান্ডের খুব প্রয়োজন। তাঁরা বিপদে পড়লে আমরা যাতে সহযোগিতা করতে পারি, সেজন্য আমরা কন্টিবিউটরি ফান্ড করবো।
আর্কাইভ ব্যবস্থা চালু
যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে আমরা জানতে পারি তার মিউজিয়াম বা আর্কাইভের মাধ্যমে। আমি শিক্ষদের জন্য মিউজিয়াম বা আর্কাইভ করবো।
গবেষণা সেল গঠন
বিএসএমএমইউতে অনেকগুলো গবেষণা চলছে। গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০০ কোটি টাকার ফান্ড দিয়েছেন। বিএসএমএমইউর ১৪ জন ফ্যাকাল্টি গবেষণা গ্রান্ট পেয়েছেন। ফ্যাকাল্টি অব পেডিয়াট্রিকসের ৫টি গ্রান্টের মধ্যে নিওনেটোলজি ৪টি গ্রান্ট পেয়েছে। নিরপেক্ষ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে আমরা এগুলো পেয়েছি। ফ্যাকাল্টি অনুযায়ী গবেষণা সেল গঠন করা হলে, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা সহযোগিতা ও ভালো সুযোগ-সুবিধা পাবেন।
প্রশ্ন ব্যাংকের উন্নয়ন সাধন
শিক্ষার্থীদের আরেকটি বিষয় আছে প্রশ্ন ব্যাংক। এটি বড় একটি ইস্যু। প্রশ্ন ব্যাংক থেকে কিভাবে নতুন আপগ্রেড প্রশ্ন তৈরি করা যায়, সেটি আমার চিন্তায় আছে।
স্কিল ল্যাব প্রতিষ্ঠা
আমরা কাজ করে যাই, আমাদের মুখস্ত বিদ্যা আছে। কিন্তু হাতের কাজ যেটা, সেটি যদি ভালো না জানা যায়, সে কখনো ভালো চিকিৎসক হতে পারবে না। আমাদের বর্তমান প্রশাসনেরও কমিটমেন্ট আছে স্কিল ল্যাবের বিষয়ে। এটি প্রক্রিয়াধীন। এখন ফ্যাক্যাল্টি অনুযায়ী আমরা একটি স্কিল ল্যাব প্রতিষ্ঠা করবো।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ধরেন একটি রোগীকে আপনি আইভি ক্যানালা দিবেন, সেই আইভি ক্যানালা রোগীর ওপর প্র্যাক্টিস করা যায় না। এটি অনেক বেশি সেনসেটিভ। এটি স্কিল ল্যাবের মাধ্যমে সাইমুলেটরের সাহায্যে আমরা রেসিডেন্টদের বিভিন্ন স্কিল শিখোনোর ব্যবস্থা করবো।
মিলেমিশে কাজ করবো
সবাইকে নিয়ে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, নির্বাচিত হলে এ কমিটমেন্টগুলো বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবো। পাঁচ জন এখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। আমাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা আছে, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। সম্মানিত ভোটারগণ যথেষ্ট বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন। বিচার বিবেচনা করে তারা সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীকে বিবেচনা করবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এএইচ/এমইউ