‘রোগীর প্রয়োজনেই চিকিৎসকদের মননশীল কাজে জড়ানো উচিত’
মেডিভয়েস রিপোর্ট: মেডিকেল শিক্ষা বা পেশার সাথে জড়িতদের স্বাভাবিকভাবেই ব্যস্ততা একটু বেশি। তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও রোগীদের সুস্থতার প্রয়োজনে নিজেদেরকে সাংস্কৃতিক ও বাচিক শিল্পের মতো মননশীল কাজে জড়িত রাখা উচিত বলে মনে করেন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এস এম মোস্তফা জামান।
শনিবার (২৯ অক্টোরব) স্বাস্থ্য বিষয়ক পত্রিকা মেডিভয়েসের আয়োজনে ‘মেডিভয়েস আবৃত্তি প্রতিযোগিতা-২০২২’ এর বিজয়ীদের নাম ঘোষণা অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশ কার্ডিওভাস্কুলার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সভাপতি বলেন, ‘বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষা বা পেশার সাথে আমরা যারা জড়িত আছি, আমাদের কাজের পাশাপাশি নিজের মেধা বা মননের বহিঃপ্রকাশ রোগীর প্রয়োজনেই দরকার হয়। আমি বিচারক হিসেবে যখন আবৃত্তিগুলো শুনছিলাম, সত্যি বলতে অসাধারণ লাগছিল। সবাইকে যদি পুরস্কার দেওয়া যেত তাহলে ভালো লাগতো। অনেকের উপস্থাপনভঙ্গি বেশ নজর কেড়েছে। কেউ মোমবাতি জ্বালিয়ে ভিডিও করেছেন, কেউবা আলো-আঁধারের পরিবেশ তৈরি করে কবিতা রেকর্ড করেছেন, কেউ কবিতার বিষয়বস্তু উপজীব্য করতে একটু সুন্দর করে সেজেছেন, চুলের মধ্যে কেউ ফুলের খোঁপা লাগিয়েছেন। অর্থাৎ তাদের মনে এই আকুতি ছিল যে, কীভাবে জিনিসটিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা যায়।’
ডা. এম এম মোস্তফা জামান বলেন, ‘একজন কবি যখন কবিতা লেখেন, তখন তিনি তার আবেগকে শব্দের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলেন। আবৃত্তিকারক কবির সেই আবেগকে ধারণ করে, আরেকটু ব্যঞ্জনাময় ও শ্রুতিমধুর করে দর্শকের সামনে তুলে ধরেন। এক সময় বারবার পাঠ করাকে আবৃত্তি বলা হতো, কিন্তু এখন সেটি বলা হয় না। এখন আবৃত্তি মানে অনেক অভিব্যক্তি থাকবে, অনেক ব্যঞ্জনা থাকবে। প্রমিত উচ্চারণকে অক্ষুণ্ণ রেখে কবিতার ভাব, উদ্বেগ, যতি ও বিরাম চিহ্ন—সব কিছুকে ধারণ করে এক ধরনের শক্তিশালী ব্যঞ্জনাময় প্রকাশকে আবৃত্তি বলে।’
নিজের আবৃত্তি চর্চার স্মৃতিচারণ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক বলেন, ‘আবৃত্তির জন্য ক্লাসরুম দরকার হয়। আমি ১৯৮৮ সালে কথা আবৃত্তি সংগঠনের সাথে ৫ম কর্মশালায় ভর্তি হয়েছিলাম। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি কবিতা আবৃত্তি করা শিখতে হবে। সবাই হয়তো আবৃত্তি পারবে না, কিন্তু বাচিক কাজের সাথে যারা যুক্ত আছেন, যেমন- গান গাওয়া, উপস্থাপনা করা সবই কিন্তু দর্শকের সামনে উপস্থাপন করতে হচ্ছে। তবে সবই বাচিক কাজ হলেও কবিতার সাথে এসবের কিছু পার্থক্য আছে। যেমন- একটি কবিতা ‘আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেবো, আমি তোমার ...’—এটাকে যখন গানে রূপ দেওয়া হবে, তখন হয়তো কিছুটা টেনে টেনে গাইতে হবে। কিন্তু এটাকে যখন আবৃত্তি করা হবে, তখন একই শব্দ কিছুটা ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণ করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যেক মাধ্যমেই যারা বাচিক শিল্পী আছেন, প্রত্যেকের জায়গায় শেখার অনেক কিছু আছে। এতগুলো প্রতিযোগীর মধ্য থেকে যে পাঁচজনকে আমরা নির্বাচিত করেছি, সবার আবৃত্তি শুনে আমি মুগ্ধ হয়েছি, সামনাসামনি শুনতে পারলে হয়তো আরও ভালো লাগতো। আমি ইউটিউবে যখন আবৃত্তিগুলো দেখছিলাম, আমার মনে হয়েছে, তাদের মনের ভেতরে যে আবেগ-আকুতি সেটি আমি স্পর্শ করতে পেরেছি।’
তিনি বলেন, ‘আবৃত্তি শোনার সময় কয়েকটি বিষয় আমার চোখে পড়েছে। প্রথমত আবৃত্তি করার জন্য কবিতা নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অনেকের কণ্ঠে বিদ্রোহী কবিতা বেশ ভালো মানায়, কারও কণ্ঠে আবার প্রেমের কবিতা কিংবা বিরহের কবিতা শুনতে ভালো লাগে। অনেকের গলা হয়তো খুব ভরাট কিন্তু কারুকাজ কম। ভরাট গলায় সবই শুনতে ভালো লাগে, কিন্তু কারুকাজ না থাকলে সেই আবৃত্তিটি দর্শকের কাছে মনোমুগ্ধকর হয় না। আমার কাছে অনেকের ক্ষেত্রে মনে হয়েছে, তিনি হয়তো একটি বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তি করেছেন, কিন্তু তিনি যদি প্রেমের কবিতা আবৃত্তি করতেন, তাহলে হয়তো ভালো হতো। আবৃত্তি করার জন্য সুস্পষ্ট উচ্চারণ ঠিক রাখতে হবে, সঙ্গে অভিব্যক্তি ও কণ্ঠের কারুকাজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয়ত কবিতাকে শুধু মুখস্থ করা নয়, এটাকে আত্মস্থ করতে হবে। অর্থাৎ কবিতাকে ভালোবাসতে হবে, আবৃত্তিকে ভালবাসতে হবে। এখন হেমন্তকাল চলছে, এই বিষয়গুলো অনুভব করতে হবে। ব্যস্ততার মাঝেও এসব বিষয় চর্চা করতে হবে। আমরা শত ব্যস্ততার মাঝেও এই বাচিক কাজগুলোর সাথে সম্পৃক্ত আছি, না হলে হয়তো আমাদের এখানে ডাকা হতো না।’
মেডিকেল কলেজগুলোয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কম হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বিএসএমএমইউ’র এ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ইদানিং মেডিকেল কলেজগুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় না, সাহিত্য উৎসব নেই বললেই চলে। কিন্তু আমরা যখন মেডিকেল কলেজে ছিলাম, তখন সাহিত্য উৎসব হতো। আমরা কবিতা লিখতাম, কবিতা আবৃত্তি করতাম, গল্প বলার অভ্যাস ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি একটা সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল। সে অভ্যস্ততার কারণেই এত ব্যস্ততার পরও বিছানার পাশে একটা কবিতার বই রাখি, ঘুমানোর আগে দুটো লাইন পড়ি। মাঝে মাঝে পূর্ণিমার চাঁদটা দেখে আসি। কোননা কোনভাবে বাচিক কাজে যুক্ত থাকলে রোগীদের সাথেও কিন্তু আমরা এ ধরনের কাজের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে চিকিৎসার কাজকে এগিয়ে নিতে পারবো।’
‘পরিশেষে এই আয়োজনে সারাদেশ থেকে ছাত্র-শিক্ষক যারা অংশগ্রহণ করেছেন, সবার প্রতি ভালবাসা বিশেষ করে, মেডিভয়েসকে ধন্যবাদ এত সুন্দর একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করার এবং আমাদেরকে আমন্ত্রণ করার জন্য’, যোগ করেন এ বাচিকশিল্পী।