ডা. এস.এম. লুৎফর রহমান

ডা. এস.এম. লুৎফর রহমান

সহযোগী অধ্যাপক, রেসপিরেটরি মেডিসিন,
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


০৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২২ ০৬:৫১ পিএম

শিশুদের কাশি মানেই নিউমোনিয়া নয়

শিশুদের কাশি মানেই নিউমোনিয়া নয়
এলার্জি, ঠাণ্ডা ও গরমে ঘেমে গেলে কাশি হতে পারে। এ কাশির সাথে জ্বর থাকবে না। কিন্তু নিউমোনিয়া হলে কাশির সাথে জ্বর থাকবে। প্রতীকী ছবি।

মেডিভয়েস রিপোর্ট: নিউমোনিয়া আক্রান্ত হলে ফুসফুস পচে যায়। সাধারণত ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক সংক্রমণের কারণে নিউমোনিয়া হয়। নিউমোনিয়া মৃদু বা হালকা থেকে জীবন হানিকরও হতে পারে। এটি সাধারণত বয়স্ক ব্যক্তিদের, যারা দীর্ঘদিন রোগে ভুগছেন অথবা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম বা দুর্বল, তাদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। ফুসফুস শরীরের ইঞ্জিন। ইঞ্জিন আক্রান্ত হলে শরীরের অবস্থা অবশ্যই খারাপ হয়। নিউমোনিয়ার কারণে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করে। বিশেষ করে শিশু এবং বয়স্করা বেশি মারা যায়। আমাদের দেশে শিশু এবং বয়স্কদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ নিউমোনিয়া। 

নিউমোনিয়া

নিউমোনিয়া হচ্ছে ফুসফুসের প্রদাহ। নিউমোনিয়া হলে ফুসফুস অকার্যকর হয়ে যায়। বাতাস থেকে অক্সিজেন শ্বাসনালীর মাধ্যমে ফুসফুসে পৌঁছায়। পরবর্তীতে ফুসফুস অক্সিজেনকে শরীরের রক্তে পৌঁছে দেয়। এবং ফুসফুস শরীরের দূষিত পদার্থ কার্বন-ডাইঅক্সাইড রক্ত থেকে বাতাসে ছেড়ে দেয়। কিন্তু নিউমোনিয়ার কারণে ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে এটি স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে না। তখন শ্বাস কষ্ট দেখা দেয়। এবং রোগীর জীবন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে। শিশু এবং বয়স্করা বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। অর্থাৎ যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি।

লক্ষণ

নিউমোনিয়ার লক্ষণগুলো হলো: জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও কাশির সঙ্গে রক্ত বের হওয়া। বুকে ব্যথা, যা শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ওঠা-নামা করে।

কারণ

নিউমোনিয়া সাধারণত জীবানুঘটিত কারণে হয়। ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পাঙ্গাসের মতো জীবানুর মাধ্যমে এ রোগ হয়ে থাকে। যে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আমাদের নিউমোনিয়া হয়, এটাকে সাধারণত স্ট্যাফাইলোক্কাস নিউমোনিয়া বলে, এটি বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। মুখে, শ্বাসনালীতে, নাকের ভেতর এ জীবানুটা থাকে। শরীর দুর্বল হলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তখন জীবানু ফুসফুসে আক্রমণ করে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ার কারণে এটি বেশি হয়।  

যে কারণে শিশুদের বেশি হয়

শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। বিশেষ করে ছয় বছরের নিচে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। এজন্য এরা বেশি আক্রান্ত হয়। শিশু যত বেশি ছোট তার ফুসফুসও আকারে তত ছোট, কার্যক্ষমতাও কম, প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম। তাই শিশুদের নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কাও বেশি। এ ছাড়া শিশুরা নিজের যত্ন নিজে নিতে পারে না। যেমন: অনেক সময় রাতে প্রস্রাব-পায়খানা করে নিজেই খেয়েই ফেললো বা বমি করলো এবং সেটি তার ফুসফুসে গেল। তখন খুব সহজে একটি শিশু নিউমোনিয়া আক্রান্ত হতে পারে। ফুসফুস ছোট হওয়ার কারণে এবং গলার স্পেস কম থাকায় কোনো কিছু খেয়ে ফেললে এবং খেতে গিয়ে বা বমি করলে কোনো কিছু যদি শ্বাসনালীতে ঢুকে যায়, সাথে সাথে ফুসফুসে চলে যায়। এ সমস্ত কারণে শিশুরা অধিক হারে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়।

শিশুদের কাশি মানেই নিউমোনিয়া নয়

কাশি হলেই নিউমোনিয়া বলা যাবে না। শিশুদের অনেক কারণেই কাঁশি হতে পার। যেমন: এলার্জি, ঠাণ্ডা ও গরমে ঘেমে গেলে কাশি হতে পারে। এ কাশির সাথে জ্বর থাকবে না। কিন্তু নিউমোনিয়া হলে কাশির সাথে জ্বর থাকবে। নিউমোনিয়ার পূর্বে কাশি হয় না, প্রথম জ্বর হয় তারপর কাশি হয়। জ্বরের সঙ্গে যখন কাশি হয় এবং কফ আসে অথবা ছোট শিশুদের শ্বাস নেওয়ার সময় যদি হাড় বৃদ্ধি পায়, তাহলে বুঝতে হবে এটি নিউমোনিয়া। নিউমোনিয়া হলে শিশুরা ঘনঘন শ্বাস নেয় এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। খাওয়ার প্রতি অনীহা হয় এবং দুর্বল হতে থাকে। 

বোঝার উপায়

কেউ যদি ফুসফুসের গতি গণনা করতে পারে, তাহলে সহজে বুঝতে পারা যায়। যেমন: ছয় মাসের নিচে শিশুদের হৃদস্পন্দনের গতি ৬০ এর নিচে থাকে, ছয় মাস থেকে দুই বছরের শিশুদের গতি ৫০ এর নিচে থাকে এবং দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের গতি ৪০ এর নিচে থাকে। গতি যদি এর থেকে বেশি থাকে বা বুকের খাচাগুলো দেবে যেতে থাকে, তাহলে নিউমোনিয়া হওয়ার আশঙ্কা বেশি। আবার এ সমস্যাগুলো এ্যজমাতেও হতে পারে। তবে ছয় মাসের নিচে শিশুদের সাধারণত এ্যাজমা হয় না। দুই বছর থেকে শিশুদের এ্যাজমা হতে পারে। পাঁচ থেকে সাত বছরের শিশুদের এ্যাজমার ঝুঁকি বেশি। এ্যাজমাতে সাধারণত জ্বর থাকে না। কাশি এবং কফ বেশি থাকে, হাঁচি, সর্দি থাকে। যন্ত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন সাউন্ড দেখে নিউমোনিয়া বুঝতে পারা যায়, যেগুলোকে বলে ব্রঙ্কাল সাউন্ড। নিউমোনিয়া নির্ণয়ের সবচেয়ে উত্তম পরীক্ষা হলো: সিটি স্ক্যান, এটি দ্বারা সুনিশ্চিতভাবে বোঝা যায়। এরপর বুকের এক্সরে করার মাধ্যমে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। এক্সরে পরীক্ষায় যদি ফুসফুস সাদা দেখা যায়, তাহলে নিউমোনিয়া। রক্তের টেস্ট করলেও এ রোগ নির্ণয় করা যায়।

চিকিৎসা পদ্ধতি

জ্বর কমানোর ওষুধ, খাবারের নির্দেশিকা ও কাশির জন্য নেবুলাইজেশন—এসব হলো নিউমোনিয়ার উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা। নিউমোনিয়ার নির্দিষ্ট বা স্পেসিফিক চিকিৎসা হলো রোগের কারণভিত্তিক চিকিৎসা। ভাইরাস, ব্যাক্টেরিয়া, ফাঙ্গাস যে কারণে হোক তদানুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। বড় বা ছোটদের শ্বাসকষ্ট এবং কাশির সঙ্গে রক্ত গেলে, উচ্চমাত্রার জ্বর সঙ্গে কাশি ও শ্বাসকষ্ট, বুক ব্যথা হলে সরাসরি হাসপাতালে ভর্তি করাতে হয়। যত দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হবে, তত সহজে চিকিৎসা করা যাবে, এবং খরচ কম হবে। চিকিৎসকের নিকট নিতে বিলম্বিত হলে চিকিৎসা খরচ বেড়ে যাবে।

এএইচ

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
রাজধানীতে জামায়াতের মানববন্ধনে হুঁশিয়ারি

বাজেট বৈষম্য ও স্বাস্থ্যে অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না

রাজধানীতে জামায়াতের মানববন্ধনে হুঁশিয়ারি

বাজেট বৈষম্য ও স্বাস্থ্যে অব্যবস্থাপনা বরদাশত করা হবে না

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত