চমেকে ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ারে সেবা পাবেন যারা
মেডিভয়েস রিপোর্ট: অতি সংকটাপন্ন রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত নিশ্চিত করতে দেশে প্রথমবারের সরকারি পর্যায়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চালু হয়েছে ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ার। গত ৪ সেপ্টেম্বর বিশেষ এই ইউনিট চালুর ফলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসা রোগীদের তৎক্ষণাৎ চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ কমানো সম্ভব হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৩১ হাজার ৭০০ বর্গফুটের এই ইউনিটে রোগীদের জন্য আছে ৮০টি শয্যা। তাদের সেবায় সার্বক্ষণিক মেডিসিন, সার্জারি, কার্ডিওলজি, অর্থোপেডিক, পেডিয়াট্রিক, নিউরোমেডিসিন, নাক-কান-গলা এবং এনেসথেসিয়াসহ প্রয়োজনীয় সব বিভাগের একজন করে কনসালটেন্ট চিকিৎসক রয়েছেন। জরুরি রোগ নির্ণয়ের জন্য রয়েছে আলট্রাসনোগ্রাম, ইকোকার্ডিওগ্রাম, পোর্টএবল এক্স-রে, ইসিজি ও অত্যাধুনিক প্যাথলোজিক্যাল যন্ত্রপাতিসহ অন্যান্য সরঞ্জাম।
ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ারে আছে দুটি অপারেশন থিয়েটার। এছাড়া পর্যায়ক্রমে হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট (এইচডিইউ) ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
রোগীদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় ওষুধের জন্য ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকান স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে তারা শতকরা ১৫ ভাগ কম দামে ওষুধ পাচ্ছেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা কর্নার, তৃতীয় লিঙ্গের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ট্রান্সজেন্ডার কর্নার এবং সর্বাধুনিক এম্বুলেন্স সেবা।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এখানে একজন রোগী আসামাত্রই চিকিৎসকরা রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পন্ন করেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হলে সেটাও এখানেই সম্পন্ন হয়।
এর পর চিকিৎসকরা যেসব রোগীকে অপেক্ষাকৃত সুস্থ মনে করেন, ওষুধ-পত্র দিয়ে এখান থেকেই তাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যেসব রোগীর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন, শুধু সেসব রোগীকে আন্তঃবিভাগে ভর্তি করা হয়।
বর্তমানে জরুরি বিভাগে প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮০০ থেকে ৯০০ জন রোগী।
এই ইউনিটের মাধ্যমে প্রথমত রোগীরা বিশেষায়িত সেবা পাচ্ছেন, দ্বিতীয়ত রোগীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় আন্তঃবিভাগের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হয়েছে এবং সর্বোপরি দালালদের দৌরাত্ম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।
এখানকার চিকিৎসা সেবায় সন্তুষ্ট একজন রোগী জানান, ‘কিছু দিন আগে চেন্নাই গেলাম, পরিবেশটা ঠিক চেন্নাইয়ের মতো লাগে। সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। চিকিৎসকরাও আগের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিকতা নিয়ে রোগী দেখছেন। কোনো অবহেলা নাই। যথেষ্ট ভালো সেবা পাচ্ছি।’
চিকিৎসাধীন আরেকজন রোগী জানান, ‘এখন এখানকার পরিবেশ খুব সুন্দর এবং উন্নত হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খুব সুন্দরভাবে প্রদান করা হচ্ছে। ওয়ার্ডও খুব সুন্দর-পরিষ্কার। আমরা সেবাও ভালো পাচ্ছি।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. সাহেনা আক্তার মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আগে জরুরি বিভাগে রোগী আসলে, তাদের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। দেখা যেতো, তাদের মধ্যে কারও কারও অবস্থা অতটা গুরুতর না। চার-পাঁচ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখলেই সে বাসায় চলে যাওয়ার উপযোগী হয়ে যাবেন। এই ধরনের রোগীদের যদি চিহ্নিত করে ফেলা যায়, তাহলে হাসপাতালের আন্তঃবিভাগের চাপ কমবে। কারণ তিনি ভর্তিযোগ্য না, কিংবা তাঁর অবস্থা গুরুতরও না। এই উদ্দেশ্যেই ইমারজেন্সি কমপ্লেক্সটি করা হয়েছে। এখানে রোগীরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন, বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও আছেন। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যারা ভর্তিযোগ্য তারা আন্তঃবিভাগে যাবেন, আর যারা ভর্তিযোগ্য না তারা এখানে কয়েক ঘণ্টা চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরে যাবেন। এখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা থাকায় রোগীরা বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে যাবেন।’
সার্বিক দিক তুলে ধরে চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম হুমায়ুন কবীর মেডিভয়েসকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয় করে, গণপূর্ত বিভাগ আমাদেরকে এই ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ারের অবকাঠামো প্রস্তুত করে দিয়েছে। পরবর্তীতে সমস্ত মেডিকেল যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জামাদি চিটাগাং ক্লাবের সদস্যবৃন্দ আমাদেরকে অনুদান হিসেবে দিয়েছেন। সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে যে সকল চিকিৎসক, নার্স এবং বিভিন্ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী আমাদেরকে সহযোগিতা করেছেন, প্রত্যেকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওয়ান স্টপ ইমারজেন্সি কেয়ার চালুর বিষয়ে আমাদের তিনটি লক্ষ্য ছিল। প্রথমত রোগীরা যেন বিশেষায়িত সেবা পান; সকল বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এখানে যুক্ত থাকায় রোগীরা এ সেবা পাচ্ছে। দ্বিতীয়ত লক্ষ্য ছিল, রোগীদের ভর্তি না করে যদি এ ইউনিটে তাদেরকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে ইনভেস্টিগেশন এবং চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে ইনডোরে ভর্তির চাপ কমবে। এটা কমে এসেছে। আগে ইনডোরে তিন হাজার রোগী ভর্তি থাকতো। এখন এ সংখ্যা আড়াই হাজারে নেমে এসেছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ইউনিট চালুর মাধ্যমে দালালদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
এছাড়া কাল-পরশু ন্যায্য মূল্যের ওষুধের দোকানটি পুরোপুরি কার্যকর হলে রোগীরা এখান থেকে ১৫ ভাগ কম দামে ওষুধ কিনতে পারবে। এটা হবে এই কেয়ার চালুর বড় সাফল্য। কারণ রোগীরা দালালদের খপ্পরে পড়ে অনেক বেশি দামে ওষুধ কিনে আনতো।