ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা
এমবিবিএস; বিসিএস (স্বাস্থ্য), এফসিপিএস (গাইনি এন্ড অবস্)
ফিগো ফেলো (ইতালি)
গাইনি কনসালটেন্ট,
পপুলার ডায়াগনোস্টিক সেন্টার, বগুড়া
কালচারাল সেক্রেটারি, ওজিএসবি, বগুড়া
১৬ জুন, ২০২৩ ০৩:১৮ পিএম
নবজাতকের মৃত্যু: চিকিৎসকের অবহেলা নাকি হাসপাতালের ব্যবসায়িক মনোভাব দায়ী
আমি জানি না সেন্ট্রাল হাসপাতালের প্রকৃত ঘটনাটা আসলে কি? তবে আমার বাকী সহকর্মীদের মতো আমিও জানতে চাই। কেননা, নরমাল ডেলিভেরি আমাদের অবস্ট্রেটিসিয়ানদের জীবনে রোজকার নরমাল ব্যাপার। এখন, এ করতে গিয়ে যদি জেলের ভাত খেতে হয়, তবে আমাদের এবনরমালই ভালো। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কথা তো ভাবতেই পারি, তাই নয় কি?
কোন চিকিৎসক সজ্ঞানে চাইবেন না যে, তার রোগী বা বাচ্চা খারাপ হোক। কেননা, অন্য সবকিছুর চেয়ে আমাদের কাছে রোগীর জীবনের গুরুত্ব অনেক অনেক বেশি।
কর্পোরেট হাসপাতালের ব্যবসায়িক মনোভাব থাকতেই পারে। কিন্তু তার সাথে চিকিৎসকের মানসিকতা বা কার্যক্রম মেলানো রীতিমতো অশোভনীয়।
চিকিৎসকদের আইনের আওতায় আনার আগে যথেষ্ট প্রমাণাদি জনসম্মুখে আনা উচিত ছিল। নতুবা ভবিষ্যতে ডাক্তাররা তো বটেই, ক্ষেত্রবিশেষে ডাক্তারের চেয়ে রোগীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। কেননা, এমন উদাহরণ থাকলে কোনো চিকিৎসকই ঝুঁকি নিয়ে নরমাল ডেলিভেরি করাবেন না।
এর আগেও আমি বহুবার বহু জায়গায় উল্লেখ করেছি, নরমাল ডেলিভেরি নামে নরমাল হলেও এটি যেকোন মুহূর্তেই ঝুঁকিপূর্ণ অর্থাৎ এবনরমাল হতে পারে।
আমরা যারা অবস্ট্রেটিসিয়ান, তাদের এখনই সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
প্রথমতঃ যেকোনো মুহূর্তে নরমাল ডেলিভেরি যে কতোটা এবনরমাল রূপ প্রদর্শন করতে পারে, রোগীকে তা পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বুঝিয়ে অতঃপর এ ব্যাপারে অগ্রসর হতে হবে। প্রতিটা স্টেজ, সময়ের সীমাবদ্ধতা,প্রতিটা ধাপের জটিলতা, এমনকি প্রসব পরবর্তী জটিলতাসমূহও এ টু জেড বুঝিয়ে বলতে হবে। সব বুঝে রাজি হলে, তবেই নরমাল ডেলিভেরির সিদ্ধান্ত গ্রহণ আবশ্যক।
দ্বিতীয়তঃ প্রতিটি নরমাল ডেলিভেরি যে আমাদের এটেন্ড করা সম্ভব না, এ ব্যাপারে রোগীকে আগেই ওয়াকিবহাল করে রাখতে হবে। নরমাল ডেলিভেরি একটা আনপ্রেডিকটেবল বিষয়। কখন হবে, এ আশায় প্রতিটা রোগীর কাছে বসে থাকা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। নরমাল ডেলিভেরি এলাউ করলে জুনিয়র ডাক্তারদের,নার্স অথবা মিডওয়াইফদের অবশ্যই এলাউ করতে হবে। তারা প্রয়োজন বোধে সময়মতো আমাদের ডাকবেন। অনেক সময় আমরা আসার পূর্বেই নরমাল ডেলিভেরি হয়ে যেতে পারে, এটিও রোগীর জানতে হবে, বুঝতে হবে।
তৃতীয়তঃ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো, সিজারের মতো নরমাল ডেলিভেরির কনসেন্ট নেয়া এখন সময়ের দাবি।
আমরা নিজেরা বেশ ভালো মতোই জানি, নরমাল ডেলিভেরির ব্যাপারে কিছু রোগী রীতিমতো অবসেসড থাকে। যেকোনোভাবেই হোক, নরমাল করে দিতেই হবে। ডাক্তার ইচ্ছাকৃতভাবে সময়মতো সিজার না করে জোর করে নরমাল ডেলিভেরির চেষ্টা করেছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য কথা না। কিন্তু ডকুমেন্ট না থাকলে শেষ পর্যন্ত আমাদেরই দায়ী করা হবে। কাজেই নিজেদের অবস্থান সুস্পষ্ট রাখতে ডিটেইলস কনসেন্ট থাকা জরুরি।
“নরমাল ডেলিভেরির প্রতিটা ধাপ, সময়সীমা এবং জটিলতা মেনে নিয়ে আমি সজ্ঞানে উক্ত প্রসিডিওর গ্রহণ করিতে রাজি আছি। ইহাতে কোনো প্রকার অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটিলে বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইলে ডাক্তার এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোনোভাবেই দায়ী থাকিবে না।”
কথায় বলে, নিজে বাঁচলে বাপের নাম। রোগী ডিল করতে গিয়ে যদি জেলের ভাত খেতে হয়, তাহলে আগে ভাবতে হবে আমরা নিজেদের পিঠ বাঁচাবো কি করে? সময়ের চাহিদা অনুযায়ী, নিজেদের প্রস্তুত করাটাও সময়ের দাবি।