ডা. শাহজাদা সেলিম 

ডা. শাহজাদা সেলিম 

সহযোগী অধ্যাপক,
এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় 


০৫ এপ্রিল, ২০২৩ ০৮:১৮ পিএম

সংযমের মাসে ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকা

সংযমের মাসে ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্যতালিকা
রমজানে ওজন বাড়ে ৮৬ শতাংশ মানুষের, কমে ৬ শতাংশের, বাকিদের ওজন অপরিবর্তিত।

রমজান এলেই মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তনের পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও আসে বড় ধরনের পরিবর্তন। আর ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য খাদ্য ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিকিৎসকদের মতে ডায়াবেটিস চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো খাদ্য ব্যবস্থাপনা। কঠোর নিয়মকানুন মেনে খাবার ও ওষুধ গ্রহণ করতে হয় তাদের। রোজা রেখে কীভাবে রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং ডায়াবেটিস মোকাবেলা করা যায় এখানে সেসব বিষয় তুলে ধরা হচ্ছে। 

রমজানে হাঁটার বিকল্প তারাবি

ডায়াবেটিস চিকিৎসার প্রথম ধাপ হলো খাদ্য ব্যবস্থাপনা, দ্বিতীয় ধাপ হলো শারীরিক পরিশ্রম। রমজান মাসে রক্তের গ্লুকোজ যেন অনেক বেশি কমে না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখাটা জরুরি। রমজানের বাইরে অন্য সময়ে শারীরিক পরিশ্রমের জন্য প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করা হয়ে থাকে। রমজান মাসে স্বাভাবিক নিয়মে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়লে অনেকটা ব্যায়ামের মতো হয়ে যায়। এটা গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে ধরে নেওয়া যায়, হুবহু না। 

ওজন কমাতে হাঁটতে হবে রমজানেও

অধিকাংশ ডায়াবেটিস রোগীরই দৈহিক ওজন বেশি। তাদেরকে ওজন কমানোর টার্গেট নিয়ে শারীরিক পরিশ্রম করতে হয়, যেটা শুধুমাত্র তারাবীর নামাজের মাধ্যমে পূরণ হবে না। তাদের জন্য পরামর্শ হলো, আপনারা রমজান মাসেও রাতের বেলা হাঁটবেন। যার যত বেশি ওজন কমানোর তাগিদ তিনি তত বেশি হাঁটবেন। হাঁটার সবচেয়ে ভালো সময় হলো, তারাবীর পর অথবা রাতের খাবারের পর।

যারা অন্য সময়ে ওজন কমাতে চেয়েছিলেন তাদের অনেকেই ভাবেন রোজার সময় খাওয়া কমিয়ে দিলেই ওজন কমে যাবে, কিন্ত আসলে তা নয়। রমজানে প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষের ওজন বাড়ে, ৬ শতাংশ মানুষের ওজন কমে আর বাকিদের ওজন অপরিবর্তিত থাকে। রোজায় যাদের ওজন কমে পরবর্তী ৬ সপ্তাহের মধ্যে তাদের ওজন আশ্চর্যজনকভাবে আগের চেয়ে আরও বেড়ে যায়। সুতরাং রোজা রাখলে ওজন কমে যাবে, এটা ভাবা যাবে না।

দুপুরের পর কায়িক শ্রম নয় 

দিনের বেলায় যারা পরিশ্রম করেন, তারা দুপুরের আগেই সব কাজ শেষ করবেন, দুপুরের পর বিশ্রামে থাকবেন। জরুরি কোনো কাজ করার প্রয়োজন হলে পরিশ্রমের পর রক্তের গ্লুকোজ মেপে দেখতে হবে। দুপুরের দিকে গ্লুকোজের পরিমাণ ৫.৬ এর নিচে নেমে গেলে ধরে নেওয়া হয়, তার জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত রোজা রাখা কঠিন হয়ে যাবে। দুর্ভাগ্যবশত ৩.৯ বা তার চেয়ে কমে নেমে গেলে আর রোজা রাখা সম্ভব হবে না।

সাহরি খাবেন শেষ সময়ে

পৃথিবিতে ডায়াবেটিস ছাড়া আর কোনো রোগ নেই, খাবারের সাথে যার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। শুধু রমজান নয়, সারাবছরই ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য নির্ধারিত খাদ্য ব্যবস্থাপনা থাকে। রমজান মাসেও ডায়াবেটিস রোগীদের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলতে হবে। ডায়াবেটিস রোগীরা এমন সময় সাহরি খাবেন, যেন খাওয়া শেষ হওয়ার পরপরই ফজরের আজান হয়। তাহলে কম সময়ে রোজা সম্পন্ন করা যাবে।

আমিষ জাতীয় খাবারে গুরুত্ব দিন

রমজানে যেহেতু পানিশূন্যতার ব্যপক ঝুঁকি রয়েছে, তাই খাবারের কমপক্ষে ৩০-৫০ শতাংশ জলীয় অংশ হতে হবে। আর দ্রুত রক্তের গ্লুকোজ বাড়িয়ে দিবে, এমন খাবার গ্রহণ করা যাবে না। যেহেতু দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকতে হবে, তাই এমন খাবার খেতে হবে, যা ধীরে ধীরে রক্তের গ্লুকোজ বাড়াবে। এমন খাবারের মধ্যে আমিষ জাতীয় খাবার বেশ ভালো। আমিষ জাতীয় খাবার একসাথে অনেক বেশি ক্যালরি বাড়াবে না, ধীরে ধীরে বাড়াবে। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেড জাতীয় খাবার ধীরে ধীরে ক্যালরি বাড়াবে।

সেহরিতে রুটি বেশ ভালো খাবার। তবে অবশ্যই সিদ্ধ আটার রুটি খেতে হবে, আটা সিদ্ধ না হলে পানির পিপাসা বাড়াবে। ভাতের সাথে ডালও খুব ভালো খাবার। ডালের মধ্যে একই সাথে ৩টি অংশ আছে, জলীয় অংশ, আমিষ ও ফাইবার। দুধের মধ্যেও এসব আছে, তবে দুধ যারা খেয়ে হজম করতে পারবেন তারা খাবেন।

ইফতারে প্লেটভর্তি খাবার নয়

আমাদের দেশে ইফতার এখন শুধু রোজা ভাঙার অনুষঙ্গ নয়। ইফতার মানে এখন বিশাল আনুষ্ঠানিকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্লেটভর্তি খাবার ছাড়া ইফতার কল্পনাও করা যায় না। অথচ এটি মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়। সারাদিন না খেয়ে থেকে ডায়াবেটিস রোগীদের গ্লুকোজ অনেক কমে যায়, পানিশূন্যতা দেখা দেয়, সেইসাথে এসিডিটির ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। তাই এসব বিবেচনা করেই ডায়াবেটিস রোগীদের ইফতারের আইটেম ঠিক করতে হবে।

ইফতারের শুরুতে জলীয় অংশ আছে এমন খাবার খেতে হবে। এক্ষেত্রে ফলের রস খাওয়া যেতে পারে। ইফতারের আগে রক্তের গ্লুকোজ মোটামুটি ভালো থাকলে কিছু মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া যেতে পারে। যেমন, ১ চামচ চিনি দিয়ে শরবত খেতে পারেন। ইফতারে খেজুর, জিলাপি খুবই কমন খাবার। ডায়াবেটিস রোগীদের একটি খেজুর অথবা মাঝারি সাইজের ১ পিচ জিলাপি খেলে আর কোনো মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া যাবে না।

ভাঁজাপোড়া এড়িয়ে চলুন

ভাঁজাপোড়া খাবার যতদূর সম্ভব এড়িয়ে চলতে হবে। ইফতারিতে ছোলা-মুড়ি আদর্শ খাবার হতে পারে, মুড়িতে ক্যালরি খুবই কম এবং ছোলাতে প্রচুর আঁশ থাকে। ফলে গ্লুকোজ অনেক বেড়ে যাবে না, কিন্তু পেট ভরে যাবে। অনেকে ইনসুলিন নিয়ে সামান্য একটু খাবার খেয়ে নামাজে চলে যান, এটাও করা যাবে না। এতে নামাজ পরে আসার আগেই হাইফোগ্লাইসেমিয়া হয়ে যেতে পারে। সুতরাং যারা ইনসুলিন নিবেন, তাদের ভালোমতো খেতে হবে।

সাহরি-ইফতারের সাথে খেতে হবে রাতের খাবারও

অনেকেই সাহরি ও ইফতারে ভরপুর খান, কিন্তু রাতের খাবার এড়িয়ে চলেন। এটা মোটেও ভালো অভ্যাস নয়। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য এটা ক্ষতির কারণ। অনেকের রাতে ওষুধ থাকে, সেক্ষেত্রে রাতের খাবার না খেলে ওষুধ বাদ দিতে হবে যেটা আরও ক্ষতিকর। রমজানের বাইরে অন্য সময় দিনে ৬ বার খাওয়া হয়, ৩টা বড় খাবার ৩টা ছোট খাবার। রোজার সময় এসে এটা দুই বারে নামানোটা খুবই অস্বাস্থ্যকর হবে। 

ইফতারেই উদরপূর্তি নয়

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ সারা দিনের মোট খাবারের ৭০ শতাংশ ইফতারেই খেয়ে ফেলছে। এর ফলে ইফতারের আগে রক্তের গ্লুকোজ ৫.৫ হলে ইফতারের পরে সেটি হয়ে যাচ্ছে ২৫, যা মোটেও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এজন্য ইফতারে ৪০ শতাংশ খাবার খাওয়া যেতে পারে, আর সাহরিতে ৩০ শতাংশ। আর সারাদিনের খাবারে ৩০-৪০ শতাংশ আমিষ থাকতে হবে, শর্করা বা কার্বোহাইড্রেড জাতীয় খাবার ৫০-৬০ শতাংশ থাকতে হবে, চর্বি জাতীয় খাবার ৩০ শতাংশের নিচে হতে হবে। এটি আমাদের ৩ বারের খাবারের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিতে হবে। রাতের বেলা এক টুকরো মাছ বা মাংস এবং সাহরিতে ডালের সাথে আঁশজাতীয় সবজি, সাথে ডিম দুধ খাওয়া যেতে পারে।

এসএস/এমইউ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী

‘হামের টিকা নিয়ে গাফিলতির ঘটনায় তদন্তের প্রয়োজন নেই’

প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী

‘হামের টিকা নিয়ে গাফিলতির ঘটনায় তদন্তের প্রয়োজন নেই’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত