১৩ জানুয়ারী, ২০২৩ ০৬:৩৫ পিএম

রেসিডেন্সি কোর্স পুনর্গঠনে প্রস্তাবনা: ফেজ-এ প্রান্তিক মেডিকেলে ও ফেজ-বি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে

রেসিডেন্সি কোর্স পুনর্গঠনে প্রস্তাবনা: ফেজ-এ প্রান্তিক মেডিকেলে ও ফেজ-বি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিএসএমএমইউকে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে মন্ত্রণালয়কে জানানোর কথা বলা হয়েছে। এর আলোকে স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ প্রেষণ নীতিমালা সংশোধনের কার্যক্রম গ্রহণ করবে।

মো. মনির উদ্দিন: রেসিডেন্সি কোর্সে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের মেয়াদ দুই বছর কমিয়ে তিন বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী পাঁচ বছরের কোর্সটির পুরো সময় ভর্তিকৃত প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। কিন্তু পুনর্গঠনের ওই প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ওই প্রতিষ্ঠানে শুধু তিন বছর (ফেজ-বি) প্রশিক্ষণের সুযোগ পাবেন তিনি। বাকি দুই বছর (ফেজ-এ) তাঁকে প্রান্তিক পর্যায়ের মেডিকেল কলেজে প্রশিক্ষণ নিতে হবে।

গেল বছরের শেষ দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়।

নোটিসে এ সংক্রান্ত নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ‘এমডি/এমএস রেসিডেন্সি কোর্স ০২ বছর প্রশিক্ষণ এবং ০৩ বছর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের বিধান রেখে পুনর্গঠন করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগকে অবহিত করবে। তদনুযায়ী স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ প্রেষণ নীতিমালা সংশোধনের কার্যক্রম গ্রহণ করবে।’

নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী, পোস্ট-গ্রাজুয়েট কোর্সসমূহ পর্যায়ক্রমে স্নাতকোত্তর ইনস্টিটিউটসমূহে স্থানান্তর করা হবে। প্রাথমিকভাবে পোস্ট-গ্রাজুয়েটের যে সকল বিষয় বর্তমানে ইনস্টিটিউটে বিদ্যমান আছে, সেগুলো মেডিকেল কলেজ থেকে সরিয়ে আনতে হবে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, বিএসএমএমইউ ও বিসিপিএস কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে। 

এ ছাড়াও ‘দেশের অভ্যন্তরে স্নাতকোত্তর চিকিৎসা শিক্ষা ও তদুদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ সম্পর্কিত প্রেষণ নীতিমালা-২০২২ (সংশোধিত)' সংশোধন বিষয়ে অনুষ্ঠিত সভার অন্যান্য সিদ্ধান্তগুলো হলো, মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণ পদের সংখ্যা নির্ধারিত থাকবে এবং তদনুযায়ী প্রশিক্ষণার্থী মনোনয়ন করতে হবে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার সাথে সাথে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আবশ্যিকভাবে তাদেরকে পদায়ন করবে; চিকিৎসা শিক্ষার কোন বিষয়ে কতজন চিকিৎসক প্রয়োজন তা বিএসএমএমইউ নিরূপণ করবে এবং তদনুযায়ী Need Based Deputation প্রদান করতে হবে।

পুনর্গঠনের নতুন প্রস্তাবনা বিষয়ে জানতে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. টিটো মিঞাকে একাধিকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া যায়নি।

তবে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক বৈঠকের বিষয়টি মেডিভয়েসকে নিশ্চিত করেছেন অধিদপ্তরের সদ্যবিদায়ী মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ।

যে প্রেক্ষাপটে এ প্রস্তাবনা

এসব বৈঠকে কোর্স পুনর্গঠনে গৃহিত প্রস্তাবনার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এমডি-এমএস কোর্স পাঁচ বছর হওয়াতে প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসকদের ব্যাপক সঙ্কট ছিল। একই সময়ে কোর্সে অধ্যয়নরত সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসক ডেপুটেশনে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়ন দুই বছর কমানো গেলে প্রায় সাড়ে তিন হাজার চিকিৎসক প্রান্তিক পর্যায়ে স্বাস্থ্য সেবায় যুক্ত হতে পারবেন। সারাদেশে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে সহকারী রেজিস্ট্রার, আইএমও ও রেজিস্ট্রারের মতো প্রশিক্ষণ পদগুলো শূন্য থাকে। বরিশাল মেডিকেল কলেজে শিশু বিভাগে ১৫ জনের স্থলে মাত্র একজন চিকিৎসক আছেন। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এসব পদ পোস্ট গ্রাজুয়েশনের শিক্ষার্থী দ্বারা পূরণ হচ্ছে। কিন্তু প্রান্তিক পর্যায়ে মেডিকেল কলেজগুলোতে ব্যাপক শূন্যতা বিরাজ করছে। এতে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে রোগী সেবা।’

তিনি আরও বলেন, আগে সিএ রেজিস্ট্রার হিসেবে যারা প্রশিক্ষণ নিতেন, তারা রাত-দিন প্রতিষ্ঠানে পড়ে থাকতেন। ফলে তাঁদের প্রশিক্ষণ হতো শক্তিশালী। রোগী ব্যবস্থাপনা, ওয়ার্ড ব্যবস্থাপনা ও নার্স ব্যবস্থাপনাসহ সকলের সঙ্গে তাদের বোঝাপড়াটা ভালোভাবে হতো। কিন্তু এমডি-এমএস’র প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পাঁচ বছর হওয়াতে শিক্ষার্থীরা শুধু ডিউটা করে যান। তার আর কোনো দায়-দায়িত্ব থাকে না। অথচ শুধু অধ্যয়ন করে ভালো ডাক্তার হওয়া যায় না। এখানে সার্বিক ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তার দক্ষতার প্রশ্ন জড়িত। একজন সিএ একই সঙ্গে অধ্যাপক, রোগী, রোগীর স্বজন, নার্স ও সকল স্তরের স্বাস্থ্যকর্মীসহ অধঃস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাহচর্যে যান। ফলে তার মধ্যে রোগী ব্যবস্থাপনার যোগ্যতা তৈরি হয়। কিন্তু বিদ্যমান ব্যবস্থায় তা হচ্ছে না।

চলমান কোর্সে চিকিৎসকদের জরুরি অবস্থা সামলানোর দক্ষতার ঘাটতি থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক গাইনিতে এমডি-এমএস ও এফসিপিএস করার পরও সিজার করতে পারছেন না। এ রকম বহু উদাহরণ আছে।

কোর্সে প্রথম দুই বছর একাধিক বিষয়ে তিন মাস করে অধ্যয়নের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ পূর্ণতা পায় না মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রস্তাবিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন শিক্ষার্থী এক বছর মেজর সাবজেক্ট ও পরের বছর ছয় মাস করে দুইটি বিষয় পড়তে পারবে। এতে তার প্রশিক্ষণটা পূর্ণতা পাবে। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় সে তিন মাস করে করে অনেকগুলো বিষয় পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন, এতে তিনি জ্যাক অব অল ট্রেড, মাস্টার অব নান—পর্যায়ে থাকছেন।’

প্রান্তিকে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বেশি

প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা কম হওয়ায় প্রান্তিক পর্যায়ে দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বেশি উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিসএমএমইউতে এমনও প্রশিক্ষণার্থী আছেন, যিনি শিক্ষার্থীর আধিক্যের কারণে অপারেশন থিয়েটারে জীবনে তৃতীয় সহকারী হওয়ার সুযোগও পাননি। অথচ প্রশিক্ষণের এই দৈন্যতার মধ্যেই সময়ের ব্যবধানে তিনি পাস করে যাচ্ছেন। এতে দক্ষতার কাঙিক্ষত উন্নতি ঘটছে না। অথচ এই শিক্ষার্থী তৃণমূলের কোনো মেডিকেলে থাকলে সন্ধ্যায় কিংবা রাতে তিনি সার্জারিগুলো করে ফেলতে বাধ্য। এভাবে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তার যোগ্যতা ও আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পেতো, হাতে-কলমের শিক্ষা জোরদার হতো। প্রান্তিক পর্যায়ে সার্জারিতে থাকলেও সে ইউরোলজি, নিওরোসার্জারি, পেডিয়াট্রিক সার্জারিসহ সকল বিষয় একই সময়ে দেখবে। আগের চিকিৎসকরা এভাবেই শিখেছেন। বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য টারশিয়ারি পর্যায়েই শিখতে হবে—বিষয়টি এমন না। কারণ যে অধ্যাপক বা কনসালটেন্টের তত্ত্বাবধানে তিনি থাকবেন, সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও এভাবেই বেড়ে উঠেছেন। হ্যা, এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যায় পড়লে রেফার করার সুযোগ তো আছেই।

পাঁচ বছরের ডেপুটেশন পোস্ট গ্রাজুয়েশনে দৈন্যতার মূল কারণ বলেও মনে করেন এই স্বাস্থ্য প্রশাসক।

শিক্ষার্থী প্রতিক্রিয়া

বিএসএমএমইউর মার্চ- ২০২৩ শিক্ষাবর্ষের এক রেসিডেন্ট মেডিভয়েসকে বলেন, প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম চালু হলে দুই বছরে বড় বড় শিক্ষকের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে যেসব বিষয়ের প্রাথমিক জ্ঞানার্জনের সুযোগ পেতাম, তাতে ছেদ পড়বে। এ কারণে বড় ধরনের একটি শূন্যতা নিয়ে কোর্সে যাত্রা শুরু হবে। কারণ তৃণমূলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিরাট ঘাটতি রয়েছে। তিন মাস করে একটি বিষয় পড়ার সুযোগ পাওয়ার ফলে চিকিৎসার বহুমাত্রিক জ্ঞান অর্জিত হয়। এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে হবে।

বিএসএমএমইউর ভাবনা

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (চিকিৎসা শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. মো. মনিরুজ্জামান খান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এটা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত না। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে আমাদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। আমরা বলেছি, এভাবে সম্ভব হবে না। কারণ এভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করে মেডিকেল শিক্ষার মান ধরে রাখা যাবে না।’

নতুন নিয়মে প্রস্তাবিত কাঠামোতে বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নের মেয়াদ দুই বছর কমিয়ে ওই সময়টি প্রান্তিক পর্যায়ে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। প্রান্তিকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি থাকায় প্রশিক্ষণার্থীর শেখায় ছেদ পড়বে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি স্বাস্থ্য শিক্ষার একটি জাতীয় ইস্যু। সুতরাং ব্যক্তিগতভাবে নয়, জাতীয়ভাবেই এগুলো ঠিক করতে হবে। আমাদের মতামত বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফ থেকে জানানো হবে। বিএসএমএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদকে মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছিল। তিনি বলে দিয়েছেন যে, এভাবে সম্ভব না। এতে শিক্ষার মান পড়ে যাবে। এতে সামগ্রিকভাবে মেডিকেল উচ্চশিক্ষা ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। 

►পুনর্গঠনের প্রস্তাবনাটি দেখতে ক্লিক করুন

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  ঘটনা প্রবাহ : রেসিডেন্সি কোর্সে নতুন নিয়ম
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত