ডা. কাওসার আলম

ডা. কাওসার আলম

মেডিকেল অফিসার ও রেসিডেন্ট, কার্ডিওলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়


১৯ এপ্রিল, ২০২১ ০৪:৩২ পিএম

চিকিৎসকদের হেনস্তা নয়, স্যালুট দেওয়া উচিত

চিকিৎসকদের হেনস্তা নয়, স্যালুট দেওয়া উচিত
ছবি: সংগৃহীত

গতবছর ঠিক এইসময় করোনার প্রকোপ বেড়ে চলছিল। সারা পৃথিবীতে নেমেছে বিপর্যয়। ইতালিতে তখন প্রতিদিনে ৪০০/৫০০ মানুষ মারা যাচ্ছে। মানুষ মারা যাচ্ছে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু মৃত্যুর অন্তঃর্নিহিত কারণ কি কেউ জানেন না। চারদিকে আতঙ্ক আর মৃত্যু ভয়। লকডাউন দেওয়া হয়েছে দেশজুড়ে। 

বিজ্ঞানীরা জানেন না, গবেষকরা জানেন না, ভাইরোলজিস্টরা জানেন না করোনাভাইরাস সম্পর্কে। নতুন এই ভাইরাস ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে চিকিৎসকদেরও সম্যক ধারণা ছিল না। 

সবাই জানেন মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখতে হবে, ঘনঘন সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করতে হবে। এসব নিয়েও নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন, করোনা গ্রীষ্মের দাবদাহে মারা যাবে, কেউ বলেন করোনা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে চলে যাবে। কেউ বলেন চিকিৎসকদের পিপিই লাগবে না, কেউ বলেন পিপিই ছাড়া চলবেই না। 

এসব অনিশ্চয়তার মধ্যেই তখন সবাই ঘুরপাক খাচ্ছে। খোদ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা একবার বলে শুধু করোনা রোগীরা মাস্ক পরিধান করলেই হবে, সাধারণ মানুষের মাস্ক পরার কোনো প্রয়োজনীয়তা নাই। সকালে বলে এক কথা, বিকালে বলে আরেক কথা। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) সিডিসি একবার বলে শুধু ড্রপলেটের মাধ্যমে করোনা ছড়ায়, আবার একদিন পর বলে করোনা বাতাসে ছড়ায়। 

এভাবেই অনিশ্চয়তা ও অজানার মধ্যেই চলতে থাকে সবার অভিযাত্রা। করোনা ভাইরাস তো রোগী, ডাক্তার, ধনী, গরিব আলাদা করতে পারে না। তাই রোগী থেকে চিকিৎসক যেমন আক্রান্ত হতে পারে ঠিক তেমনি চিকিৎসক থেকেও রোগীদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। 

বন্ধ হলো সকল প্রাইভেট চেম্বার 

তাই ইমারজেন্সি চিকিৎসা সেবা ছাড়া সকল প্রাইভেট চেম্বার ওই সময় বন্ধ করা হলো। তখন প্রশাসন কি করল? সকল প্রাইভেট হাসপাতাল ঘুরে ঘুরে কোন চিকিৎসক প্রাইভেট চেম্বার করছে না, কার চেম্বারে তালা ঝুলছে তা খুজে খুঁজে তার তালিকা করলো। যেসব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চেম্বার করছে না তাদের রীতিমতো হেনস্তা করা শুরু করলো। সাহসী, মানবিক চিকিৎসকরা তখন অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে ঢাল-তলোয়ার ছাড়াই যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন, ফলশ্রুতিতে কয়েক মাসের মধ্য প্রায় একশত জন দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে গেলেন। জাতি হারিয়েছে তার অমূল্য চিকিৎসকদের; আমরা হারিয়েছি আমাদের শিক্ষক, আমাদের গুরুজনদের আর স্বজনরা হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনদের। 

একটি অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আগে অবশ্যই তার গতিবিধি সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকতে হয়। শুধু পেশিশক্তি দিয়ে বা সৈনিকের সংখ্যা দিয়ে যুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। যুদ্ধে জয়লাভের প্রধান অস্ত্র কৌশল। সেই কৌশলের রপ্ত করার জন্য চিকিৎসকরা কিছুদিন অপেক্ষা করছিলেন। তখন চিকিৎসকরা সরকারি হাসপাতালে এবং প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের চিকিৎসা সেবা দিচ্ছিলেন। অপ্রোয়জনে হাসপাতালে আসা বন্ধ করাই ছিল প্রধান উদ্দেশ্য। একজন চিকিৎসক বেঁচে থাকলে শত শত রোগীর জীবনের সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন। এটাই যুদ্ধকালীন সময়ে অমোঘ সত্য ও চরম কঠিন বাস্তবতা।

দ্বিতীয় লকডাউনে উল্টো চিত্র

এবার চিকিৎসকরা প্রস্তুত। প্রাইভেট চেম্বার করতে যাচ্ছেন, নিজেদের ডিউটিতে যাচ্ছেন। কিন্তু এবারের লকডাউনটা ব্যতিক্রম। চিকিৎসকরা প্রাইভেট চেম্বারে যাচ্ছেন, সেখানে তাঁদের গাড়ি আটকে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি চিকিৎসকরা তাদের কর্মস্থলে যাবেন, সেখানে মুভমেন্ট পাসের নামে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে। সরকারি হাসপাতালে ডাক্তাররা জনগণের স্বাস্থ্য সেবা দিতে যান, সরকারি কাজ করতে যান সেখানে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে। তাহলে কি এইবারের করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসকদের সেবা ছাড়াই সুস্থ হয়ে যাবেন? 

প্রথম লকডাউনে চিকিৎসকদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে প্রাইভেট চেম্বার করিয়েছেন, সংক্রমণের চেইন দীর্ঘ করেছেন আর এইবার লকডাউনে চিকিৎসকদের সরকারি হাসপাতালে ডিউটি করতে দিতে চাচ্ছেন না। কারণটা এখনো বোধগম্য না। 

একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপকও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার এ্যাপ্রোনে দেশের সর্বোচ্চ মেডিক্যাল বিদ্যাপীঠের লোগো অঙ্কিত আছে, তাঁর গাড়িতে প্রতিষ্ঠানের লোগো আছে। নিজে পরিচয় দিয়েছেন যে, তিনি  বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, তাঁকে আপনারা আইডি কার্ডের দোহাই দিয়ে আটকে রেখেছেন। 

একজন চিকিৎসক এই করোনা মহামারীতে তার নিজের জীবন, পরিবারের সবার জীবনবাজি রেখে করোনা আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা দিতে যান। তাঁর চলাচলে রাষ্ট্র কখনো বাধা দিতে পারে না, রাষ্ট্র তার চলাচল নির্বিঘ্ন করার নিশ্চয়তা দিবে। যুদ্ধাবস্থায় একজন চিকিৎসকের গতিরোধ করার নিয়ম নেই, আর আপনারা পরিচয় পাওয়ার পরেও আদিখ্যেতা আর পেশাগত দম্ভ দেখানোর জন্য তার গতিরোধ করেছেন। 

একজন মুমূর্ষু রোগী যখন অক্সিজেনের অভাবে কাতরাতে থাকেন, তখন চিকিৎসক নিজের জীবনের মায়া ভুলে গিয়ে রোগীর মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দেন। যখন মরণাপন্ন রোগীকে ফেলে রোগীর স্বজনরা পালিয়ে যায়, তখনো একজন চিকিৎসক সেই রোগীর পাশে থাকেন। মহামারীর এই পরিস্থিতি ও জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে চিকিৎসকরা সবচেয়ে সম্মুখ সারীর যোদ্ধা। চিকিৎসক ছাড়া বাকি সব ক্যাডার কোভিড পরিস্থিতিতে প্রণোদনা পেয়েছেন, ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, সুযোগ সুবিধা পেয়েছেন। চিকিৎসক কি পেয়েছেন? কিছুই পাননি। 

একজন চিকিৎসক সেবা করেন দায়িত্ববোধ থেকে, মানবিকতা থেকে, দেশপ্রেম থেকে। কোন কিছু পাওয়ার আশায় তিনি সেবার ব্রত নিয়ে এই পেশায় আসেন না। এই পরিস্থিতিতে পুলিশের উচিত ডাক্তারদের গাড়ি দেখে তাদের স্যালুট দেওয়া। তাদের চলার পথ মসৃণ করা। তাদের নিরাপদে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার নিশ্চয়তা প্রদান করা। এই স্যালুট দেওয়া মানে পুলিশের ছোট হয়ে যাওয়া নয়, এই স্যালুট দেওয়া মানে চিকিৎসক বড় হয়ে যাওয়া নয়। এই স্যালুট দেওয়া মানে আপনি চিকিৎসকদের কাজে উৎসাহ প্রদান করছেন, পরোক্ষভাবে জনগণের সেবা করছেন।

আমরা সবাই বাঙালি, আমরা সবাই এদেশের নাগরিক, আর সবচেয়ে বড় পরিচয় আমরা সবাই মানুষ। একজন চিকিৎসক যেমন চিকিৎসা সেবার মাধ্যমে জনগণের সেবা করেন, ঠিক তেমনি পুলিশ জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে জনগণের সেবা দিয়ে থাকেন।

এই ক্রান্তিকালে একজন কোভিড যোদ্ধাকে ডিমোরালাইজড করা মানে এই যুদ্ধে অনেক পিছিয়ে যাওয়া। আমরা সবাই মিলে এই যুদ্ধে জয়ী হবো। চিকিৎসক, সাংবাদিক, পুলিশ, প্রশাসন সবাই মিলে আমাদের এই যুদ্ধে জয় লাভ করতে হবে। আবার আলো আসবে। অমানিশার কালো অন্ধকার যতই গভীর হোক, আবার পৃথিবী হাসবেই।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত