হৃদরোগ চিকিৎসার ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ, তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান
মো. মনির উদ্দিন: দেশে হৃদরোগের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশন। ইতিমধ্যে মহৎ এ কাজের প্রায় এক চতুর্থাংশ সম্পন্ন করেছে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের সংগঠনটি। যাদের নিরলস প্রচেষ্টায় দেশে এ রোগের চিকিৎসার সূচনা ও বিকাশ ঘটেছে, তাদের বিস্মৃতি থেকে রক্ষার এ মহৎ উদ্যোগে সংশ্লিষ্টদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সংগঠনটির সভাপতি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রত্যেকটা পেশা এগিয়ে চলার পেছনে কিছু ইতিহাস থাকে। স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে আমরা চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রতিটি ডিসিপ্লিনে অনেক উন্নতি সাধন করেছি। হৃদরোগ চিকিৎসা আজকের অবস্থানে এসেছে অনেক গুণী চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে। এ পথ ধরে আরও উন্নতি হবে। কিন্তু এই উন্নতির পরতে পরতে যে ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা আমাদের অনেকেরই অজানা।’
তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসা পেশার সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে অদৃশ্য নায়কদের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসার লক্ষ্যে বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি নির্মোহভাবে করার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। আমরা তথ্যগুলো সংশ্লিষ্ট সবার কাছেই চাচ্ছি। অনেকের কাছেই হয় তো তথ্য আছে, তাদের কাছে জার্নাল সংক্রান্ত উদ্যোগের বার্তাটি পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চিঠিও দেওয়া হচ্ছে।’
কেন এই উদ্যোগ
বিশিষ্ট হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান বলেন, প্রত্যেক পেশাজীবীরই তাঁর পেশার ইতিহাস জানা জরুরি। এর দুটি সুবিধা রয়েছে। তিনি তাঁর পেশার ঐতিহ্য জানেন এবং এর আলোকে নতুন ভাবনা ও সৃষ্টি নির্মাণে সক্ষম হন। এ ছাড়াও যে মহাপুরুষদের অবদানে পেশাটি সমৃদ্ধ হয়েছে, তাদের বিস্মৃতি থেকে রক্ষা করা যেতে পারে। তাদের জন্য পরবর্তী প্রজন্মের শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়।
হৃদরোগ চিকিৎসায় বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ ভাগ তাল মেলাতে সক্ষম হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এতো এতো অগ্রগতির পেছনে কোন কোন মনীষীগণের অবদান ছিল এবং এই পেশার বিকাশ সাধিত হয়েছে, তাদের বিস্মরণের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। সেই সঙ্গে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে তুলে ধরতে হবে। এর মাধ্যমে আমাদের অনাগত-অনুজরা যদি মহত্বের আদর্শের প্রতি ধাবিত হওয়ার প্রেরণা পায়, তাহলে চিকিৎসা পেশা সম্মানজনক অবস্থায় পৌঁছে যাবে।’
অধ্যাপক ডা. এসএম মোস্তফা জামান বলেন, ‘স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের হৃদরোগের চিকিৎসার প্রতিটি ঘটনা লিপিবদ্ধ করতে চেষ্টা করছি। এ ছাড়া অনেক বিদেশি চিকিৎসক বাংলাদেশের হৃদরোগ চিকিৎসার উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছেন অথবা অনেক বাংলাদেশি চিকিৎসক যাদের অনেকে সেই সময় বিদেশ থেকে এসে বাংলাদেশের হৃদরোগ চিকিৎসায় প্রযুক্তি অথবা নানা উপায়ে সাহায্য করেছিলেন, তাদের অনেকের তথ্য আমার প্রয়োজন। তাদের ইতিহাসও পূর্ণাঙ্গভাবে মেলানো যাচ্ছে না। আমাদের বিশ্বাস এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য কারও কাছে আছে, এ বিষয়ে তথ্যের জন্য সবার সহযোগিতা দরকার।’
ইতিহাস সংরক্ষণের এ কাজ ইতিমধ্যে এক চতুর্থাংশ সম্পন্ন হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, খুব অল্প সময়ে মধ্যে এটি আলোর মুখ দেখবে।
এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য বিভিন্নজন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান বলেন, কাজটি নির্ভুল ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রবাসী চিকিৎসকদের কাছেও এ ধরনের একটি আহ্বান পাঠানো হবে।
যেভাবে যাত্রা শুরু
মহৎ এ কাজের সূচনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের হৃদরোগ চিকিৎসার সূচনা ও বিকাশে ভূমিকা রাখা মহান মনীষীদের ইতিহাস সংরক্ষণের এ উদ্যোগ সামনে রেখে বাংলাদেশ কার্ডিওভাসকুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশন ২০২১ সালের ৬ আগস্ট একটি জুম মিটিংয়ের আয়োজন করে। পাঁচ ঘণ্টার সেই মিটিংয়ে বাংলাদেশের সকল গুণী হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ যুক্ত ছিলেন, যাঁদের হাত ধরে বাংলাদেশে হৃদরোগ চিকিৎসার সূচনা হয়েছিল।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. এম এ মালেকের সভাপতিত্বে ওই মিটিংয়ে বাংলাদেশের সকল জ্যেষ্ঠ কার্ডিওলজিস্ট ও সার্জন যুক্ত হোন। সেখানে হার্টের চিকিৎসার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশে প্রথম এনজিওগ্রাম, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি কখন ও কাদের মধ্যে হয়েছিল; এমডি কোর্স, ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্স চালুর ইতিহাস, কারা শুরুর দিকের ছাত্র ছিলেন—এসব বিষয় তুলে ধরা হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘কোভিডকালীন ওই মিটিংয়ে একটি ভিডিওচিত্রের মাধ্যমে অধ্যাপক ডা. শেখ আলী আশরাফ স্যারকে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিচয় করে দিয়েছিলাম। প্রখ্যাত এ কার্ডিওলজিস্ট ১৯৬৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম এক রোগীর দেহে হার্টের ভাল্ভের Mitral Stenosis নামক রোগের চিকিৎসা Closed Mitral commissurotomy (CMC) করেছিলেন।’
দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এ মহানায়কের যুগান্তকারী অর্জনের তথ্যটি দেশের জ্যেষ্ঠ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা জানতেন, তবে কোনো জার্নাল বা বইয়ে লিপিবদ্ধ না থাকায় স্মৃতির আড়ালে রয়ে গেছে গেছে।
সেই সফল অস্ত্রোপচারের পর মনু মিয়া নামে ওই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং পরবর্তীতে তিনি আরো ৪০ বছর বেঁচে ছিলেন।
৯৯ বছর বয়স্ক অধ্যাপক ডা. শেখ আলী আশরাফ কালের সাক্ষী হয়ে আছেন।
এমইউ