০২ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ০৫:৫৪ পিএম

‘চিকিৎসকদের অবসর বলতে কিছু নেই’

‘চিকিৎসকদের অবসর বলতে কিছু নেই’
প্রতিকী ছবি

মুন্নাফ রশিদ: অনেক বছর কাজ করার পর কবে অবসরে যাবেন তার জন্য মুখিয়ে থাকেন অনেকে। একটু চাপমুক্ত জীবন, অফুরন্ত অবসরের স্বপ্ন দেখেন চাকরিজীবীরা। যদিও পেশাজীবন মানুষের অন্যতম আত্মবিশ্বাসের জায়গা। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে কাটিয়ে কর্মজীবন থেকে অবসর নিলে হঠাৎ করেই যেন এক সীমাহীন শূন্যতা এসে ভর করে।

এক প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে কাজ করা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরাও যেন দূরে সরে যান। সন্তান-সন্ততিসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের মাত্রাটাও পালটে যায় হঠাৎ করেই। প্রতিদিনের চেনা রুটিনটা হয়ে যায় অচেনা। অভ্যাসের সহচর মানুষ হঠাৎ করেই দীর্ঘদিনের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে হোঁচট খান।

কাজ থেকে বাদ গেলে বা কোনো কাজে নিজেকে নিয়োজিত না রাখলে আমরা বলি অবসরের জীবন। সম্প্রতি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) থেকে অবসরে গিয়েছেন ওই কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও অধ্যাপকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ২২ জন শিক্ষক।

তাঁদের মধ্যে একজন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও নিওনেটোনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ার হোসেন। কর্মজীবনের স্মৃতিচারণমূলক নানা দিক নিয়ে মেডিভয়েসের প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় সদ্যবিদায়ী এই অধ্যক্ষের।

তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, অবসর জীবন সবার জন্যই কঠিন। তবে চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে এটার একটু ভিন্নতা রয়েছে। যেমন এখনও আমার রোগী দেখে সময় কাটে, কলেজে গিয়েও সময় কাটাই। শিক্ষার্থীদেরকে এখনও পড়াচ্ছি। তবে করোনার মাঝে সেটা একটু কমে ‍গিয়েছে। অধ্যক্ষ থাকার কারণে এখনও আমি বিভিন্ন বিষয়ের সাথে জড়িত। ফলে শিক্ষকসহ অন্যান্যরাও আমাকে কলেজে গিয়ে সময় দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। ফলে অবসর জীবনের যে শূন্যতা সেটি এখনও আমাকে ছুঁতে পারেনি।

তিনি আরও বলেন, অবসর জীবনে অনেক কিছু করার সুযোগ থাকলেও চিকিৎসা সেবার বাইরে তেমন কিছুই পরিকল্পনা নেই। তবে আমি যেখানে বেড়ে উঠেছি সেই এলাকার কিছু উন্নয়নমূলক করছি। সেই কাজগুলোকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর বাইরে আর কোনও প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার পরিকল্পনা নেই।

অধ্যাপক ডা. মো. আনোয়ার হোসেন ১৯৮৪ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করেন। ওই বছর থেকে ইনসার্ভিস ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। তিনি ইউনিয়ন সাবসেন্টার, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কাজ করাসহ কনসালটেন্ট থেকে শুরু করে ক্রমান্বয়ে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক এবং অধ্যাপক পদে দীর্ঘদিন কর্মরত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি মমেকের অধ্যক্ষ পদে থাকা অবস্থায় ২০১৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বরে অবসর গ্রহণ করেন।

তাঁর হাত ধরেই ২০১৩ সালে ইউনিসেফের সহযোগিতায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে সম্পূর্ণ নতুন একটি বিভাগ নবজাতক ডিপার্টমেন্ট চালু হয়েছে।

সদ্যবিদায়ী আরও একজন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের রেডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাক হোসেন। তিনি গতবছরের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখে অবসরে গিয়েছেন।

তিনি মেডিভয়েসকে বলেন, চিকিৎসা সেবা এমন একটি পেশা যেখানে বিদায় বলতে কিছু নেই। আর এই খাতে যারা শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন তাদের তো একদমই নাই। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রস্তাব আসছে। তবে এখনও সেগুলো নিয়ে আলাদা করে ভাবা হয়নি। করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হয়তো নতুন পরিকল্পনা করা হবে।

১৯৮৫ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করার পর সেখানেই ইনসার্ভিস ট্রেইনিংয়ের মাধ্যমেই অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাক হোসেনের কর্মজীবন শুরু। পরে রাজবাড়ি জেলার একটি ইউনিয়নের সাবসেন্টারে প্রথম পদায়ন হয় তাঁর। এরপর ক্রমান্বয়ে ১৮ বার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পদায়ন শেষে ২০২০ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির পর একই বছরের নভেম্বর মাসের ৩০ তারিখ অবসরে যান অধ্যাপক ডা. মো. মোস্তাক হোসেন।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সদ্য বিদায়ী ২২ জন চিকিৎসকের একজন আরও একজন কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এ বারী। তিনি গতবছরের আগস্ট মাসের ৩১ তারিখে অবসরে গিয়েছেন।

১৯৮৪ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের সহকারী সার্জন (ইনসার্ভিস ট্রেইনিং) পদে যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন অধ্যাপক ডা. এম এ বারী। এরপর ক্রমান্বয়ে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে ২০১৭ সালে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি এবং কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যুক্ত হন তিনি।

১৯৭৮-৭৯ শিক্ষা বর্ষে তিনি এক সাথে তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উত্তীর্ণ হন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পঞ্চাশের মধ্যে এবং মেডিকেলে ২৭তম হন অধ্যাপক ডা. এম এ বারী। পরিবারের সিদ্ধান্তে বুয়েটে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে বুয়েটে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি তিনি।

অধ্যাপক ডা. এম এ বারী মেডিভয়েসকে বলেন, আমি দির্ঘদিন ধরে চিকিৎসক তৈরির জন্য শিক্ষাদান করেছি। শিক্ষার্থীদের সাথে সব সময় থেকেছি। অবসর জীবনে কিছুটা হলেও তাদের শূন্যতা কাজ করবে। যদিও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার ৫৫ বছরের মাথায় ক্যাথল্যাব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করেছিলাম। এটির জন্য আমি অনেক কষ্ট করেছি। যদিও সেটা সফল করতে পারিনি। তবে আগামী মার্চে সেটি পূর্ণতা পাবে বলে জানতে পেরেছি। এটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমার অবসর জীবনের অবসাদ কিছুটা হলেও লোপ পাবে। দীর্ঘদিন কষ্টের সুফল পবে প্রতিষ্ঠানটি।

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
মেডিভয়েসকে বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরিচালক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শতাধিক করোনা বেড ফাঁকা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি