১৮ জুন, ২০২২ ০৮:৫০ পিএম

প্রফে অকৃতকার্য হওয়াসহ নানা সংকটে মেডিকেলে আত্মহত্যা, উত্তরণ কোন পথে?

প্রফে অকৃতকার্য হওয়াসহ নানা সংকটে মেডিকেলে আত্মহত্যা, উত্তরণ কোন পথে?
ছয় মাসে আত্মহত্যা করেছেন চারজন চিকিৎসক ও তিনজন মেডিকেল শিক্ষার্থী। চারজন চিকিৎসকের মধ্যে দুইজন পুরুষ আর দু’জন নারী। তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুইজন ছেলে আর একজন মেয়ে।

সাখাওয়াত হোসাইন: মেডিকেল শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা থামছেই না। গত বছর পাঁচজন মারা গেলেও চলতি প্রথম ছয় মাসেই সাতজন চিকিৎসক-মেডিকেল শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, অপ্রাপ্তি, প্রেমে ব্যর্থতা, পড়াশোনার চাপ, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, পারিবারিক কলহ থেকে মানসিক চাপ এবং এ থেকে একাকিত্ব ও হতাশার এক পর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অনেকে। আত্মহত্যার আগে কেউ কেউ চিরকুট লিখে গেছেন। কেউ আবার নীরবে-নিভৃতে ত্যাগ করেছেন দুনিয়ার মায়া। তাদের আত্মহত্যার কারণ অনেক ক্ষেত্রে জানা সম্ভব হয় না।

পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা

সর্বশেষ মঙ্গলবার (১৪ জুন) রাত সাড়ে ৯টায় গাজীপুর টঙ্গীর মাছিমপুরের নিজ বাসায় ‘পারিবারিক কলহের জেরে’ সিলিংফ্যানের সঙ্গে গলায় ঝুলে আত্মহত্যা করেন ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস বন্যা।

জানা গেছে, একটি পোশাক কারখানায় চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস। কয়েক মাস ধরে পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায় ঝগড়া চলছিল। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ফের স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া হয়। এরই জের ধরে নিজ ঘরের সিলিংফ্যানের সাথে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন। ঝুলন্ত অবস্থায় ডা. জান্নাতুল ফেরদৌসকে উদ্ধার করে টঙ্গীর শহিদ আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

গত ১১ জুন রাত ৯টা ৫৮ মিনিটে চিরকুট লিখে আত্মহত্যা করেন ঢাকা কমিউনিটি মেডিকেল কলেজের (ডিসিএমসি) ৮ম ব্যাচের শিক্ষার্থী মানিক চন্দ্র বাড়ৈ। চিরকুটে মানিক বাড়ৈ লেখেন, ‘আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি ব্যক্তি হতাশার কারণে আত্মহত্যা করতেছি। আমি মেডিকেলে ফেল করেছি এবং লেখক হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। তাই আমি আত্মহত্যা করছি। আমি কারো দ্বারা প্রভাবিত নই।’

হঠাৎ হতাশায় আত্মহত্যা

গত ৫ জুন নিজ বাসভবনে আত্মহত্যা করেন বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের (শজিমেক) ডা. খোকন সাহা। তিনি ৩৮তম ও ৩৯তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডার হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর মেডিকেল অফিসার ডা. খোকন চন্দ্র সাহা। প্রেষণে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে অনকো-সার্জারি এমএস ফেজ-এতে অধ্যয়নরত ছিলেন ডা. খোকন সাহা। তার স্ত্রী ডা. চৈতি সাহা ৩৭তম বিসিএসে সহকারী ডেন্টাল সার্জন হিসেবে কর্মরত আছেন। টাকা-পয়সা বা প্রাচুর্যের কোনো কমতি ছিল না ডা. খোকন সাহার। তারপরও তিনি কেন এবং কোন কারণে আত্মহত্যা করেছেন, তা জানেন না কেউ। তার সহকর্মী এবং বন্ধু-বান্ধবরা সবসময় খোকন সাহাকে দেখেছেন সদা হাস্যোজ্জ্বল। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি হঠাৎ হতাশায় পড়ে আত্মহত্যা করেছেন।

গত ১২ জানুয়ারি গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন যশোর বেসরকারি আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী সীমা জোহরা। তবে তাঁর আত্মহত্যার কোনো কারণ জানা যায়নি। তার সহপাঠী ও শিক্ষকদের ধারণা, সীমা হঠাৎ হতাশায় পড়ে আত্মহত্যা করেছেন।

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা

প্রেমে ব্যর্থ হয়ে গত ৪ জানুয়ারি ফেসবুক লাইভে এসে ঘুমের ওষুধসহ বিভিন্ন ধরনের প্রায় ২০০ ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন কুমিল্লা ময়নামতি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক তানজির উদ্দিন। জানা গেছে, ময়নামতি মেডিকেলের একজন নারী চিকিৎসকের সঙ্গে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল ডা. তানজিরের। পরে পর্যায়ক্রমে ওই নারী চিকিৎসক তানজিরের সঙ্গে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। নারী চিকিৎসকের কর্মকাণ্ড মানতে না পেরে তানজির ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। সর্বশেষ ট্যাবলেট খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

দেড় বছরে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান

২০২১ সালে প্রেমঘটিত কারণসহ নানা কষ্ট নিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনজন মেডিকেল শিক্ষার্থী ও দুই চিকিৎসক। আর ২০২২ সালের পাঁচ মাস ১৭ দিনেই আত্মহত্যা করেছেন চারজন চিকিৎসক ও তিনজন মেডিকেল শিক্ষার্থী। চারজন চিকিৎসকের মধ্যে দুইজন পুরুষ আর দু’জন নারী। তিনজন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুইজন ছেলে আর একজন মেয়ে।

হতাশা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজের প্রায় ৩৬ শতাংশ ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজের প্রায় ২৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে ইমপোস্টার সিনড্রোম বা নিজেকে প্রতারক ভাবার প্রবণতা রয়েছে। গড়ে এ হার দাঁড়ায় ৩২ শতাংশের কিছু বেশি।

মেডিকেল কলেজে এমবিবিএস অধ্যয়নরত সব বর্ষের শিক্ষার্থীদের মধ্যেই কম বেশি এ সমস্যা দেখা যায়। এর মধ্যে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ২৭ শতাংশ, দ্বিতীয় বর্ষের ১৯, তৃতীয় বর্ষের ৪০, চতুর্থ বর্ষের ৪০ ও পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ৩৮ শতাংশের মধ্যে নিজেকে প্রতারক মনে করার প্রবণতা রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মুখে হতাশার বয়ান 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, যারা মেডিকেলে পড়তে আসে, তারা ছোট বেলা থেকে খুব ভালো স্টুডেন্ট। ক্লাসে সবার রোল থাকে শীর্ষে, আর মেডিকেলে আসার পর সব মেধাবী স্টুডেন্ট একত্রিত হয়। সব মেধাবী স্টুডেন্টদের মধ্যে কিছু শিক্ষার্থী ভালো করতে পারে, আর অন্যরা অতটা ভালো করতে পারে না। এতে তারা হতাশ হয়ে যায়। থার্ড প্রফে গিয়ে অনেকেই অকৃতকার্য় হয়, মেডিকেলে অকৃতকার্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। এটা আবার অনেকে মানতে পারে না। কিছু শিক্ষার্থী আছে, তার সমমানের বন্ধু পায় না। আর মেডিকেলের শিক্ষার্থীগুলো চরম লেভেলের স্বার্থপর। বিপদে পড়লে কেউ কাউকে উদ্ধার করতে যায় না। দুই-একজন এগিয়ে আসে, বেশির ভাগই আসে না। ধরেন, আপনি অকৃতকার্য হলেন, কেউ সান্ত্বনা দিতে আসবে না, আসলেও দুই-একজন কাছের বন্ধু আসবে। এরপর আর তার খবর রাখবে না কেউ। একজন পিছিয়ে পড়লে, তাকে আর কেউ এগিয়ে নিতে চায় না। সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আশপাশে কে মরলো বা বাঁচলো, কেউ তাকায় না। যেটাকে বলে, ‘নিজে বাঁচলে বাপের নাম।’ 

তিনি আরও বলেন, মেডিকেলের একাকিত্ব কাটাতে অনেকে আবার প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। প্রেম গভীরতায় চলে গেলে, কোন এক কারণে ব্রেক-আপ হয়ে যায়। পরে প্রেমিক-প্রেমিকা হতাশায় ভেঙে পড়ে। চোখে মুখে দেখে অন্ধকার। এরপর তারা আত্মহত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। হতাশার অন্যতম কারণ এগুলো।

হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমরা চিন্তা-ভাবনা ছাড়াই মেডিকেলে ভর্তি হয়েছি। ভর্তি হওয়া পর দেখি, প্রচুর পরীক্ষা-আইটেম, সাথে আছে চাপ। নিজেকে দেওয়ার মতো খুব কম সময়ই পাওয়া যায়, যা মস্তিষ্ক স্বাভাবিক রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রাইভেটে ভর্তি হওয়ার পর থেকে টাকার চিন্তা। পড়াশোনা ও শিক্ষকদের চাপ প্রচুর থাকে। প্রফে অকৃতকার্য হলেই গুণতে হয় মোটা অংকের টাকা, যা মারাত্মক যন্ত্রণার কারণ। আবার মেধাবী শিক্ষার্থীরা, তুলনামূলক কম মেধাবীদের সঙ্গে মিশতে চায় না। সেই সাথে ধনী-গবির বৈষম্য তো আছেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আমার ইচ্ছা ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু মা-বাবার ইচ্ছা ডাক্তার বানাবেন। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে কোচিং করলাম। কিন্তু দুইবার চেষ্টা করেও সরকারি মেডিকেলে চান্স পেলাম না। অনেক টাকা খরচ করে মা-বাবা প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি করালেন। ধীরে ধীরে মেডিকেলের পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠি। প্রথম ও দ্বিতীয় প্রফে পাস করেছি। কিন্তু তৃতীয় প্রফে প্রচুর পড়াশোনা করেও আমি অকৃতকার্য হয়েছি। দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়েও তৃতীয় প্রফে পাস করতে পারিনি। এবারও পাস করতে পারবো কিনা জানি। এখন আমার কাছে প্রচুর হতাশা লাগছে। মাঝে মাঝে ভাবি আমাকে দিয়ে কিছুই হবে, একদিকে বয়স বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আমার প্রকৃত অবস্থান মা-বাবাকেও জানাতে পারছি না। এখন নিজেকে মাঝে মাঝে একা মনে হয়। পাস করতে পারছি না, মেডিকেল ছাড়তেও পারছি না। চোখে-মুখে অন্ধকার দেখি।’

ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করা একজন চিকিৎসক মেডিভয়েসকে বলেন, ‘প্রচুর হতাশ লাগছে, অনেকবার চেষ্টা করেও পোস্ট গ্রাজুয়েশনে চান্স পাইনি। একদিকে বিসিএসও হচ্ছে না, চাকরির বয়স প্রায় শেষের দিকে। অন্য দিকে পরিবারের বড় সন্তান, চিকিৎসক হয়েও তাদেরকে আর্থিক যোগান দিতে পারছি না। চেম্বারে বসলেও রোগী তেমন আসে না, বিয়ের বয়সও শেষ হয়ে যাচ্ছে, হাতে তেমন টাকা-পয়সাও নেই। জীবন নিয়ে কোন দিকে যাবো, কুল কিনারা পাচ্ছি না।’

এ ছাড়াও এমবিবিএস পাস চিকিৎসকের বিরাট একটা অংশের মধ্যে রয়েছে হতাশা। কারণ অনেক চেষ্টা করেও উচ্চশিক্ষায় চান্স পাচ্ছেন না। চেম্বারে ভালো রোগী আসেন না। সরকারি চাকরিতে পদের সংখ্যা কম, আবার যথাযথ নিয়োগও হচ্ছে না। বেসরকারিতে বেতন-ভাতা কম, মালিকপক্ষ আবার ঠিকমতো বেতনও দিতে চায় না।

উত্তরণের উপায়

জনপ্রিয় লেখক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. তাজুল ইসলাম মেডিভয়েসকে বলেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের উপর পড়াশোনার চাপ ও চ্যালেঞ্জ বেশি থাকার কারণে অনেকেই মানসিক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। আর আর্থিক চাপ তো আছেই। বয়স ও আবেগের উপর প্রভাব পড়ছে। পারিবারিক সম্পর্ক ও নিজের উপর অনাস্থা থেকে এই ঘটনাগুলো ঘটছে। শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত শিক্ষার্থীদেরকে মানসিকভাবে সান্ত্বনা দেওয়া ও আশ্বস্ত করা। শিক্ষার্থীরা ব্যর্থ হবে কিন্তু ব্যর্থতা থেকে উত্তরণের উপায় দেখাতে হবে। মানসিকভাবে শক্তি দিতে হবে, যাতে কোনো শিক্ষার্থী ভেঙে না পড়ে।

তিনি আরও বলেন, যারা আত্মহত্যা করে, তারা দীর্ঘদিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকে। তাদের দিকে মনোযোগ ও মানসিকভাবে ব্যাপক সমর্থন দিতে হবে। যারা আর্থিকভাবে কষ্টে আছে, তাদেরকে বিশেষভাবে সহায়তা করতে হবে। যেসব শিক্ষার্থী হালকা মানসিক রোগে আক্রান্ত, তাদেরকে মা-বাবা, সহপাঠী, শিক্ষক সবাইকে দেখতে হবে। এতেও যদি না হয়, তাহলে তাঁকে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। বেশি মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে তাকে ওষুধ-পত্র ও উন্নত চিকিৎসা করাতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সম্মানহানি, অপমান বোধ, কারও সঙ্গে মনোমালিন্য, ছোট-খাটো জিনিসকে বড় করে দেখা ও চাওয়া-পাওয়া পূরণ না হলে অনেকের মাথায় প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়, তাতে তারা হঠাৎ আত্মহত্যা করে। তাদেরকে চিহ্নিত করতে হবে, কারা অল্পতেই ভেঙে পড়ে, কারা ব্যর্থতাকে মেনে নিতে পারে না, পরিস্থিতির সাথে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। অনেক কিছু আছে, আমাদেরকে মানিয়ে নিতে হয়। যারা মেনে নিতে পারে না, তাদেরকে পরিচর্যার সাথে মানসিকভাবে সহনশীল করে তুলতে হবে। বাস্তবমুখী ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করার উপযোগী করে তুলতে হবে।

সচেতন হওয়ার আহ্বান

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. এস এম আতিকুর রহমান  মেডিভয়েসকে বলেন, উপার্জন কম হওয়ায় অনেক চিকিৎসকের মধ্যে হতাশা কাজ করে। চাকরি না পাওয়ার কারণে, ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তা ও আর্থিক অবস্থা থেকে হতাশা তৈরি হয়।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত কিছু সম্পর্কের কারণেও মানুষ হতাশ হয়ে পড়ে। একমাত্র মানসিক বিশেষজ্ঞ ছাড়া বাকি চিকিৎসকদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে চরম উদাসীনতা রয়েছে। তারা যখন হতাশায় চলে যায়, তা থেকে উত্তরণের জন্য কোনো ধারণা থাকে না। অন্যান্য লোক মানসিক রোগ সম্পর্কে যতটা সচেতন, চিকিৎসকরা ততটা নয়। এগুলো আমার ব্যক্তিগত কথা নয়, গবেষণার কথা।

তিনি আরও বলেন, মেডিকেল শিক্ষার্থীদের হতাশার জন্য পড়াশোনা পদ্ধতিও অনেকটা দায়ী। মেডিকেলে যারা পড়াশোনা করে তাদের জবাবহিদি অনেকটা কম। ইন্টারমিডিয়েটের একটা ছেলে-মেয়ে যেভাবে একটা জবাবদিহিতার মধ্য দিয়ে যায়, সেটা মেডিকেলে নেই। আন্ডারগ্রাজুয়েশন লেভেলে একটা অভিযোগ হলো শিক্ষার্থীকে ইচ্ছা করে ফেল করিয়ে দেওয়া। আবার কেউ মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে তার খোঁজ-খবর রাখে না কেউ। শিক্ষকরাও তাদের সময় দেন না। মেডিকেলের একজন স্টুডেন্ট যখন ক্লাসে আসে না, পড়াশোনা পারে না, তাকে নিয়ে শিক্ষকরা চিন্তাও করে না। এসব বিষয়ে আমাদের সবার সচেতন হওয়া উচিত।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনিস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার ডা. টুম্পা ইন্দ্রানি ঘোষ মেডিভয়েসকে বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আছে, যারা মেডিকেলে পড়তে চান না। কিন্তু মা-বাবার ইচ্ছায় মেডিকেলে ভর্তি হওয়া লাগছে। পরে মেডিকেলের পরিবেশে এসে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। মেডিকেলে প্রচুর পরীক্ষা, আইটেম, টার্ম ইত্যাদি থাকে, অনেকেই এসব কারণে হতাশ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বেসরকারি মেডিকেলের শিক্ষার্থীরা। কারণ প্রফে অকৃতকার্য হলেই গুণতে হয় মোটা অংকের টাকা। অনেক সময় সন্তানের ফেলের খবর শুনে, অভিভাবকরা একটু কটু কথা বলেন, এত টাকা দিয়ে মেডিকেলের ভর্তি করালাম। পাস করতে পারলে না। এতে শিক্ষার্থী হতাশ হয়ে যায়। সেই সাথে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ও নিজের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলে।

তিনি আরও বলেন, অনেক মেডিকেলে শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক সংখ্যা কম। শিক্ষকরা পারেন না তাদের খোঁজ-খবর নিতে। শিক্ষকদের উচিত কোনো শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে, ক্লাসে না আসলে বা হতাশায় থাকলে তাকে মানসিকভাবে সাহস দেওয়া, নিয়মিত খোঁজ-খবর নেওয়া ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে শিক্ষক, কলেজ প্রশাসন ও অভিভাবক সবাইকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

আত্মহত্যা প্রতিরোধে চাই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যা ও মানসিক রোগ প্রতিরোধে প্রতিটি জেলায় রাষ্ট্রীভাবে মানসিক সেন্টার তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি বেকারত্ব, আর্থিক সংকট কমাতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৈষম্য কমাতে হবে। মানসিক রোগ নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে বরাদ্দ দেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

এ প্রসঙ্গে ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে বেকারত্ব না থাকে, আর্থিকভাবে চাপ বা কষ্ট না থাকে। মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বাড়াতে হবে। অনাচার ও বৈষম্য যাতে প্রকট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সামাজিক অস্থিতা কমাতে হবে।

অধ্যাপক ডা. আতিকুর রহমান বলেন, যেকোনো কর্মকাণ্ডে একজন শিক্ষার্থী বা কর্মকর্তার কর্ম-দক্ষতা কমে গেলে, সেই ব্যাপারে তাকে গুরুত্ব দেওয়া, কাউন্সিলিং করা ও মানসিকভাবে সাহস জোগানো জরুরি।

এ প্রসঙ্গে বিএসএমএমইউর মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. সেলিনা ফাতেমা বিনতে শহিদ বলেন, সাইবার বুলিং কমাতে হবে। অনেকে বুলিংয়ের শিকার হলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এগুলো কমাতে প্রশাসনিক যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। মানসিক রোগের বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে। সেই সাথে সঠিক পরামর্শ নিতে হবে। মানসিক রোগ সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে এবং সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি