ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি অযৌক্তিক: ক্যাব
মেডিভয়েস রিপোর্ট: ভোক্তাদের অধিকার সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে ওষুধের দাম যে মাত্রায় বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা ‘অযৌক্তিক ও অন্যায়’ বলে জানিয়েছে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব)।
আজ বুধবার (২৩ নভেম্বর) দুপুরে ‘ওষুধের অযৌক্তিক ও অনৈতিকভাবে মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ’ শীর্ষক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি এই দাবি জানায়।
সম্মেলনে ক্যাব জানায়, গত ২০ জুলাই ৫৩টি ওষুধের দাম পুনঃনির্ধারণ করে সরকার। এর মধ্যে প্যারাসিটামল, মেট্রোনিডাজল, এমোক্সিলিন, ডায়াজিপাম, ফেনোবারবিটাল, এসপিরিন ও ফেনোক্সিমিথাইল পেনিসিলিনসহ অন্যান্য জেনেরিকের ওষুধ রয়েছে।
গত ছয় মাসে এসব ওষুধের দাম ১৩-৭৫% পর্যন্ত বেড়েছে। এ ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধের দাম ১৩-৩৩% পর্যন্ত বেড়েছে।
এতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ক্যাব সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, স্বাস্থ্যখাতে অনেক অব্যবস্থাপনা আছে, যা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে আমাদের অনেক অর্জনও আছে। দেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন দেশের চাহিদা মেটাতে ৯৫-৯৮% ওষুধ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এখন আমরা ৯৮% ওষুধ বা এর চেয়ে বেশি দেশে উৎপাদন এবং সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া আমাদের দেশে উৎপাদিত ওষুধ ১২৪টির মতো দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এজন্য যেসব প্রতিষ্ঠান এসব উদ্যোগ নিয়েছে, তাদের সাধুবাদ জানাই। কোভিডের মতো একটা মহামারি বাংলাদেশ সরকার যে দক্ষতার সাথে মোকাবিলা করেছে, তা সারা বিশ্বেই নজিরবিহীন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় এনে সুরক্ষা দেওয়া অনেক বড় ব্যাপার। আমাদের হাসপাতালগুলোতেও সেবা অনেকটাই বেড়েছে। এগুলো সবই ইতিবাচক দিক। তবে অনেকগুলো নেতিবাচক দিক আছে, যা আজকের আলোচনায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশে ওষুধের মূল্য বৃদ্ধির যে প্রক্রিয়া, সেটি যুক্তি ও ন্যায়সঙ্গত কী না সন্দেহ আছে। এক সময়ে দুই শতাধিক ওষুধের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব ছিল ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের। কিন্তু পরবর্তীতে তা কমিয়ে ১১৭টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণ করছে তারা। কারণ এর বাইরে যে ওষুধগুলো রয়েছে, সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ অনেকটা নির্ভর করে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ওপরই। এতে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে বলে আমাদের ধারণা।
ক্যাব সভাপতি বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প ক্রমান্বয়ে বড় হচ্ছে। স্বাধীনতার আগে দেশে মাত্র ২-৩% ওষুধ তৈরি হতো। সে সময় ওষুধ আমদানি করে বেশিরভাগ চাহিদা পূরণ করতে হতো। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ৭০ ভাগ ওষুধ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির পর দেশে ওষুধ তৈরির কারখানা চালু হয়। এরপর এই শিল্পকে আর পেছনে ফিরতে হয়নি। এখন চাহিদার প্রায় ৯৮% ওষুধ দেশেই তৈরি হচ্ছে। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও ওষুধের বাজার বিস্তার লাভ করেছে।
গোলাম রহমান বলেন, জেনেরিক নামের যে দুই শতাধিক ওষুধের মূল্য নির্ধারণের দায়িত্ব ঔষধ প্রশাসনের ছিল, তা পুনর্বহাল করা হোক। ওষুধ কোম্পানিগুলোকে কোনোরকম জবাবদিহিতা ছাড়া মূল্য বৃদ্ধির যে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে বর্তমানে ঔষধ প্রশাসনের দক্ষতা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে যেসব প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সমাধান করতে হবে। সম্প্রতি স্যালাইনের যে মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে, এটা একটা খুবই বাজে নজির, যেখানে ভোক্তাদের প্রতিনিধিরা আপত্তি জানানো সত্ত্বেও তা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত বলে মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটা শুধু অনৈতিক নয়, এটা একটা বেআইনি কাজ।
এর আগে ক্যাবের কোষাধ্যক্ষ ড. মো. মুঞ্জুর-ই-খোদা তরফদার বলেন, দেশে ওষুধ শিল্প বিস্তার লাভ করলেও ওষুধ তৈরির জন্য শতকরা ৯৭ শতাংশ কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। যার মধ্যে অধিকাংশ কাঁচামাল ভারত ও চীন থেকে আসে। উন্নত বিশ্বের কয়েকটি দেশ থেকেও কিছু কাঁচামাল আসছে। তবে নিম্ন আয়ের দেশ (এলডিসি) হিসেবে বাংলাদেশ ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা পেয়ে আসছে, যা ২০৩২ সাল পর্যন্ত বহাল রয়েছে। তবে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হলে এই সুবিধা বহাল থাকবে কী না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশের ওষুধ শিল্প সম্প্রসারণ করলেও সামাজ্যবাদের আগ্রাসন থেমে নেই। শুরুতে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করলেও এখনো তাদের ভূমিকা অদৃশ্যভাবে বহাল রয়েছে। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন সরকার ওষুধ শিল্পের ওপর কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ চালু করে। এক আদেশে দেশে উৎপাদিত মাত্র ১১৭টি জেনেরিক ওষুধ সরকারের নিয়ন্ত্রণে রেখে বাকি ওষুধ কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে নেয়। যদিও দেশে ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণে ওষুধ আইন ১৯৪০, ১৯৪৫ সালের ড্রাগ রুলস, ১৯৪৬ সালের দ্য বেঙ্গল ড্রাগস রুলস, ১৯৮২ সালের ড্রাগ অর্ডিন্যান্স এবং ২০১৬ সালে জাতীয় ওষুধ নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এরপরও ১৯৯৪ সালের সেই আদেশ প্রত্যাহার করা হয়নি। ওই আদেশের বলে পুরো ওষুধ শিল্পের নিয়ন্ত্রণ মূলত কোম্পানিগুলোর হাতে চলে যায়।
তিনি আরও বলেন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সম্প্রতি আইভি ফ্লুয়িড জাতীয় ওষুধের মূল্য বৃদ্ধির পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ২০ নভেম্বর ২০২২ তারিখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ওষুধের মূল্য নির্ধারণ কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় তালিকাভুক্ত ১১৭টি ওষুধের মূল্য নির্ধারণের জন্য গঠিত টেকনিক্যাল সাব-কমিটির সভার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। পাশাপাশি ৬টি ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ২১টি জেনেরিক ৫৮টি পদের কস্টিং শিট পর্যালোচনা করা হয়।
এসব ওষুধের মধ্যে রয়েছে কলেরা স্যালাইন, হার্টম্যান সলিউশন, সোডিয়াম ক্লোরাইড, ডেক্সটোজ, ডেক্সটোজ প্লাস সোডিয়াম ক্লোরাইড, মেট্রোভিজানল ও হিউম্যান ইনসুলিন। দেশে যখন প্রায় সব নিত্যপণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী তখন ওষুধের মতো এতো প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়ানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ওষুধের মার্ক আপ কমিয়ে ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের হস্তক্ষেপ করা উচিত বলে আমরা মনে করছি।
ভার্চুয়ালি সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত ছিলেন ক্যাবের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম, এসএম নাজের হোসাইন, কোষাধ্যক্ষ ড. মো. মঞ্জুর-ই-খোদা তরফদার ও সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ মিজানুর রহমান রাজু।