১১ অক্টোবর, ২০২০ ০৫:১৬ পিএম

অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলামের বর্ণাঢ্য জীবন

অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলামের বর্ণাঢ্য জীবন
ফাইল ছবি

অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম বাংলাদেশের একজন প্রথিতযশা অধ্যাপক, শল্যচিকিৎসক ও ভাষাসৈনিক। উপমহাদেশের অন্যতম বয়োজ্যেষ্ঠ এই সার্জন আমৃত্যু চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন। দেশজুড়ে তিনি শিক্ষক, সংগঠক, গবেষক ও সমাজসেবক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন। চিকিৎসা খাতের পাশাপশি অংশগ্রহণ করেছেন দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্দোলনে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের স্বীকৃতিসরূপ ২০১৮ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মননা পুরস্কার একুশে পদক লাভ করেন।

জন্ম ও শিক্ষা জীবন

মির্জা মাজহারুল ইসলাম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার আগ-চারান গ্রামে মির্জা হেলাল উদ্দিন ও চান্দ খাতুনের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। দাদা-দাদি, মা-বাবা আদর করে তার নাম রাখেন সোনা মিয়া। তাঁর দাদা মির্জা মাহতাব উদ্দিন বেগ ব্রিটিশ সরকারের নমিনেটেড ডেপুটি পুলিশ সুপারিন্টেডেন্ট এবং তাঁর পিতা মির্জা হেলাল উদ্দিন 'ডেভিড এন্ড কোম্পানী' ও 'ল্যান্ডেল এন্ড ক্লার্ক' নামক দুটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কর্মকতা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। মাজহারুল ইসলামের মামা মির্জা নুরুল হুদা তৎকালীন পূর্ব বাংলার অর্থমন্ত্রী ছিলেন।

অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম ১৯৪৪ সালে কল্লা করোনেশন ইংলিশ হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, ১৯৪৬ সালে রিপন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের ছাত্র হিসেবে এমবিবিএস পাশ করেন। পরে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে এফআরসিএস যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফআইসিএস এবং বিসিপিএস হতে সার্জারী বিভাগে এফসিপিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম শুধু ছাত্র হিসেবেই মেধাবী ছিলেন না, খেলাধুলা, গানবাজনা, অভিনয় ও লেখালেখিতেও তিনি সমান পারদর্শী ছিলেন।

কর্মজীবন

অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম এমবিবিএস পাশ করে অবৈতনিক শল্যচিকিৎসক সার্জন হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন। পরে ১৯৫৪ সালে অনারারি হাউজ সার্জন হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন। 

পরবর্তীতে ১৯৫৮ সলের সহকারী সার্জন হিসেবে বরিশাল সদর হাসপাতাল, ১৯৬০ সালে ফরিদপুর সদর হাসপাতালে এবং ১৯৬৬ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন। এরপর ১৯৭৬ সালে সার্জারির অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হিসেবে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে যোগদান করেন গুনী এই চিকিৎসক। ১৯৮০ সালে সার্জারির অধ্যাপক হিসেব ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং ১৯৮৫ সালে ঢামেকের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এরপর তিনি জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের উপদেষ্টা হিসেবে কলেজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। কর্মজীবনে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে আহরণ করে ১৯৯৩ সাল থেকে বারডেম সার্জারি বিভাগে মুখ্য উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুইবার বারডেমের অবৈতনিক মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনারসের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন ২০ বছর। প্রায় ছয় দশক ধরে শৈল্য চিকিৎসক হিসেবে সফলতার সাথে কাজ করছেন প্রথিতযশা এই চিকিৎসক।

একজন শল্য চিকিৎসক হিসেবে অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম সাফল্যের সোনালী সোপানে অধিষ্ঠিত। তিনি বাংলাদেশে ২০,০০০ জন পেপটিক আলসারে আক্রান্ত রোগীর অস্ত্রোপচার করেছেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত লক্ষাধিক রোগীর সফল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশে তাঁর ভূমিকা অবিস্মরনীয়।

সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড

চিকিৎসাঙ্গনের পাশাপশি সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও ছিলো অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলামের সরব উপস্থিতি। স্কুলে অধ্যয়ন কালে তিনি ভারত ছাড় আন্দোলনে অংশগ্রহন করেন। কলেজে অধ্যয়ন কালে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। কলকাতাতেই তিনি বঙ্গবন্ধুসহ বিশিষ্ট নেতাদের সান্নিধ্য লাভ করেন। জনগনের কল্যাণ কামনা আর দেশপ্রেমই তার রাজনীতির দর্শণ। তিনি আজীবন দলীয় রাজনীতির উর্ধ্বে থেকে কল্যাণধর্মী ও আদশির্ক রাজনীতি চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয় - এই নীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন।

একজন সমাজসেবক হিসেবেও তিনি স্বনামধন্য ছিলেন। মানব সেবার প্রতি অদম্য আগ্রহ তার আজন্ম সাধনা। তাঁর নিজস্ব অর্থায়নে ও উদ্যোগে চারান গ্রামে স্বাক্ষরতা অভিযান এবং নিরক্ষরতা দূরীকরন কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় চারান গ্রামে স্বাস্থ্যসেবা স্যানিটেশন ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা করা হয়েছে। চারান গ্রামে সম্পূর্ন নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠা করেছেন চারান উচ্চ বিদ্যালয়। নিজ এলাকা তথা, সমগ্র দেশের শিক্ষা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে তার ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

মহান মুক্তিযুদ্ধ-ভাষা আন্দোলনে অবদান

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পরপরই বাংলা ভাষার ওপর আঘাত আসে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র হিসেবে ভাষা আন্দোলনের একেবারে সূচনা থেকেই তিনি এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন। ভাষা আন্দোলনের প্রায় প্রতিটি ঘটনায় মেডিকেল কলেজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ১৯৪৭ সলের ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, উক্ত কমিটিতে তিনি প্রতিনিধি হিসেবে অন্তভূক্ত হন। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে এ পরিষদ সম্প্রসারিত হয়। নিজেকে ভাষা আন্দোলনের 'আঁতুড় ঘরের' সাক্ষী বলে দাবি করেন এ ভাষাসৈনিক। ১৯৫২ এর একুশে ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলার পর তিনি হাসপাতালে কর্মরত অবস্থায় অসংখ্য আহত ভাষাকর্মীর অপারেশন করেন। অংশগ্রহণ করেন ২১ ফেব্রুয়ারির আমতলার জনসভায়। 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং আহতদের পাশে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিলো উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে কর্মরত ছিলেন। একজন কর্তব্যপরায়ন চিকিৎসক হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিয়েছেন আপন মমতায়। এছাড়াও তিনি ময়মনসিংহ শহরে মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

পুরস্কার ও সম্মাননা

ভাষা আন্দোলনে অবদানের জন্য ২০১৮ সালে একুশে পদক লাভ করেন অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম।

মৃত্যু

অধ্যাপক ডা. মির্জা মাজহারুল ইসলাম ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন

স্বাস্থ্য প্রশাসনে অন্য ক্যাডার

কর্মসূচিতে যাওয়ার হুমকি পেশাজীবী চিকিৎসক নেতাদের

জামাই-শ্বশুর মিলে ভুয়া চিকিৎসা

তৃতীয় শ্রেণি পাস করেই ‘বিশেষজ্ঞ’ চিকিৎসক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি