বদলির পরও কর্মস্থলে বহাল: মোড়েলগঞ্জের ইউএইচএফপিও’র দাবি ও প্রকৃত ঘটনা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: বদলির নির্দেশনা উপেক্ষা করে কর্মস্থলে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোড়েলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কামাল হোসেন মুফতির বিরুদ্ধে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, আদেশ অনুযায়ী, নতুন কর্মস্থল ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতাল অংশে কাজে যোগ দিয়েছেন।
মোড়েলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ঠিক মতো ওষুধ না দেওয়া ও চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত না করাসহ একাধিক অভিযোগে ডা. কামাল হোসেন মুফতির বিরুদ্ধে বাগেরহাট সিভিল সার্জন ও জেলা প্রশাসকের কাছে নালিশ করে স্থানীয় জনগণ। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাকে রিলিজ দেওয়া হয়। গত ৫ এপ্রিল তার ব্যাপারে বদলির আদেশ দেওয়া হয়। জানা গেছে, এ আদেশ উপেক্ষা করে তিনি আগের কর্মস্থলে বহাল থেকে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এমনকি রাতে সিসি ক্যামেরা বন্ধ করে অস্ত্রোপচারও করেন।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মোড়েলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক মেডিকেল অফিসার বুধবার (৩ মে) মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডা. কামাল হোসেন মুফতি এখন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বে নেই। কিন্তু হাসপাতাল কোয়ার্টারে থাকছেন, রাতের বেলায় অপারেশন করছেন, রোগীও দেখছেন।’
তিনি বলেন, ‘ডা. কামাল হোসেন মুফতির এপ্রিল মাসের ৫ তারিখ রিলিজের অর্ডার হয়েছিলো কিন্তু তিনি রিলিজ নেননি। অর্ডারে লেখা ছিল তিন কার্যদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে হবে, যোগদান না করলে অটো রিলিজ হয়ে যাবে। কিন্তু তিনি অর্ডার না মেনে লেইট করে ঈদের পরে রিলিজ নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘রিলিজ নেওয়ার পরও তিনি এখনও আছেন। এমনকি অ্যানেসথেসিওলজিস্ট ছাড়া রাতে ওয়ার্ড বয়দের নিয়ে অপারেশন করছেন।’
এই মেডিকেল অফিসার বলেন, ‘ডা. কামাল হোসেন মেডিকেল অফিসার হিসেবে ২০০৯ সাল থেকে মোড়লগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আছেন। এরপর ২০১৭ সালে তিনি এই উপজেলায় স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগন পান। তাকে প্রায় ৭/৮ বার বদলি করা হয়েছে, কিন্তু তিনি কোনো না কোনোভাবে ম্যানেজ করে চলে আসছেন। এখানে তিনি নিজস্ব সিন্ডিকেট তৈরি করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে ওষুধসহ যেসব জিনিসপত্র কেনার টেন্ডার হয়, তা তিনি কিনেন না। এতে দেখা যায়, রোগীরা ওষুধ পাচ্ছেন না, ঠিক মতো সেবা পাচ্ছেন না। টেন্ডার হলে অন্য কাউকে না দিয়ে তিনি নিজেই একটা দোকানের নামে কাগজপত্র করে সব নিয়ন্ত্রণে রাখেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডা. কামাল হোসেন মুফতি সব সময় টাকা নিয়ে রোগী দেখেন, আর টাকা নিয়ে অপারেশনও করেন। এ জন্য স্থানীয় জনগণ তার উপর ক্ষুব্ধ।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সাবেক এক কর্মকর্তা মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমি মোড়েলগঞ্জে এখন নেই। তবে আমি যতদূর জানি, তিনি (ডা. কামাল হোসেন মুফতি) এখনও মোড়লগঞ্জেই আছেন।’
যোগাযোগ করা হলে বাগেরহাট জেলা প্রসাশক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ডা. কামাল হোসেন মুফতিকে সম্প্রতি স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে, কিন্তু তিনি যাননি। এ জন্য আমার কাছে কিছু লোকজন আসছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমি সিভিল সার্জনকে বলে দিয়েছি যে, বদলির আদেশের পরও তাঁকে আপনি রিলিজ করছেন না কেনো? তিনি আমাকে বলেছেন, তাঁকে রিলিজ করে দেওয়া হয়েছে।’
মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, ‘ডা. কামাল হোসেন মুফতি বিতর্কিত মানুষ। এলাকার মানুষও তাঁর উপর ক্ষুব্ধ।’
এ প্রসঙ্গে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডা. জালাল উদ্দিন আহমেদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘তার বদলির আদেশ হয়েছে আমরা তাকে রিলিজ করে দিয়েছি এবং তাকে বলেছি, যাতে তিনি হাসপাতালে দায়িত্ব পালন না করেন। কিন্তু তিনি এখনও যে ওখানে আছে এটা আমার জানা ছিল না। এ বিষয়ে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা তদন্ত করে দেখবো।’
বদলির আদেশ উপেক্ষা করে আগের কর্মস্থলে অবস্থান, চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডা. কামাল হোসেন মুফতি। তিনি বলেন, ‘রিলিজ হওয়ার পর থেকে হাসপাতালের কোনো কাজে যাইনি। এমনকি হাসপাতালে ভিতরেও যাইনি।’
হাসপাতালের কোয়ার্টারে থাকার বিষয় ডা. কামাল হোসেন মুফতি বলেন, ‘কোয়ার্টারে আমার জিনিসপত্র আছে। এগুলো তো নিতে হবে।’
নতুন কর্মস্থল ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালে যোগ দিয়েছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে ঢাকা ডেন্টাল কলেজ কর্তৃপক্ষের দ্বারস্থ হয় মেডিভয়েস। জানা গেছে, ঢাকা ডেন্টালে মোড়েলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ইউএইচএফপিওর বদলির বিষয়ে আদেশের কপি এসেছে। তবে তিনি এখনো সেখানে যোগ দেননি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা ডেন্টালের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. হুমায়ুন কবির বুলবুল মেডিভয়েসকে বলেন, ডেন্টালের হাসপাতাল অংশের সহকারী পরিচালক পদে তাকে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, ডা. কামাল এখনো যোগদান করেননি।
ডা. কামাল হোসেন মুফতির যোগদানের বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার (৪ মে) ঢাকা ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. বোরহান উদ্দিন হাওলাদার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমার এখানে তার বদলির আদেশ হয়েছিল, আমি দেখেছি। কিন্তু তিনি যোগদান করেননি। সম্ভবত অন্য কোথাও গেছেন। আর বদলির আদেশ বাতিল হয়ে গেছে।’