পরীক্ষায় স্নায়ু নিয়ন্ত্রণে না থাকলে, ভালো পারফর্ম করা যায় না
স্বপ্ন পূরণে কঠোর অধ্যাবসায় ও নিয়মানুবর্তীতার মধ্যে থেকেই নিজেকে একটু একটু করে তৈরি করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ২০২১-২২ সেশনে জাতীয় মেধায় অর্জন করেছেন দ্বিতীয় স্থান। বলছিলাম, তুখোর মেধাবী শিক্ষার্থী আবদুল্লাহর কথা। সম্প্রতি মেডিভয়েসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার অভিজ্ঞতা ও আসন্ন এমবিবিএস ভর্তি পরীক্ষা-২০২৩ এ অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ প্রদান করেন তিনি। মেডিভয়েস পাঠকদের জন্য পূর্ণ সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলো। কথা বলেছেন ওমর ফারুক ফাহিম, ক্যামেরায় ছিলেন আব্দুল লতিফ সাদ্দাম, প্রতিবেদন সহযোগিতায়, সাহেদুজ্জামান সাকিব।
কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে
পরীক্ষার আগে কোয়ালিটির চেয়ে কোয়ান্টিটিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আমি পরীক্ষার আগে সবগুলো অধ্যায় শেষ করেছিলাম এবং প্রত্যেকটি অধ্যায় ভাগ ভাগ করে নিয়েছিলাম। একটা অধ্যায় শেষ করতে নির্দিষ্ট একটি সময় ঠিক করে নিয়েছিলাম। আমার চেষ্টা থাকতো, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যত বেশি রিভিশন দেওয়া যায়। বেশি রিভিশন দিলে ব্রেইনের মেমোরি সেলের মধ্যে পড়াগুলো গেঁথে যেতে থাকে। বায়োলজি, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি সবগুলোকে আলাদা আলাদা ভাগ করে নিতাম এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা করতাম। শুরুর দিকে একটা অধ্যায় শেষ করতে এক ঘণ্টা সময় লাগতো, ধীরে ধীরে এটিকে কমিয়ে আনি। এক পর্যায়ে আমি ১৫ মিনিটে একটি অধ্যায় শেষ করতে সক্ষম হই। একদম শেষ সময়ে এসে শুধু যেখানে ভুল করতাম, সেই অধ্যায়টা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। এ সময় আমার ব্রেইনকে অনেক বেশি কাজ করাতাম।
পরীক্ষার আগের দিন থাকতে হবে চাপমুক্ত
পরীক্ষার আগের দিন নতুন করে কিছু পড়া যাবে না। প্রস্তুতির জন্য এতদিন যা পড়ে এসেছো, তাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিবে। এ সময়ে অনেক বেশি বুক ভরে শ্বাস নিতে হবে। এতে ডোপামিন ও এন্ডাফিনের মধ্যে ব্যালেন্স তৈরি হবে। একদম চাপ নেওয়া যাবে না। এ সময়ে রিল্যাক্স থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মনে করতে হবে যে এটা একটা কোচিংয়ের পরীক্ষা। চান্স হবে কি, হবে না-এই চিন্তা নিয়ে পরীক্ষার হলে যাওয়া যাবে না। পরীক্ষা ভালো-খারাপ যেটাই হোক, মনে করতে হবে যে, তুমি তোমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করছো। যা হওয়ার হবে। পরীক্ষার আগের রাতে ১০-১১টার মধ্যে ঘুমিয়ে যেতে হবে। ১০টার পর কেউ যেন বই নিয়ে না বসে। রাতে সবাইকে কল দিয়ে দোয়া নিবে। প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র রাতেই একটা ফাইলের মধ্যে রাখবে। একদম নতুন কলম না নিয়ে ব্যবহৃত কলম নিয়ে যাবে, তাহলে বৃত্ত ভরাট করতে সুবিধা হবে।
পরীক্ষার আগে চাপ সামলানোর কৌশল
পরীক্ষার আগে চাপ সামলানোর বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তুমি এতদিন ধরে পড়াশোনা করেছো, কিন্তু ভর্তি পরীক্ষার সময় যদি তোমার নার্ভ কন্ট্রোল নিজের হাতে না থাকে, তাহলে তুমি ভালো পারফর্ম করতে পারবা না। নার্ভ কন্ট্রোলে রাখার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এ সময় হতাশা যেন ঘিরে ধরতে না পারে, সেজন্য আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, গরীব-দুঃখী সবার সাথে কথা বলতে হবে। তাহলে ডিপ্রেশনটা থাকবে না। পরীক্ষার হলে গিয়েও স্বাভাবিক থাকতে হবে। আশেপাশের পরীক্ষার্থীদের সাথে স্বাভাবিক কুশলাদি বিনিময় করতে হবে। এতে মানসিক চাপ অনেক কমে যাবে। আর পরীক্ষার হলে মানসিক চাপ মুক্ত থাকার বিকল্প কিছু নেই।
পরীক্ষার আগে চাপ সামলানোর কৌশল
পরীক্ষার হলে ১ ঘণ্টায় ১০০ টি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সুতরাং এসময় টাইম ম্যানেজমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন পাওয়ার পর তিনবার পুরো প্রশ্নটি ভালোভাবে পড়তে হবে। প্রথম ধাপে ১০০ টা প্রশ্নের মধ্যে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর একবারে চলে আসে অর্থাৎ জ্ঞানমূলক প্রশ্নগুলোর আগে দিতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে যে প্রশ্নগুলোর অপশন কনফিউজিং লাগে, সেগুলোর উত্তর দিতে হবে। যখন বুঝে যাবে যে, তুমি নিশ্চিত চান্স পাওয়ার মতো এমসিকিউ দাগিয়েছো-তখন পরের ধাপে যাবে। যত বেশি সম্ভব এমসিকিউ দাগাতে হবে, তবে তার আগে চান্সটা নিশ্চিত করতে হবে।
বিরতির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে
পড়াশোনার জন্য নিয়মানুবর্তীতা বজায় রাখা খুবই জরুরি। একটি পড়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত উঠা যাবে না। তবে পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে ৫ মিনিটের জন্য বিরতি দেওয়া যেতে পারে। বিরতির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা খুবই জরুরি। ৫ মিনিটের বিরতি যেন ৫ মিনিটেই শেষ হয়। পড়াশোনার জন্য কত ঘণ্টা ব্যয় করছো, এটা মাথায় না রেখে তোমার পড়াশোনা শেষ করতে কত ঘণ্টা লেগেছে সেটা ভাবতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-পড়াশোনার জন্য নিজের যে সময়টা ভালো মনে হয়, সেটাই বেছে নিতে হবে। আমি রাত জেগে পড়তাম না। রাতে তারাতাড়ি ঘুমিয়ে যেতাম, ফজরের আগে উঠতাম এবং সকালে পড়াশোনা করতাম। কারণ রাসুল (সা.) বলেছেন ‘আমি আমার উম্মতের জন্য আল্লাহর কাছে ভোরবেলা বরকত চেয়ে নিয়েছি।’
এইচএসসিতে ভাল পড়াশোনার বিকল্প নেই
অনেকেই নবম-দশম শ্রেণি থেকে মেডিকেলের পড়াশোনা শুরুর কথা বলে, কিন্তু আমরা ছোট থেকেই মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখি, সুতরাং আমাদের পড়াশোনাটাও সে সময় থেকে শুরু করা উচিত। কেউ যদি এইচএসসি তে ভালভাবে পড়ে তাহলে তার জন্য মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। এইচএসসি হচ্ছে বেইজ গড়ার সময়, সুতরাং এ সময় ভাল পড়াশোনার বিকল্প নেই। এইচএসসিতে পড়ার সময় থেকেই ধারণা রাখতে হবে যে, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় কোন ধরনের প্রশ্ন আসে। এজন্য প্রশ্নব্যাংকটা কয়েকবার সমাধান করা দরকার।
শিক্ষকদের সাইকোলজি বুঝতে প্রশ্নব্যাংক
প্রশ্নব্যাংক সমাধান করার ক্ষেত্রে সবার আগে শিক্ষকদের সাইকোলজি বুঝতে হবে। প্রশ্নব্যাংক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু পড়ে গেলে হবে না। শিক্ষকরা কোন জায়গা থেকে প্রশ্ন করে এই সাইকোলজিটা ধরতে হবে। একটি বিষয়ে অনেক ধরনের প্রশ্ন হতে পারে, সুতরাং প্রশ্নব্যাংক সমাধান করার সময় একই বিষয়ে আগের দুই বছর কোন ধরনের প্রশ্ন হয়েছে এবং পরের দুই বছর কোন ধরনের প্রশ্ন হয়েছে তা খেয়াল রাখতে হবে। প্রশ্ন সমাধান করার সময় এটা চিন্তা করতে হবে যে, আমি যদি শিক্ষক হতাম, তাহলে কোন ধরনের প্রশ্ন করতাম। তাহলে শিক্ষকদের সাইকোলজি বুঝা অনেকটা সহজ হয়ে যাবে। ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজির ক্ষেত্রে সমাধান করার সময় চারটি অপশনের মধ্যে সঠিক অপশনটি সমাধান করার পাশাপাশি বাকি যে তিনটি অপশন রয়েছে সেগেুলোর ব্যাখা পড়তে হবে। দেখা যাচ্ছে যে, পরবর্তী বছরগুলোতে, সে অপশনগুলো থেকে প্রশ্ন চলে আসছে।
স্বপ্ন যাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ
ঢাকা মেডিকেল কলেজের জন্য কি ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে বা কি ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ছিল, এটি এখন ভাবার সুযোগ নেই। কোচিংয়ে এতদিন পরীক্ষাগুলোতে যে ভুলগুলো করেছি, সেগুলো যেন দ্বিতীয় বার আর না হয়-সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পরীক্ষার সময় সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হয়, সেটি হলো-আমাদের মনে থাকে না। এজন্য আমাদের রেসিডুয়াল নলেজ (অবশিষ্ট জ্ঞান) বাড়াতে হবে। প্রস্তুতিটাকে আরও জোরালো করার জন্য নিজের মতো করে ছক তৈরি করতে হবে। এমসিকিউ গুলোকে সাজিয়ে নিতে হবে। এ সময় যত বেশি সম্ভব এমসিকিউ সলভ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-জীবনের রুটিনটাকে ভালোভাবে সাজিয়ে নেওয়া।
মেডিকেলে পড়ার অনুপ্রেরণা যেভাবে
চিকিৎসা পেশাটা শুরু থেকে আমার কাছে খুবই ভালো লাগতো। যখন মেডিকেলের পাশ দিয়ে যেতাম, তখন দেখতাম সাদা অ্যাপ্রোন পরিধান করে আপু-ভাইয়ারা যাচ্ছেন। মনে হতো এই মহৎ পেশায় যদি আসতে পারতাম, তাহলে মানুষের সেবা করতে পারতাম। এ ছাড়া একজন মামা মেডিকেলের চান্স পেয়েছিলেন, তিনি এখন চিকিৎসক। তারপর থেকেই আমার ইচ্ছা চিকিৎসক হবো। ডা. কামরুল হাসান স্যারদের লেকচার যখন শুনতাম, তখন মনে হতো এই খাতে আসতে পারলে খুবই ভালো হবে। একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে স্বপ্নটা বেশি গাড় হয়ে যায়। আমি এই পেশাটাই ভালোবাসতে শুরু করি। এরপর থেকে চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা তীব্র হয়।
পেশাগত জীবন নিয়ে ভবিষ্যত পরিকল্পনা
চিকিৎসা পেশা নিয়ে অনেকেরই বিরুপ ধারণা রয়েছে। এটা আমাদেরই পরিবর্তন করতে হবে। আমি এবং আমার সহপাঠীরা যারা ভালো জায়গায় গিয়েছি, তাদের অবশ্যই কাজ করতে হবে। চিকিৎসকরা কসাই, চিকিৎসকরা মানুষকে মানুষের মতো দেখে না। এ জাতীয় অনেক খারাপ মন্তব্য আছে। আসলে এই ধরনের মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। চিকিৎসকদেরও আন্তরিক হতে হবে। রোগীদেরও মানসিকতা পরিবর্তন করতে হবে। সর্বোপরি আমাদেরকে এসব পরিবর্তন করতে হবে। আরও বেশি বিনয়ী, পরিশ্রমী ও অধ্যাবসায়ী হতে হবে।
বেড়ে ওঠা
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার রাজারামপুরে জন্ম গ্রহণ করেন আবদুল্লাহ। রাজশাহী কলেজ এইচএসএসসি পাস করেন তিনি। ছোটবেলা পারিবারিক পরিবেশে থেকেই সময় কেটেছে গৃহিনী মা আর বেসরকারি চাকরিজীবী বাবার একমাত্র সন্তান আব্দুল্লাহর।
এসএস/এএইচ
-
২২ জানুয়ারী, ২০২৫
জাতীয় মেধায় দ্বিতীয়
ক্যান্সারে বাবার মৃত্যু ও মায়ের ইচ্ছাতে মেডিকেলে সানজিদ সিরাজ
-
১৯ জানুয়ারী, ২০২৫
-
১১ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪
-
১২ মার্চ, ২০২৩
-
০৬ এপ্রিল, ২০২২
-
০৭ এপ্রিল, ২০২১
-
০৭ এপ্রিল, ২০২১