অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন

অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আকরাম হোসেন

চেয়ারম্যান, ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বিএমইউ


২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৪:২৪ পিএম
স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন-২০২৬

রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসকের সুরক্ষা-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হোক, কাটুক ভয়ের পরিবেশ

রোগীর নিরাপত্তা ও চিকিৎসকের সুরক্ষা-দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হোক, কাটুক ভয়ের পরিবেশ
ছবি: এআই সম্পাদিত

বাংলাদেশে এমন একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ স্বাস্থ্য আইন প্রয়োজন—যা রোগীর অধিকার ও নিরাপদ চিকিৎসা নিশ্চিত করবে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্য-পেশাজীবীদের জবাবদিহি বাড়াবে এবং একই সঙ্গে চিকিৎসকদের অযৌক্তিক ফৌজদারি হয়রানি ও অনিশ্চয়তা থেকে সুরক্ষা দেবে। প্রস্তাবিত ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ সেই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে।

চিকিৎসায় অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রতিটি ফলাফল শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। রোগীর মৃত্যু, চিকিৎসাজনিত জটিলতা কিংবা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া—নিজে থেকেই চিকিৎসাগত অবহেলার প্রমাণ হতে পারে না। রোগীর বয়স, রোগের তীব্রতা, জরুরি পরিস্থিতি এবং জনবল, রক্ত, ওষুধ, শয্যা, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামোর প্রাপ্যতা চিকিৎসার ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

গুরুতর অবহেলার সুস্পষ্ট সংজ্ঞা

চিকিৎসাসেবায় ‘গুরুতর চিকিৎসাগত অবহেলা’ সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হওয়া প্রয়োজন। ফৌজদারি দায় তখনই বিবেচিত হওয়া উচিত, যখন স্বীকৃত পেশাগত মানদণ্ড থেকে সুস্পষ্ট, গুরুতর ও বেপরোয়া বিচ্যুতি ঘটেছে এবং তার সঙ্গে রোগীর গুরুতর ক্ষতি বা মৃত্যুর প্রত্যক্ষ কার্যকারণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের ভুল, স্বীকৃত জটিলতা কিংবা চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা সম্পদ ও সংকটকে গুরুতর ফৌজদারি অবহেলা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

স্বাধীন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা

গুরুতর চিকিৎসাগত অভিযোগে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা অপরিহার্য। সার্জারি, নিবিড় পরিচর্যা বা জটিল চিকিৎসার সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট শাখার অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ ছাড়া ন্যায়সংগতভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন। তাই গুরুতর ক্ষেত্রে ফৌজদারি প্রক্রিয়া শুরুর আগে বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) অথবা অন্য কোনো স্বাধীন ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত বিশেষজ্ঞ সংস্থার লিখিত প্রাথমিক মতামত থাকা উচিত।

গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে ভারসাম্য

গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রেও ভারসাম্য প্রয়োজন। শুধু রোগীর মৃত্যু, জটিলতা বা চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের অভিযোগের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনার আগেই চিকিৎসককে গ্রেপ্তার করা সাধারণ নিয়ম হওয়া উচিত নয়। তবে ইচ্ছাকৃত ক্ষতি, প্রতারণা, নথি জালিয়াতি, প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা অথবা চিকিৎসার বাইরে কোনো স্বতন্ত্র অপরাধের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অবশ্যই কার্যকর থাকবে।

ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দায় পৃথকীকরণ

প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকের দায়ও পৃথক করতে হবে। নিবিড় পরিচর্যার শয্যা, রক্ত, ওষুধ, জনবল বা যন্ত্রপাতির ঘাটতি যদি চিকিৎসকের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিকিৎসকের ওপর চাপানো ন্যায়সংগত নয়। জবাবদিহি নির্ধারিত হওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং বাস্তব নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে। 

নথিগত ভুল

চিকিৎসা নথির ক্ষেত্রেও অনিচ্ছাকৃত ভুল, বিলম্বিত নথিভুক্তি বা স্বচ্ছভাবে করা বৈধ সংশোধনকে ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। একইভাবে সৎ বিশ্বাসে দেওয়া চিকিৎসাগত মতামত পরে ভুল প্রমাণিত হলেই তা ‘মিথ্যা প্রতিবেদন’ হয়ে যায় না; ইচ্ছাকৃত প্রতারণা বা জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার প্রমাণ থাকতে হবে।

রোগীর তথ্য সুরক্ষা ও সম্মতি

রোগীর গোপনীয়তা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। তবে বহুবিষয়ক চিকিৎসা সভা, বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, রেফারেল, টেলিমেডিসিন, মান নিরীক্ষা, চিকিৎসা শিক্ষা এবং অনুমোদিত গবেষণায় প্রয়োজনীয় সীমায় তথ্য ব্যবহারের সুস্পষ্ট আইনগত সুযোগ থাকা দরকার। একইভাবে অবহিত সম্মতিকে (ইনফর্মড কনসেন্ট) শুধু একটি স্বাক্ষরিত ফরম হিসেবে নয়, বরং চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে যথাযথ তথ্য প্রদান, বোঝাপড়া এবং যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

পেশাগত সুরক্ষা সংস্থা গঠন

বাংলাদেশে ধাপে ধাপে পেশাগত দায়-সুরক্ষা বা সমমানের চিকিৎসা-আইনগত সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত রোগী ন্যায়সংগত প্রতিকার পান এবং একই সঙ্গে সৎ ও দায়িত্বশীল চিকিৎসক অযৌক্তিক আইনি ও আর্থিক ঝুঁকিতে না পড়েন। এ উদ্দেশ্যে একটি স্বাধীন, পেশাগত ও জবাবদিহিমূলক বাংলাদেশ মেডিকেল প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিএ) গঠন করা যেতে পারে। যা বিএমডিসির নিয়ন্ত্রক ভূমিকার সম্পূরক হিসেবে চিকিৎসকদের গোপনীয় চিকিৎসা-আইনগত পরামর্শ, আইনি সহায়তা ও আত্মপক্ষ সমর্থন, শৃঙ্খলাজনিত ও হাসপাতাল-সংক্রান্ত বিরোধে সহায়তা, পেশাগত দায়-সুরক্ষা, রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসাজনিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং চিকিৎসা-আইনগত শিক্ষা প্রদান করবে।

আর যেখানে ইচ্ছাকৃত অপরাধ বা প্রকৃত গুরুতর অবহেলা নেই, সেখানে মধ্যস্থতা, বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি ও উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের মতো ন্যায়সংগত বিকল্প ব্যবস্থা উৎসাহিত করবে। এর মূল দর্শন হবে—রোগীকে সুরক্ষা, চিকিৎসককে সহায়তা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নয়ন।

বিএমডিসি ও বিএমপিএ’র ভূমিকা

যদিও এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান (বিএমপিএ) বর্তমান বিএমডিসির বিকল্প হবে না। বিএমডিসি চিকিৎসক নিবন্ধন, পেশাগত মান এবং শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে; অন্যদিকে প্রস্তাবিত বিএমপিএ চিকিৎসকদের চিকিৎসা-আইনগত সহায়তা ও পেশাগত সুরক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে। ভবিষ্যতে একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ মেডিকেল প্রটেকশন অ্যাসোসিয়েশন অ্যাক্ট’ প্রণয়নের মাধ্যমে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তিও তৈরি করা যেতে পারে।

সমঝোতা ও দ্রুত নিষ্পত্তি

চিকিৎসা-বিরোধের প্রতিটি ঘটনাকে ফৌজদারি মামলায় রূপ দেওয়া সমাধান নয়। যেখানে ইচ্ছাকৃত অপরাধ বা প্রকৃত গুরুতর অবহেলা নেই, সেখানে মধ্যস্থতা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা, দ্রুত নিষ্পত্তি এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ অনেক ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃত গুরুতর অবহেলা, প্রতারণা, নথি জালিয়াতি বা গুরুতর পেশাগত অসদাচরণের বিরুদ্ধে কঠোর ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।

গণমাধ্যমে আগাম বিচার নয়

গণমাধ্যমেরও দায়িত্বশীল নীতি জরুরি। কোনো অভিযোগ সংবাদ হতে পারে, কিন্তু নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বা স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মূল্যায়নের আগে কোনো চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠানকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। একইভাবে গোপনীয় চিকিৎসা নথি বা অসম্পূর্ণ তদন্ত প্রতিবেদন অননুমোদিতভাবে প্রকাশ করা উচিত নয়। এর লক্ষ্য সংবাদ বন্ধ করা নয়; বরং গণমাধ্যমে আগাম বিচার, যাচাইহীন দোষারোপ এবং বিচারপূর্ব জনদণ্ড প্রতিরোধ করা।

খসড়ায় যা থাকা জরুরি

আইনটি চূড়ান্ত করার আগে তাই কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন—গুরুতর চিকিৎসাগত অবহেলার স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বাধীন বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা, বিশেষজ্ঞ মতামতের আগে শুধু চিকিৎসাগত অভিযোগের ভিত্তিতে সরাসরি গ্রেপ্তার না করা, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের দায় পৃথক করা, সৎ বিশ্বাসে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের সুরক্ষা, নথিগত ভুল ও জালিয়াতির পার্থক্য, নির্দিষ্ট তদন্তকাল, কার্যকর আপিল ও বিচারিক পুনর্বিবেচনা, জ্ঞাতসারে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিকার, পেশাগত দায়-সুরক্ষা এবং প্রমাণের আগে গণমাধ্যমে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করার নীতি।

উদ্দেশ্য দায়মুক্তি নয়, ন্যায়বিচার

এই আইনের উদ্দেশ্য চিকিৎসকদের দায়মুক্তি দেওয়া নয়। ইচ্ছাকৃত ক্ষতি, প্রতারণা, নথি জালিয়াতি, গুরুতর পেশাগত অসদাচরণ এবং প্রকৃত গুরুতর চিকিৎসাগত অবহেলার বিরুদ্ধে কঠোর ও ন্যায়সংগত ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্বীকৃত চিকিৎসাজনিত জটিলতা, সৎ বিশ্বাসে নেওয়া যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত, সীমিত সম্পদ এবং অনিবার্য প্রতিকূল ফলাফলকে অপরাধে পরিণত করা উচিত নয়।

রোগীর অধিকার ও চিকিৎসকের সুরক্ষা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং একটি নিরাপদ, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য দুটিই অপরিহার্য। তাই মূল দর্শন হওয়া উচিত—রোগীর নিরাপত্তা ও পেশাগত জবাবদিহি নিশ্চিত হোক, কিন্তু চিকিৎসায় ভয়ের পরিবেশ তৈরি না হোক। দায় নির্ধারিত হোক প্রমাণ, বিএমডিসি বা স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত দায়িত্ব, ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে।

জেএইচ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
সুস্থতায় সচেতন হওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

প্রতি ১০০ পুরুষের ৮-১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত