ডা. মোহাম্মদ নেয়ামত হোসেন

ডা. মোহাম্মদ নেয়ামত হোসেন

সহকারী অধ্যাপক, নিওনেটোলজী 
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ, ফরিদপুর। 


৩১ অগাস্ট, ২০২১ ০১:১৭ পিএম

শিশুদের বাইরের দুধ খাওয়ানোর উপদেশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ

শিশুদের বাইরের দুধ খাওয়ানোর উপদেশ শাস্তিযোগ্য অপরাধ
ছবি: সংগৃহীত

নবজাতক বিশেষজ্ঞ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হয় স্তন্যদানকারী (ল্যাকটেটিং) মায়েদের কাউন্সিলিংয়ে। সবচেয়ে সমস্যা হয়, বাচ্চা জন্মের প্রথম ২ থেকে ৩ দিন বয়স পর্যন্ত। কারণ এই সময় শাল দুধ হয়, যার পরিমাণ ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ১ থেকে ২ চামচের সমপরিমাণ। ফলে মায়েদের ধারণা, বাচ্চা দুধ পাচ্ছে না।

অথচ এই সামান্য দুধেই আছে নবজাতকের সম্পূর্ণ পুষ্টি। শুধু তাই নয়, এই দুধে আছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। আর তাই শাল দুধকে নবজাতকের প্রথম ভ্যাকসিনও বলা হয়। এছাড়াও জন্মের প্রথম ৪৮ ঘণ্টা প্রস্রাব না হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বাচ্চা যদি জন্মের ১০-১২ ঘণ্টার মধ্যে প্রস্রাব না করে, মা-বাবা বা বাড়ির মুরুব্বি অস্থির হয়ে যান। 

আর প্রথম মা হলে তো, আরও বেশি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একদিকে শাল দুধ, যা পরিমাণে অত্যন্ত অল্প, তার সাথে যদি বাচ্চা কান্না করে, মা বা মুরুব্বিদের প্রথম অভিযোগ থাকে বাচ্চা বুকের দুধ পাচ্ছে না। ফলে ওই প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই বেশির ভাগ নবজাতক ইনফান্ট ফর্মুলা পেয়ে থাকে। অথচ খুব সহজেই এই সময়ে মাকে কাউন্সিলিং করলে, এই অন্যায় প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আবার ৩ সপ্তাহ বয়স হতে বাচ্চারা ইনফেন্টিয়াল কলিক (Infantile colic) নামক এক ধরনের পেট ব্যথায় কান্না করে, যার প্রধান কারণ বুকের দুধের সঙ্গে বাচ্চা বাতাস গিলে ফেলে। অনেক মায়েরাই, এই সমস্যাকে গ্যাসের সমস্যা মনে করে থাকেন। ফলে অনেক মা এসেই বলেন, বাচ্চার জন্ম থেকেই গ্যাসের সমস্যা আছে। আবার অনেকে মনে করেন, বাচ্চা দুধ পাচ্ছে না তাই কান্না করে। অথচ এই রোগের চিকিৎসাই হলো, পেট থেকে বাতাস বের করে দেওয়া। যার কারণে ব্যথা, সেই কারণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

ফলে এখানে কাউন্সিলিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে, মায়েরা বুকের দুধ কম হচ্ছে মনে করে বাইরের দুধ খাওয়ানো শুরু করে। তাই মাকে পেটে ব্যথার কারণ এবং কিভাবে পেট থেকে বাতাস বের করতে হয়, তা বুঝিয়ে বলতে হয়।

ইনফান্ট ফর্মুলাকে অন্যায় বলার কারণ 

অন্যায় বলার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ চিকিৎসা বিজ্ঞানে আছে, নবজাতক প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধ খাবে। এমনকি এক ফোঁটা পানি পর্যন্ত খাওয়ানো নিষেধ। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধুমাত্র বুকের দুধের বহু উপকারিতা আছে। যদি সংক্ষেপেও বলি তাহলেও লেখা অনেক বড় হয়ে যাবে। কিন্তু আমার এ লেখার উদ্দেশ্য বুকের দুধের উপকারিতা নিয়ে নয়। তাই সে আলোচনায় যেতে চাচ্ছি না।

বুকের দুধ কম হওয়ায় বা ইনফান্ট ফর্মুলা বাচ্চার স্বাস্থ্যের জন্য ভাল, এ ধরনের কোন কারণ দেখিয়ে, যদি বাচ্চাকে কেউ বাহিরের দুধ খাওয়ানোর উপদেশ দেন, তবে তাঁর জন্য সরকার কঠোর আইন করেছে। যা অনেক স্বাস্থ্যকর্মী বা অভিভাবক জানেন না।

ব্রেস্ট মিল্ক সাবস্টিটিউট অ্যাক্ট-২০১৩

এই আইনে বলা আছে, কোন স্বাস্থ্যকর্মী (চিকিৎসক, নার্স বা মায়ের সেবায় নিয়োজিত কোন ব্যক্তি) অথবা কোম্পানির লোকজন, বুকের দুধের পরিবর্তে অন্য কোন দুধ খাওয়ার জন্য উপদেশ দেন বা উৎসাহিত করেন, তবে তিনি ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হবেন। এমন কি শুধুমাত্র লিফলেট বিলি করলেই অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

এই আইনে অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন জামিন পাবেন না। শুধু তাই নয়, অন্য যেকোন আইনই থাকুক না কেন, তাতে এই অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে কোন প্রভাব ফেলবে না।

এ অপরাধের দণ্ড

১. প্রথমবার অপরাধ করলে, তিন বছরের জেল বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

২. পরবর্তীতে একই অপরাধ করলে শাস্তি দিগুণ হবে। বারে বারে করতে থাকলে, প্রতিবারই আগের বারের দিগুণ শাস্তি ভোগ করতে হবে।

৩. যদি এই অপরাধে বাচ্চা অসুস্থ অথবা মৃত্যু হয়, তাহলে ১০ বছরের জেল বা ৫০ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। এই অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত বাচ্চার পরিবার পাবে।

উপরের আলোচনায় বোঝা গেল কাউকে ইনফান্ট ফর্মুলা খাওয়ার উপদেশ দেওয়া বা খাওয়াতে উৎসাহিত করা ফৌজদারি অপরাধ।

এই দুধ কেন বাজারে পাওয়া যায়?

এই ইনফান্ট ফর্মুলা লেখার কিছু অকাট্য কারণ আছে:

১. বাচ্চার জন্মের সঙ্গে সঙ্গে মা মারা গেলে বা নবজাতক পালিত বাচ্চা হলে।

২. মা যদি ক্যান্সারের ওষুধ পায়।

৩. কিছু কিছু জন্মগত ত্রুটি, যেমন: গ্যালাকটোসেমিয়া, যেখানে বুকের দুধ খেলে বাচ্চা অন্ধ হয়ে যায়।

৪. মা যদি অ্যান্টিথাইরয়েড ওষুধ পায়।

৫. মা যদি অ্যান্টিসাইকোটিক ড্রাগ পায়।

আরও কিছু কারণ আছে। কিন্তু মা হেপাটাইটিস বি ভাইরাস, করোনা পজিটিভ, এইডস রোগে আক্রান্ত বা যক্ষ্মা রোগী হলেও বুকের দুধ খাওয়াতে নিষেধ নেই। এই দেশের প্রেক্ষাপটে অবশ্যই এসব রোগে বুকের দুধ খাওয়াবেন। সেক্ষেত্রে অবশ্যই শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিবেন। উপরোক্ত অকাট্য করাণ আছে বলেই এখনও বাজারে ইনফান্ট ফর্মুলার দুধ বাজারে পাওয়া যায়। না হলে, হয়তো এ দেশে এইসব দুধ নিষিদ্ধ হতো।

পরিমিত বুকের দুধের জন্য যা আবশ্যক

১. মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় অবশ্যই নির্জনস্থানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২. জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। কারণ এই সময় সবচেয়ে ভাল দুধ চোষার ক্ষমতা থাকে। তারপর এই ক্ষমতা কমতে থাকে।

৩. স্বাভাবিক অবস্থায় মা যতটুকু খাবার খান, তার দেড়গুণ বেশি খাবার খাবেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে যদি মা এক প্লেট বা থালা ভাত খেতেন, তবে বুকের দুধ পরিমাণ মতো হওয়ার জন্য দেড় প্লেট ভাত খাবেন। আগে দুই টুকরো মাছ বা মাংস খেলে এখন তিন টুকরো খাবেন।

৪. মা প্রতিদিন গরুর দুধ খাবেন। কারণ বাচ্চা বুকের দুধ খাওয়ায় মায়ের প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম এবং ফসফেটের ঘাটতি পূরণ করতে হবে।

৫. প্রতিদিন প্রচুর পানি খাবেন। কারণ বুকের দুধে প্রচুর পরিমাণে মায়ের শরীরের পানি খরচ হয়।

৬. পজিশন এবং অ্যাটাচমেন্ট হচ্ছে নতুন মায়ের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় উপদেশ। এমন কি, অনেক সময় একমাত্র কারণ। বাচ্চা এমনভাবে ধরবেন, যেন বুকের কালো অংশ অবশ্যই মুখের ভিতর থাকে। এই বিষয়ে সব মায়েদের উচিৎ একজন নবজাতক বা শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া।

৭. রাতে অবশ্যই বুকের দুধ খাওয়াবেন, কারণ বুকের দুধ রাতে বেশি হয় (প্রো-ল্যাকটিন হরমোন, যার কারণে বুকে দুধ হয়, তা রাতে বেশি secretion বা নিঃসরণ হয়)।

৮.  প্রতিবার বুকের দুধ খাওয়ানোর পর বাচ্চার ঢেকুর তুলাবেন। না হলে, বাচ্চা পেটের ব্যথায় কান্না করবে, আর হখন মা ধারণা করবেন বাচ্চা বুকের দুধ পাচ্ছে না।

৯. অনেক ক্ষেত্রে স্তনের বিভিন্ন রোগ যেমন: স্তন ফুলে ব্যথা, বোটা বা নিপল ফেটে যাওয়া, ফোঁড়া ইত্যাদি সমস্যায় চিকিৎসকের পরামর্শ নিবেন।

মায়েদের কিছু প্রশ্নের উত্তর

১. প্রথম ২ থেকে ৩ দিন বুকের দুধ কম পাওয়ায়, মায়েরা বাইরের দুধ দাবি করেন। এ ক্ষেত্রে কোন দুধটি ভাল হবে?
 
উত্তরে বলি, যদি প্রথম ২-৩ দিন শাল দুধ না হয়ে স্বাভাবিক দুধ আসে, তাহলেই তো সমস্যা। কেন স্বাভাবিক দুধ আসলো? কারণ এই প্রথম ২-৩ দিন শাল দুধই আসতে হবে। ফলে এই কদিন দুধ বেশি হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই। কারণ এই সময় শাল দুধই প্রয়োজন। আর বেশি দুধ হওয়া অস্বাভাবিক। 

২. বাচ্চা দুধ কম পাওয়ায় শুধু কান্নাকাটি করে?
 
উত্তরে বলি, বাচ্চা কান্নাকাটি আর বুকের দুধ পান করা শিখেই পৃথিবীতে এসেছে। ফলে বাচ্চা শুধু ক্ষুধার জন্য কান্না করে না। প্রস্রাব বা পায়খানা করলে, গরম বা ঠাণ্ডা লাগলে বা এমন কি মায়ের কোলে যাওয়ার জন্যও কান্না করে। তার হাসি শিখতে সময় লাগবে।

৩. বুকের দুধ বা ফিডার দিলে তো কান্না থেমে যায়?

উত্তরে বলি, মুখ তো একটা, সেখানে একটি আঙুল দিলেও কান্না থেমে যাবে। যদি দুটো মুখ থাকতো, তাহলে এক মুখে কান্না করতো, আরেক মুখে হয়তো ফিডার খেতো। আর বাচ্চাতো এই চুষা শিখেই পৃথিবীতে এসেছে। ফলে মুখে কিছু দিলেই চুষতে থাকবে।

৪. বাচ্চা খাওয়ালেও শুধু কান্না করতেই থাকে।

উত্তরে ইনফেন্টিয়াল কলিক সম্পর্কে বলি, অধিকাংশ মায়েরা, স্বীকার করে নেন- কাঁধে তুলে রাখার কিছুক্ষণ পর কান্নাকাটি কমে যায়। আরও বলি, পৃথিবীতে এমন কোন রোগ বা ওষুধ নেই, যার কারণে বুকের দুধ কমে যায়। একজন মা একসাথে তিনজন বাচ্চার প্রয়োজনীয় বুকের দুধ দিতে পারে, যা পরীক্ষিত। 

এছাড়াও মাদের বলি, আচ্ছা মা, আপনি যদি বাইরের দুধ কিনতে যান, কার টাকা খরচ হয়? নিশ্চয়ই আমার টাকায় কিনেন না। তাহলে আমি কেন না করি? কারণ আপনার বাচ্চার ক্ষতি হউক, আমি চাই না। আর এই বিষয় দেখাই আমার দায়িত্ব। যদি কেউ বাইরের দুধ লিখে দেয়, তাহলে তিনি তাঁর সঠিক দায়িত্ব পালন করেননি। আর একটা কারণ হতে পারে, তবে তা বললাম না।

বাচ্চা ঠিকমতো বুকের দুধ পাচ্ছে কিনা না, যেভাবে বুঝবেন?

প্রায় সবাই কান্নাকাটি করা বা না করার কথা বলেন। তাদের বলি, বাচ্চা যদি ২৪ ঘণ্টায় ছয়বার বা তার বেশি প্রস্রাব করে এবং সঠিকভাবে ওজন বাড়ে, তাহলেই বুঝতে হবে বাচ্চা পরিমাণ মতো দুধ পাচ্ছে। এই কথায় প্রায় সব মা বলেন, প্রস্রাব তো দিনে ১৫ থেকে ২০ বার করে। তখন বলি, মা বাতাস খেয়ে কি এতো বার প্রস্রাব সম্ভব? নিজের ক্ষেত্রে দেখবেন, যেদিন কম পানি খাবেন, সেদিনই প্রস্রাব কমে যাবে।

সবশেষে বলতে চাই বাচ্চার কান্না করা মানেই, বুকের দুধ কম পাওয়া নয়। 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
কক্সবাজারে আশ্রয়শিবিরে এক সপ্তাহে ৯৫ ভূমিধস, গৃহহীন চার সহস্রাধিক: ইউএনএইচসিআর

কক্সবাজার আশ্রয়শিবিরে এক সপ্তাহে ৯৫ ভূমিধস, গৃহহীন চার সহস্রাধিক: ইউএনএইচসিআর

কক্সবাজারে আশ্রয়শিবিরে এক সপ্তাহে ৯৫ ভূমিধস, গৃহহীন চার সহস্রাধিক: ইউএনএইচসিআর

কক্সবাজার আশ্রয়শিবিরে এক সপ্তাহে ৯৫ ভূমিধস, গৃহহীন চার সহস্রাধিক: ইউএনএইচসিআর

অনুপস্থিতি ও বেসরকারি হাসপাতালে মালিকানা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে আট চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত