২৪ মে, ২০২৩ ০২:০৬ পিএম

গ্রামে যেতে চান না জার্মান চিকিৎসকরা

গ্রামে যেতে চান না জার্মান চিকিৎসকরা
ক্লাউস কোর্তে মতে, পারিবারিক চিকিৎসকরা ফুটবল মাঠের গোলরক্ষকের মতো। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুহূর্তে গোলরক্ষকের মতো যাতে ‘শেষ ভরসা'র ভূমিকায় নামার জন্য অনেক পারিবারিক চিকিৎসক দরকার।

মেডিভয়েস ডেস্ক: গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক নিয়োগ করতে হিমশিম খাচ্ছে জার্মান সরকার। শহর থেকে যত দূরের এলাকা, চিকিৎসক পাওয়া ততই কঠিন। এমন চলতে থাকলে দেশটির গ্রামে চিকিৎসক শূন্য পদের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়াতে বেশি সময় লাগবে না।

চিকিৎসকরা কেন গ্রামে যেতে চান না? জার্মানদের কাছে কি তাহলে চিকিৎসকের পেশা আগের মতো আর আকর্ষণীয় নয়?

অনেকের মতো স্টেফান লিশটিংহাগেনও তা মনে করেন না। স্টেফান নিজেও চিকিৎসক। চিকিৎসা করেন কোলন শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের মারিয়েনহাইডের অঞ্চলে। ১৪ হাজার মানুষের ওই এলাকায় তার বাবাও চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন টানা ৩২ বছর।

ইন্টারন্যাল মেডিসিন এবং গ্য্যাস্ট্রোএন্টারোলজির বিশেষজ্ঞ বাবা ২০ বছর আগে স্টেফানকে ডেকে জানিয়েছিলেন, তিনি চান এখন থেকেই তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো কাউকে খুঁজে বের করে এলাকাবাসীর সেবার জন্য তাকে তৈরি করতে। সঙ্গে  জানতে চেয়েছিলেন স্টেফানের চিকিৎসক হওয়ার কোনো ইচ্ছে আছে কিনা।

বাবার সঙ্গে খুব বেশি কথা হতো না স্টেফানের। তার বাবার ব্যস্ত জীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা সত্যিকার অর্থেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন। বাড়িতে খুব কমই দেখতাম তাকে। দেখা হলে প্রায়ই আমাকে বলতেন, তুমি তো এমন কাজ (ডাক্তারি) করতে চাও না।’  

কিন্তু অবসরে যাওয়ার কয়েক বছর আগে বাবা যখন ‘ভবিষ্যতে কে এলাকাবাসীর চিকিৎসার দায়িত্ব নেবে’ এ চিন্তায় ব্যস্ত, তখন স্টেফান ঠিক করলেন বাবার দুশ্চিন্তা তিনিই দূর করবেন।

স্টেফান লিশটিংহাগেন নানা বয়সি নানা ধরনের রোগের রোগী দেখে দিন কেমন করে কেটে যায় তা, স্টেফান ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। জার্মানির নিয়ম অনুযায়ী সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা কাজ তো করেনই, মোট কর্মঘণ্টা প্রায়ই এর চেয়ে অনেক বেশিও হয়ে যায়।

তা সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টায় কমপক্ষে তিন হাজার ৩০০ রোগী দেখার এই ব্যস্ত জীবন কেমন লাগে? কখনো কি মনে হয় চিকিৎসক না হলেই ভালো হতো? প্রশ্নের জবাবে স্টেফান জানান, এ পেশায় আসায় কোনো আক্ষেপ হয় না তার, বরং গর্ব হয়, কারণ, ‘আমার কাজে আমিই তো বস, যেভাবে চাই সেভাবেই কাজ করতে পারি আমি।’

কিন্তু জার্মানির তরুণ চিকিৎসকদের অনেকেই তা মনে করেন না। ফলে অনেকেই যেতে চান না শহর থেকে দূরের কোনো গ্রামে। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকদের নিয়োগ দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। এমন চলতে থাকলে ভবিষ্যত পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে সে বিষয়ে রবার্ট বশ ফাউন্ডেশনের গবেষকরা নিশ্চিত।

তারা সম্প্রতি এক সমীক্ষায় জানিয়েছেন, জার্মানিতে প্রতি তিন জনে একজন চিকিৎসকের বয়স অন্তত ৬০ বছর বা তারও বেশি। ফলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে তাদের অনেকেই অবসরে যাবেন। তাদের জায়গায় সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের নিয়োগ দিতে না পারলে কী হবে? রবার্ট বশ ফাউন্ডেশনের সমীক্ষা বলছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ চিকিৎসকদের শূন্য পদের সংখ্যা ১১ হাজার ছাড়িয়ে যাবে!

এমন আশঙ্কাকে দূরে সরাতে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে জার্মান সরকার। সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী কার্ল লাউটারবাখ বয়স্কদের পর্যাপ্ত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে দেশের সব মেডিকেল স্কুলে ৫ হাজার অতিরিক্ত চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র খোলার আহ্বান জানিয়েছেন। এছাড়া গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসকের অভাব দূর করার জন্য ২৩০০ কোটি ইউরোর বিশাল এক বিশেষ কর্মসূচি হাতে নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এর আওতায় জার্মানির ১৬টি রাজ্যের মধ্যে নয়টিতে আগামী ১০ বছরে গড়ে তোলা হবে অসংখ্য ডাক্তার। সেই ডাক্তারদের স্কুল জীবনে খুব বেশি মেধাবী না হলেও চলবে। স্কুল জীবনের শেষ পরীক্ষায় খুব বেশি ভালো নম্বর না পেলেও ‘গ্রাম ডাক্তার' কোটায় চিকিৎস হতে পারবেন তারা।

শুরুর দিকে স্টেফনের মনে হতো স্বল্প মেধার ছাত্র-ছাত্রীদের ডাক্তার হতে দিলে চিকিৎসা ব্যবস্থায় এর খুব খারাপ প্রভাব পড়বে। কিন্তু ইতিমধ্যে সেই ভুল ভেঙেছে তার। তাই স্টেফান মানেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিকল্প এই গ্রাম-ডাক্তাররা নিশ্চয়ই হবেন না, তবে অনেক রোগের চিকিৎসা স্থানীয়ভাবে তারা নিশ্চয়ই করতে পারবেন এবং তাতে রোগীদের উপকারই হবে, ‘(বর্তমান পরিস্থিতিতে ) আমাদের তো কিছু একটা করতেই হবে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ব্যবস্থা এক সময় কোনো-না-কোনোভাবে করা যাবে, কিন্তু পারিবারিক ডাক্তার ছাড়া কাজ চলবে না। পারিবারিক চিকিৎসকের প্রয়োজনের কথাটা যে আলাদা করে কেউ এখনো বলছে না- এতে আমি সত্যিই খুব অবাক হয়েছি।'

গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক চিকিৎসক কতটা দরকার তা বছর দুয়েক আগে আরব্র্যুকের মানুষেরা খুব বুঝতে পেরেছিলেন। সেবার ভয়াবহ বন্যায় ভেসে গিয়েছিল অনেক বাড়ি-ঘর। মারা গিয়েছিলেন অন্তত ১৩৪ জন মানুষ। ওই সময় পাঁচজন পারিবারিক চিকিৎসকই এলাকাবাসীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ক্লাউস কোর্তে একজন।

একটা স্কুল ঘরে শত শত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়ার ওই সময়টার কথা ভাবলে এখনো গর্ব হয় তারা। তার মতে, পারিবারিক চিকিৎসকরা ফুটবল মাঠের গোলরক্ষকের মতো। সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুহূর্তে গোলরক্ষকের মতো যাতে ‘শেষ ভরসা'র ভূমিকায় নামার জন্য জার্মানির অনেক পারিবারিক চিকিৎসক দরকার বলেও মনে করেন তিনি। সূত্র- ডয়চে ভেলে

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও
একদিনেই অবস্থান বদল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও