০৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৫:২২ পিএম
একুশে পদকজয়ী শিশু হাসপাতালের অণুজীববিজ্ঞানী সমীর কুমার

দেশে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম

দেশে স্বাস্থ্য খাতে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম
অনুজীববিজ্ঞানী সমীর কুমার। ছবি: সংগৃহীত

মো. মনির উদ্দিন: একুশে পদকপ্রাপ্ত শিশু হাসপাতালের অনুজীববিজ্ঞানী সমীর কুমার সাহা বলেছেন, দেশে স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা হচ্ছে। আইসিটি ও কৃষিতে অনুসরণীয় গবেষণা হয়েছে। সে দিক থেকে স্বাস্থ্য খাতে তুলনামূলকভাবে গবেষণার পরিমাণ কম। 

উপকরণ প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক সময় গবেষণা আলোর মুখ দেখে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, গবেষণা সামগ্রী কেনার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণায় তরুণ প্রজন্মের আগ্রহের কথা তুলে ধরে স্বাস্থ্য খাতের কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সাধনে তাদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশনের এ নির্বাহী পরিচালক।

করোনার জিনোম সিকোয়েন্স উদ্ভাবনের স্বীকৃতি স্বরূপ এ বছর গবেষণায় একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন সমীর কুমার সাহা। এর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, ইউনেস্কোর পুরস্কার, আমেরিকান সোসাইটি অব মাইক্রোবায়োলজির পুরস্কার কিংবা বিলগেটসের স্বীকৃতি—এগুলো নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন, এগুলো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু নিজের দেশের কিছু পাওয়ার বিষয়টি হলো অর্জনের সঙ্গে পরম আনন্দের। সকল মানুষই এ পদকের গুরুত্ব ও মর্যাদার বিষয়ে অবগত।

তাঁর মেয়ে শিশু স্বাস্থ্য গবেষণা ফাউন্ডেশনের অনুজীব বিজ্ঞানী সেঁজুতি সাহার সঙ্গে সমন্বয় করে এ গবেষণা কর্ম পরিচালনা করেন সমীর কুমার সাহা। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মেয়ে দেশের বাইরে আছে। তবে ডিজিটালাইশনের কল্যাণে আমাদের ল্যাবের কার্যক্রম খুবই চমৎকারভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বুঝতে হলে আমাদের টিমটা বুঝতে হবে। ল্যাবের একটি ড্রপও যদি জায়গা পরিবর্তন করে তাহলে এখান থেকে সেটা ঠিক করে দেওয়ার সুযোগ আছে। আমাদের ল্যাবের গবেষণা কার্যক্রম খুবই দ্রুত ও সর্বাধিক যৌক্তিক উপায়ে সম্পন্ন হয়।’

নিজেদের চলমান গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মূলত শিশুদের রোগ নিয়ে আমাদের কাজ। মহামারির এই সময়ে করোনা নিয়ে কাজ চলমান আছে। একই সঙ্গে শিশুদের বিভিন্ন ইনফেকশন-জীবানুগুলো খুঁজে বের করার কাজও অব্যাহত আছে। এ কাজ করতে গিয়ে আমরা দেখেছি, কিছু জীবানু আছে—সেগুলো আসলে কি তা আমরা জানিই না। তাহলে এগুলো খুঁজবো কি করে? অজানা এসব জীবানু বের করতে আমরা গভীর মনোযোগ সহকারে কাজ করছি। এটাও এক ধরনের সিকোয়েন্সিং, কিন্তু সাধারণ সিকোয়েন্সিং হলো নির্দিষ্ট একটি ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়া নিয়ে অনুসন্ধান চালানো।’ 

তিনি আরও বলেন, চলমান গবেষণাটি শিশুদের জন্য। নতুন গবেষণার মাধ্যমে যে কোনো ধরনের জীবানু বের করে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিশ্লেষণ করে জানতে পারবো—এটি কোন ধরনের ব্যাকটেরিয়া এবং এর দ্বারা কি কি ইনফেকশন হবে। 

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশে চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা কোন পর্যায়ে রয়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গবেষণা শুধু স্বাস্থ্য খাত নিয়েই হচ্ছে বিষয়টি তা না। অনেক বিষয় নিয়েই গবেষণা হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় আমরা যখন সবাই বিপদে ছিলাম, তখন বুঝতে পেরেছি, ডিজিটালাইজেশন নিশ্চিত না হলে ঘরে বসে বসে কান্না করা ছাড়া উপায় ছিল না। এর কল্যাণে যে কোনো পরিস্থিতিতে আত্মীয়-স্বজনকে অনায়াসে ডাকা যায়, সহযোগিতা করা যায়। এসব গবেষণার ফসল। বিশেষ করে কৃষিবিদদের গবেষণা আমাদের অনুসরণ করা উচিত।’

গবেষণায় তরুণ প্রজন্ম ব্যাপক আগ্রহী

দেশে স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণার অপ্রতুলতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে আমাদের গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম। এটা বাড়াতে পারলে দেশের আরও উন্নতি সাধিত হবে। গবেষণায় তরুণ প্রজন্মের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এ গবেষণা সামনে এগিয়ে বলে আমি আশাবাদী।’

করোনার বিস্তার রোধে টিকা ছাড়া আর কোন কোন জায়গায় গবেষণার সুযোগ রয়েছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, টিকার বাইরে বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো কাজ হচ্ছে না। আর বিদেশে যা হচ্ছে তাও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক না। এখন ভ্যাকসিনটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি এসেছে, আমরা সেটা নেবো। তবে মাস্ক ও সেনিটাইজেশনসহ স্বাস্থ্য বিধিগুলো মেনে চলতে হবে। নেদারল্যান্ডসহ বিশ্বের অনেক দেশে টিকা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লকডাউন চলছে। কারণ টিকা দেওয়ার সময় লকডাউন অব্যাহত থাকলে সংক্রমণ ছড়াবে কম। ভ্যাকসিনের সঙ্গে অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হলে বাংলাদেশ দ্রুত করোনামুক্ত হবে। সংক্রমণ যেভাবে কমছে এটা আমাদের সৌভাগ্যের বিষয়।

গবেষণা সামগ্রী কেনায় স্বচ্ছতায় গুরুত্বারোপ 

অধ্যাপক সমীর কুমার সাহা বলেন, একটি গবেষণা শুরুর আগে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, রিঅ্যাজেন ও ক্যামিকেল কেনার প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ হতে হবে। ব্যাপার হলো, গবেষণার প্রয়োজনীয় উপকরণ সময় মতো না পেলে আমার গবেষণাটি কাজে আসবে না। একটি গবেষণা আলোর মুখ দেখার জন্য এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর যেসব জিনিস গবেষকদের প্রয়োজন সেটাই যেন আনা হয় এবং সেটা যেন গবেষণার কাজে লাগে। 

উপকরণ পেতে দীর্ঘসূত্রতায় গবেষণা নিষ্ফল হয়

সময় মতো প্রয়োজনীয় উপকরণ না পাওয়ায় একটি গবেষণার নিষ্ফল হওয়ার ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এক সময় আমরা একটি ব্যাকটেরিয়াকে বুঝতে চেষ্টা করছিলাম যে কিভাবে আমরা সেটা নির্ণয় করবো। এ লক্ষ্যে প্রয়োনীয় সব কিছু ঠিক করা হলো। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলো, এটা বৃহত্তরে পরিসরে পরীক্ষা করে দেখতে হবে। নতুন করে টেস্ট করে দেখলাম, অবস্থা খুবই ভালো। এর পর এটি প্রকাশের জন্য যে দিন আমরা সাবমিট করবো, সেদিন দেখলাম—একই রকম একটি গবেষণা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশ হয়ে গেছে।’ 

তিনি বলেন, ‘আমাদের একজন গবেষক প্রায় চার মাস ধরে এ নিয়ে লেগেছিল। ক্যামিকেলটা পাওয়ার জন্য তাকে দুই মাস বসে থাকতে হয়। আনুসাঙ্গিক সকল উপকরণের নিশ্চয়তার কারণে তারা হয়তো (যুক্তরাষ্ট্র) ১৫ দিন আগে সাবমিট করেছিল। ফলে আমাদের আগে তারা প্রকাশ করতে পেরেছিল। এ রকম অনেক ঘটনা ঘটে, যা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যের। 

গবেষণার অর্থ ঠিক মতো ব্যয় হয় না 

গবেষণার পরিধি বাড়ানো ও দ্রুত গবেষণাগুলো আলোর মুখ দেখতে রাষ্ট্র কী কী পদক্ষেপ নিতে পারে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের যথেষ্ট আন্তরিকতা ও চেষ্টা আছে। কেউ যদি বলেন, দরিদ্র দেশ হওয়ায় আমরা গবেষণায় অনেক পিছিয়ে আছি—আমি বলবো, কথাটি একদম ভুল। গবেষণায় বাহিরের অনেক কিছুই দরকার পড়ে এটা সত্য। তবে আমাদের যতটুকু আছে ততটুকু গবেষণায় সফল হওয়ার জন্য ততটুকু যথেষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সমস্যা হলো, আমরা অর্থটা ঠিক মতো ব্যয় করতে পারি না। বরাদ্দকৃত অনেক টাকা যথাযথ প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। তবে এগুলোতে উন্নতি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের কল্যাণে এ ক্ষেত্রে জবাবদিহি জোরদার হচ্ছে। এখন যতটা না খাতায় থাকে, ততটা কম্পিউটারে থাকে। এখন বেতন-ভাতা কাউকে দৌড়িয়ে গিয়ে আনতে হয় না। কারও কাছে রিকোয়েস্ট করতে হয় না।’ 

এর ফলে আগামী দিনগুলো গবেষণাসহ যে কোনো খাতে অহেতুক ব্যয় বন্ধ হবে। এগুলো হবে এবং এগুলো হতেই হবে। নতুবা আমাদের গবেষণাগুলো গতিশীল হবে না। 

তরুণ গবেষকদের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান 

তিনি আরও বলেন, গবেষকদের গবেষণার সুযোগ করে দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ যদি গবেষণার জন্য কোনো অর্থ নেন, তাহলে এটার অডিট হতে হবে যে গবেষণা করার পর তিনি কোথায় এটা পাবলিশ করেছেন। একই সঙ্গে এই পাবলিকেশনটা অন্য কেউ ব্যবহার করছে কিনা। এটি নিশ্চিত করা না গেলে আমাদের গবেষণার ফলটা পাবো না। এই ফল আমাদের পেতেই হবে। নতুন প্রজন্ম এ নিয়ে ব্যাপক কাজ করছে। তাদেরকে কাজের সুযোগ দিতে হবে।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
মেডিভয়েসকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক করোনা বেড ফাঁকা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি