২৯ ডিসেম্বর, ২০২২ ১০:২০ এএম
ফিরে দেখা ২০২২

যেসব পদক্ষেপে স্বাস্থ্যে কাঙিক্ষত গতির প্রত্যাশা

যেসব পদক্ষেপে স্বাস্থ্যে কাঙিক্ষত গতির প্রত্যাশা
করোনা তাণ্ডব পরবর্তী বছরটিতে সংস্কারের তুলনায় প্রতিরক্ষামূলক কাজেই বেশি মনোযোগী ছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। এ ছাড়াও গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষায় গৃহিত হয়েছে যুগান্তকারী একাধিক পদক্ষেপ।

মো. মনির উদ্দিন: চোখের সামনে বিদায় হয়ে গেলো আরেকটি বছর। করোনা নিয়ন্ত্রিত বছরটিতে ডেঙ্গু সামালে দেখা দেয় হ-য-ব-র-ল অবস্থা। আক্রান্তদের সেবায় বড় ধরনের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ না আসলেও নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা সমালোচিত হয়েছে ব্যাপকভাবে।

করোনা তাণ্ডব পরবর্তী বছরটিতে সংস্কারের তুলনায় প্রতিরক্ষামূলক কাজেই বেশি মনোযোগী ছিল স্বাস্থ্য বিভাগ। এ ছাড়াও গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য শিক্ষায় গৃহিত হয়েছে যুগান্তকারী একাধিক পদক্ষেপ।

ইতিবাচক এসব কার্যক্রমে আগামীতে স্বাস্থ্যখাতের কাজের ধারা কাঙিক্ষত মাত্রায় গতিশীল হবে বলে আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।

অবৈধ ক্লিনিক বন্ধে অভিযান

অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে গত ২৬ মে সারাদেশে অভিযান শুরু করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। দফায় দফায় চলা এই অভিযানে প্রায় এক হাজার ৭০০ অনিবন্ধিত হাসপাতাল ও ক্লিনিক বন্ধ করা হয়। অভিযানে রাজস্ব আদায় হয় ২৫ কোটি ১৮ লাখ ৫২ হাজার ৮৬৭ টাকা।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর মেডিভয়েসকে বলেন, গেল একটি বছরে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য একাধিক কাজ হয়েছে, যা সেবায় গতি আনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যে ইতিবাচক পরিবর্তনে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। 

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বেসরকারি খাত স্বাস্থ্যসেবায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এ খাত যেন নিয়ন্ত্রিতভাবে জনমুখী ও জনকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত থাকতে পারে, সে চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘অনিবন্ধিত ও অবৈধ ক্লিনিকে চিকিৎসা দেওয়াটা অনৈতিক, গত একটি বছরে আমরা সেগুলো সফলভাবে বন্ধ করেছি। এ কার্যক্রম গণমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশেও (টিআইবি) এটি প্রশংসিত হয়েছে। যদিও কিছু কিছু মাথাচারা দেওয়ার চেষ্টা করছে। আমরা খুবই সজাগ ও সচেতন আছি। সুতরাং এ ধারা বন্ধ হবে না।’

ব্যাপক সংখ্যক হাসপাতালকে নিবন্ধনের আওতায় নিয়ে আসার ফলে সরকারের প্রচুর রাজস্ব আয় হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান শুধু রাজস্ব না, করও ফাঁকি দিয়েছে। সেখানে চিকিৎসার কোনো পরিবেশ ছিল না। 

এ প্রসঙ্গে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মো. জামাল মেডিভয়েসকে বলেন, ‘যে কোনো অবৈধ প্রতিষ্ঠান—সেটা হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ডায়াগনোস্টিক সেন্টার হোক; সেটাকে কাজ করতে দেওয়ার সুযোগ নেই, এটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা স্বাস্থ্য বিভাগের চলমান প্রক্রিয়া। কোনো প্রতিষ্ঠানে অনিয়মের খবর পেলে তারা এগুলো বন্ধ করার ব্যবস্থা করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগে জনবলের সংকটসহ নানা ঝামেলা আছে। এজন্য সব সময় কাজটি অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়ে উঠে না। অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে এটা করা হয় তো সম্ভব হয় না। যতদূর কাজটি সম্ভব হয়েছে, নিঃসন্দেহে এটি এ বছরের একটি বড় অর্জন।’

‘এটা স্বাস্থ্য বিভাগের অন্যতম একটি কর্মসূচি। এ তৎপরতা বাড়লে মিডিয়ার চোখে পড়ে। আমরা আশা করবো, স্বাস্থ্যের মতো একটি স্পর্শকাতর বিষয়ের সেবা কোনো অবৈধ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে যেনো ছেড়ে দেওয়া না হয়, যোগ করেন ডা. জামাল।’

করোনার ধাক্কা সামলে উঠা

ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, ‘দুই বছর কোভিডের তাণ্ডব চলায় গত বছর সংস্কার কাজের চেয়ে বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক কাজই বেশি হয়েছে। কোভিড স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিরাট ধাক্কা দিয়েছে। ফলে অনেক জায়গায় আমাদের সংস্কার করতে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) বাড়ানো, সেন্ট্রাল অক্সিজেন লাইন তৈরি করা ও নিজস্ব অক্সিজেন বৃদ্ধির সক্ষমতা তৈরি করা।’

টিকায় সাফল্য

বছরজুড়ে সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল উল্লেখ করে স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বলেন, ‘এর মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতের বিরাট সাফল্য অর্জিত হয়েছে। ১৫ কোটির বেশি মানুষকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার শতভাগের কাছাকাছি। দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে ১২ কোটিরও বেশি মানুষকে। ছয় কোটির বেশি লোককে তৃতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।’ 

তিনি বলেন, ‘এর ধারাবাহিকতায় বছরের শেষ দিকে সম্মুখযোদ্ধাদের সুরক্ষার নিশ্চিতে দ্বিতীয় বুস্টার ডোজ প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কোভিড শেষ হয়েও না হওয়ার মতো গল্প। চীনের পরিস্থিতি ভীষণ খারাপ। টিকাদানের বিপরীতে আইসোলেটেড উপায়ে প্রতিরোধ করতে গিয়ে তাদের আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জীবন-জীবিকার চাকা গতিশীল রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে কোভিড মোকাবিলা করেছেন, সেটা কৌশলগত দিক থেকে পৃথিবীতে রোল মডেল। করোনা শিখিয়েছে, স্বাস্থ্যকে আরও প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী করতে হবে এবং এখানে অনেক বিনিয়োগ লাগবে। কারণ, স্বাস্থ্য ঠিক না থাকলে অর্থনীতি কখনোই ঠিক থাকবে না।’

গেল বছরে স্বাস্থ্য খাতে যথেষ্ট অগ্রগতি ও সাফল্য এসেছে উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. এবিএম জামাল বলেন, ‘এর মধ্যে করোনার চতুর্থ ডোজও প্রদান করা হচ্ছে। করোনা মোকাবিলায় আমাদের অভিজ্ঞতা ও অর্জন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য দেখানো পঞ্চম দেশ বাংলাদেশ। সব কিছু মিলিয়ে এ বছরটি ছিল স্বাস্থ্য খাতের একটি সফল বছর।’

তিনি আরও বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি অর্জনই ছিল আন্তর্জাতিক মানের। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত ৫ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন 'গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর ফর ডায়াবেটিস' পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। 

চার হাসপাতালে ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেবা

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত আট মাসের প্রচেষ্টায় দেশের চারটি প্রতিষ্ঠান, যথা- কুর্মিটোলা জেনারেল হাসাপাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ান স্টপ সেবা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে সারাদেশে এর সংখ্যা বাড়ানো হবে। এর আওতায় এক ছাতার নিচে সকল রোগের সেবার ব্যবস্থা থাকবে। সপ্তাহে সাত দিন ও দিনে ২৪ ঘণ্টায় রোগীরা যে কোনো রোগের সেবা পাবেন।

ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি সেবা চালুর বিষয়কে স্বাস্থ্যখাতের জন্য মাইল ফলক উল্লেখ করে অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর বলেন, টেকনোলজির পেছনে রোগী নয়, বরং প্রতি মুহূর্তের জন্য রোগীর পেছনে টেকনোলজি অপেক্ষমাণ থাকবে। 

ডায়ালাইসিস সেবা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে অনেক ডায়ালাইসিস সেন্টার বৃদ্ধি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল 

গেল বছরে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিএসএমএমইউতে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে, এখানে রোবটিক সার্জারি, আটিফিশিয়েল ইন্টেলিজেন্স, বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট ও স্টেমসেল থেরাপি চালুর মাধ্যমে এই বছরের মধ্যেই সারাদেশের মানুষকে সুফল দিতে পারবো। লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট, কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টসহ সব ধরনের সর্বাধুনিক চিকিৎসা এখানে হচ্ছে। আগামী বছরগুলোতে এখানে ক্যাডাভারিক ট্রান্সপ্ল্যান্টসহ আরও উন্নত চিকিৎসা হবে বড় পরিসরে।’ 

‘শিক্ষা ও সেবার ক্ষেত্রে বিএসএমইউর যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি সরকারের পক্ষ থেকেও যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, আশা করি এগুলো সফলতার মুখ দেখবে’, যোগ করেন বিএসএমএমইউ ভাইস চ্যান্সেলর।

হাসপাতালের মান অনুযায়ী সেবার ফি 

বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, প্যাথলজি ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারসমূহে পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধরন, স্থান (বিভাগ বা সিটি কর্পোরেশন, জেলা, উপজেলা) ও বিছানা বিভাজন অনুযায়ী বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সারাদেশের বেসরকারি হাসপাতাল, ডায়াগনোস্টিক সেন্টার এবং ক্লিনিকসমূহের সেবা বিষয়ে এক পর্যালোচনা সভায় এসব সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

গত ২০ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের সেবা বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক নোটিসে এ তথ্য জানানো হয়। 

মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে ওই সভায় তিনি বলেন, ‘একেক হাসপাতালের একেক রকমের চার্জ ও টেস্ট ফি সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই প্রাইভেট সেক্টরের কাজ যাতে সঠিকভাবে হয়, তার জন্য গাইড লাইন তৈরি এবং ক্যাটাগরি করে সেবার ফি নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ করা হবে।’

বেসরকারি স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়ন নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘বেড সংখ্যা, যন্ত্রপাতি, অবস্থান ইত্যাদি ভেদে বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ, বি, সি ও ডি ক্যাটাগারিতে ভাগ করা হবে। ‘এ’ ক্যাটাগরি এক রকম সুবিধা, ‘বি' ক্যাটাগরি এক রকম সুবিধা পাবে। সারাদেশে অলিতে-গলিতে প্রাইভেট ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। কিছু ক্লিনিক মানসম্মত সেবা দিলেও অধিকাংশের সেবার মান ভালো নয়। ক্লিনিকগুলোতে মানসম্মত চিকিৎসা সরঞ্জামাদি নেই। খুব দ্রুতই ক্লিনিক সেবার জন্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করা হবে।’

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর মেডিভয়েসকে বলেন, ‘এ কাজটি আশা করি খুব তাড়াতাড়ি করতে পারবো আমরা। বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে ক্যাটাগরাইজ করে এবং সেবার মূল্য জনগণের সামর্থের আওতায় নিয়ে আসা হবে। রোগীদের খরচ কমানোর লক্ষ্যে সহজ মূল্যে সেবা নিশ্চিতের চেষ্টা চলছে।’

ঝুঁকিপূর্ণ হাসপাতালের তালিকা 

স্বাস্থ্যখাতে সঠিক সেবা নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের একটি বড় অঙ্গীকার। সেই লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি হাসপাতাল চিহ্নিত করার পরিকল্পনা নিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সহকারী সচিব মো. রফিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত চিঠিতে এই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, রাজধানীসহ সারা দেশে ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি হাসপাতালের তালিকা তৈরির বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের (নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি) নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

ওই কমিটিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে তালিকাসহ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে চিঠিতে।

চিঠিতে বলা হয়, স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহযোগিতায় সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের হাসপাতালে ঝুঁকিপূর্ণ ও মেরামতযোগ্য ভবনে নির্ভরযোগ্য বাস্তবভিত্তিক একটি তালিকা প্রস্তুত হবে।

স্বাস্থ্য শিক্ষা

স্বাস্থ্য সেবার পাশাপাশি নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গেল বছরে স্বাস্থ্যশিক্ষায় বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ হয়েছে। অন্যবারের তুলনায় গবেষণায় পাঁচগুণ বেশি বরাদ্দের পাশাপাশি বিএসএমএমইউর উচ্চশিক্ষায় বেশ কিছু স্পেশালিটি খোলার পাশাপাশি বেড়েছে আসন সংখ্যা।

তবে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের ভাতা বাড়ানোর দীর্ঘ দিনের দাবি দেখেনি আলোর মুখ। এ ছাড়াও উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরতদের (রেসিডেন্সি, ডিপ্লোমা-এমফিল) ভাতা ও বর্ধিত ভাতা চালু হয়নি। ফলে সীমাহীন হাহাকার ও বিষণ্ণতা নিয়ে আরও একটি বছর পার করলেন তারা।

গ্রেড-১ ও ২ পোস্ট সৃষ্টি 

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ মেডিভয়েসকে বলেন, দেশে ৩০ হাজার স্বাস্থ্য ক্যাডারে মাত্র একটি গ্রেড-১ পোস্ট ও চারটি গ্রেড-২ পোস্ট ছিল। গেল বছরে ১০টি গ্রেড-২ এবং ১টি গ্রেড ওয়ান সৃষ্টি করা গেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদ গ্রেড-১ ও আটটি পুরনো মেডিকেল কলেজ ও দুটি এডিজির পোস্ট মিলিয়ে মোট ১০টি পোস্টকে গ্রেড-২ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় অন্যান্য মেডিকেল কলেজে অধ্যক্ষের পদ গ্রেড-২ করার পরিকল্পনা চলছে। এটি ছিল গেল বছরের অন্যতম বড় অর্জন। এ পথ ধরে ভবিষ্যতে আরও পদ তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হলো। আমরা মনে করি, ৩০ হাজার ক্যাডারের জন্য অন্তত তিন-চারশ’ গ্রেড-২ পদ সৃষ্টির দাবি রাখে।

গবেষণায় গুরুত্বারোপ

গবেষণার ক্ষেত্রে বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে বিএসএমএমইউর ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আগে যেখানে বরাদ্দ ছিল চার কোটি টাকা, গেল বছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৪০ লাখে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ইন্টিগ্রেটেড রিসার্চ প্রজেক্ট থেকে প্রায় বিশ কোটি টাকার মতো আমরা পেয়েছি, আরও ২৫ কোটি টাকার রিসার্চ গ্রান্ট আমরা পেয়েছি। সেবা শিক্ষা, গবেষণার ক্ষেত্রে বিএসএমএমইউ আগের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আগামীতে অটোমেশন পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি মৌলিক গবেষণা নিশ্চিত করা গেলে কাঙিক্ষত সাফল্য মিলবে।

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ বলেন, বেসিক সাবজেক্টে অনেক শিক্ষক প্রয়োজন। পদ তৈরি করে মেডিকেল শিক্ষাকে আমরা ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করবো।

উচ্চশিক্ষায় ভাতা প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. এবিএম জামাল বলেন, এখানে ভাতা মূলত একটি অনুপ্রেরণার মতো কাজ করে, যাতে এটা পেয়ে তারা ভালোভাবে প্রশিক্ষণ বা শিক্ষায় মনোনিবেশ করতে পারেন। এর সঙ্গে গবেষণায়ও এটি প্রসারিত করা দরকার এবং সেটা হচ্ছে। আগের তুলনায় অনেক মানসম্পন্ন গবেষণা হচ্ছে। তবে এক দিনে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানো যাবে না। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সে (বিসিপিএস) আগে কোনো গবেষণা ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল না, গত বছর থেকে আমরা তাও শুরু করতে পেরেছি।

অর্থাৎ তাদের গবেষণাকে স্বীকৃতি প্রদান ও ব্যয় নির্বাহের ব্যবস্থা করেছে সরকার, যা সত্যিই আনন্দের ব্যাপার। এটি শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেবে। যদিও এটা পর্যাপ্ত না।

বেসরকারি মেডিকেলে অটোমেশন

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সূত্র মতে, বেসরকারি মেডিকেলের জন্য অটোমেশন পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে, যা আগামী বছর থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে সরকারি মেডিকেলের মতো বেসরকারিতে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরাও মাইগ্রেশনের সময় অটো মেডিকেল কলেজ পরিবর্তনের সুযোগ পাবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারিতে ভর্তির সময় শিক্ষার্থীরা চয়েস দিয়ে রাখবে, পরে তার চয়েস ও মেধা অনুসারে অটো মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

বেসরকারি মেডিকেল কর্তৃপক্ষের অনাগ্রহের কারণে এ বছর এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। আগামীতে এটি কার্যকর হবে, এ নিয়ে মালিক পক্ষের সঙ্গে অধিদপ্তরের চূড়ান্ত আলোচনা হয়েছে।

অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষকে আর্থিক ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ

অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ জানান, আগে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষদের আর্থিক অনিয়মে অভিযুক্ত হতেন। এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর অধ্যক্ষ-উপাধ্যক্ষদের জন্য পাঁচ দিনের এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য তিন দিনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষকদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা পাওয়া যাচ্ছে না। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষকরা কখনোই দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন না। তারা অনেক সময় পুরো বিষয়টি না বুঝেই স্বাক্ষর করতেন। তা ছাড়া কর্মচারীদের দ্বারাও তাদের কেউ কেউ প্রভাবিত হতেন। 

কারেন্ট চার্জের মাধ্যমে পদোন্নতি 

তিনি বলেন, ‘চিকিৎসক শিক্ষকদের পদোন্নতি আমাদের হাতে না। যদিও তারা স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত। কিন্তু এই পদোন্নতি দেয় স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ও স্বাস্থ্য সেবা অধিদপ্তর। আমরা অনেকবার চেয়েও এটা পাইনি। ফলে মৌলিক বিষয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতি বাধার মুখে পড়ে। তখন আমরা মন্দের ভালো হিসেবে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপকের ৪২২ জনকে কারেন্ট চার্জ দিয়েছি। খুব শিগগিরই আরও ১২০ জন কারেন্ট চার্জড হবেন। এতে প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষক সংকট কিছুটা হলেও কমেছে। এর ফলে ওই শিক্ষকের বেতন না বাড়লেও নিয়ম অনুযায়ী তিনি পরীক্ষা নেওয়ার যোগ্য বলে বিবেচ্য হচ্ছেন। কোনো কারণে সরকারি চাকরিজীবীকে পদোন্নতি দেওয়া না গেলে, নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর ওই কর্মকর্তা সবেতনে পদোন্নতি পাবেন।

১০ মেডিকেলের ১৯ ছাত্রাবাসের ডিপিপি 

অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ বলেন, পুরাতন মেডিকেল কলেজগুলোতে দফায় দফায় আসন বেড়েছে। আমাদের সময় আসন ছিল ১৪০-১৫০টি। এখন সেসব মেডিকেলে ২৩০ বা তারও অধিক ছাত্র ভর্তি করা হচ্ছে। এসব কলেজের ছাত্রাবাসগুলোর বেহাল দশা এবং স্থান সংকুলানও হচ্ছে না। এ রকম ১০টি মেডিকেল কলেজের ১৯টি ছাত্রাবাসের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। খুব শিগগিরই এসবের নির্মাণকাজ শুরু হবে। 

আট মেডিকেলে সিমুলেশন ল্যাব স্থাপন

স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, দেশের স্বাস্থ্য শিক্ষাখাতের আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আটটি মেডিকেল কলেজগুলোতে অত্যাধুনিক সিমুলেশন ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে এ ল্যাব স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। সারা পৃথিবীতে এর মাধ্যমে শিক্ষাক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু দেশে এতো দিন তা ছিল না। এটা বড় অর্জন বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্টরা। 

ই-লাইব্রেরি স্থাপন 

এ ছাড়া গেলো বছর মেডিকেল কলেজগুলোতে ই-লাইব্রেরি স্থাপন ছিল স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় অর্জন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের প্রচুর ই-বুক কেনা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে না গিয়ে অনায়াসে এসব বই পড়া ও ডাউন লোড দিয়ে প্রিন্ট করতে পারে।

এমবিবিএস পরীক্ষা এগিয়ে আনার সিদ্ধান্ত

গেল বছরে শিক্ষা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বড় বড় বেশ কিছু অর্জন রয়েছে দাবি অধ্যাপক ডা. এবিএম জামাল বলেন, এ বছর আন্ডার গ্রাজুয়েট এবং পোস্ট গ্রাজুয়েট শিক্ষার ধারা প্রায় পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। পরীক্ষাগুলো ঠিক মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে। ছেলে-মেয়েরা ঠিক মতো ক্লাস করতে পারছে। গত দুই বছর তারা এ সুযোগ পায়নি। অর্থাৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে। 

বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া সহজিকরণ

অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ মেডিভয়েসকে বলেন, আগে বিদেশি ছাত্ররা ভর্তি হতো দালালের মাধ্যমে। তারা আগে অনলাইনে আবেদন করতে পারতো না। এখন এ সুবিধা নিশ্চিতের ফলে তাদের শারীরিকভাবে উপস্থিত ঝামেলা কমেছে। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রাপ্ত রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ভিত্তিতে সে জানার সুযোগ পায়, তার কোন মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ হবে, কিংবা হবে কি হবে না।

ম্যাটস-আইএসটি সক্রিয়করণ 

স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ কে এম আমিরুল মোরশেদ বলেন, মেডিকেল এ্যাসিসটেন্ট ট্রেনিং স্কুল (ম্যাটস) ও ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি (আইএইচটি) অধিদপ্তরের অধিভুক্ত। কিন্তু অনেক বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠান চালু হচ্ছিল না। ভবনগুলো পতিত অবস্থায় ছিল। দীর্ঘ দিনের অচলাবস্থা ঘুচিয়ে ৫টি ম্যাটস ও ৭টি আইএইচটিতে এবার ছাত্র ভর্তি শুরু হয়েছে।

নতুন বছরের প্রত্যাশা 

চিকিৎসকদের প্রত্যাশা, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক একটি মন্দাবস্থা চলছে। এর প্রভাবে ওষুধপথ্যসহ অনেক কিছুরই দাম বেড়েছে। আমরা প্রত্যাশা করবো, এটা খুবই দ্রুতই কেটে যাবে এবং জিনিস-পত্রের দাম আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। সাধারণ মানুষ ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সব কিছু জোগাড় করতে সক্ষম হবেন। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
করোনা ও বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা

এক দিনে চিরবিদায় পাঁচ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক