১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৩:৩৭ পিএম
সুস্থতায় সচেতন হওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

প্রতি ১০০ পুরুষের ৮-১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত

প্রতি ১০০ পুরুষের ৮-১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত
প্রোস্টেট ক্যান্সার সচেতনতা মাস উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজে র‌্যালি পরবর্তী আলোচনা। ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: প্রতি ১০০ জন পুরুষের মধ্যে আট থেকে ১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেক সময় এর নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এ অবস্থায় রোগ শনাক্ত হতে দেরি হলে তা শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সূচনাতে শনাক্ত করা গেলে যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর পক্ষে দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করা সম্ভব। তাই ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সের পর পুরুষদের প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রোস্টেট ক্যান্সার সচেতনতা মাস উদযাপন উপলক্ষে আজ শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শহীদ মিলন চত্বরে র‌্যালি পরবর্তী আলোচনায় এসব কথা বলেন বক্তারা। বাংলাদেশ এসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জন্স (বিএইউএস) ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগ যৌথভাবে এর আয়োজন করে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, প্রোস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের মধ্যে দেখা দেওয়া অন্যতম প্রধান ক্যান্সার। এর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, অন্যান্য অনেক ক্যান্সারের ক্ষেত্রে প্রাথমিক কিছু লক্ষণ দেখা গেলেও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট প্রাথমিক লক্ষণ না-ও থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করি, ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষরা প্রায়ই প্রস্রাব সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে আসেন। এ সময় তাদের নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি রয়েছে কি-না, তা বিবেচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রোস্টেট ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণ স্পষ্ট না থাকা একটি উদ্বেগের বিষয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে আশার কথা হলো, রোগটি যদি সময়মতো শনাক্ত করা যায়, তাহলে এর কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। দ্রুত রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে একজন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তি দীর্ঘদিন স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। এ কারণে প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ৪৫ থেকে ৫০ বছর বয়সের পর পুরুষদের প্রোস্টেটের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আরও বলেন, প্রোস্টেট ক্যানসার শনাক্তকরণের জন্য রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসোনোগ্রাম এবং শারীরিক পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। রক্তের সিরাম পিএসএ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রোস্টেট ক্যান্সারের সম্ভাবনা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। তবে এটি নিশ্চিত রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা নয়। এ ছাড়া ডিজিটাল রেকটাল এক্সামিনেশনের (ডিআরইউ) মাধ্যমে প্রোস্টেট গ্রন্থির আকার ও গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজনে প্রোস্টেটের বিশেষায়িত আল্ট্রাসোনোগ্রাম, এমআরআই বা সিটি স্ক্যান করা যেতে পারে। এসব পরীক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ও যথাযথভাবে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব।

প্রোস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসায় সমন্বিত চিকিৎসাব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে তিনি বলেন, রেডিওলজি, প্যাথলজি, রেডিয়েশন থেরাপি ও অনকোলজিসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে রোগীর জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত ব্যক্তির দীর্ঘদিন বেঁচে থাকা সম্ভব।

‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পারিবারিক বা জেনেটিক ঝুঁকি থাকতে পারে। পরিবারের বাবা বা নিকটাত্মীয়দের কারও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ইতিহাস থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। তাই তাদের আরও সতর্ক থাকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত রোগ শনাক্তকরণের আওতায় আসা জরুরি’—বলেন তিনি।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. মাজহারুল শাহীন বলেন, প্রতিরোধ প্রতিকারের চেয়ে উত্তম। আর কোনো রোগ হয়ে গেলে বা রোগের আশঙ্কা থাকলে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় করা দ্রুত সুস্থ হওয়ার অন্যতম পূর্বশর্ত।

তিনি বলেন, রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে, তা দূরে ছড়িয়ে পড়া বা জটিলতা তৈরি করার আগেই চিকিৎসা করা সম্ভব। ফলে কম ওষুধ, সীমিত চিকিৎসা বা ছোট পরিসরের অস্ত্রোপচারের মাধ্যমেই অনেক ক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় করা যায়।

তিনি আও বলেন, ‘আজকের এই সচেতনতা মাসের মূল উদ্দেশ্য হলো—জনসাধারণ যেন প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে আসেন এবং চিকিৎসকেরাও যেন রোগটি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করতে পারেন। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের মানুষ কম কষ্ট ও ভোগান্তির মধ্য দিয়ে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হতে পারবেন।’

প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অনেক সময় দেরিতে রোগ নির্ণয়ের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের সহকর্মী ও সিনিয়র চিকিৎসকদের মধ্যেও এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে রোগটি শনাক্ত হয়েছে অনেক দেরিতে—এমনকি ক্যান্সার ভার্টিব্রাল কলাম, পাঁজর বা খুলির হাড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর। সুতরাং, আজকের এই সচেতনতা মাস ও সচেতনতা র‍্যালির মাধ্যমে আমাদের বার্তা খুবই স্পষ্ট, প্রাথমিক উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন এবং প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ শনাক্ত করুন। সময়মতো চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন উপভোগ করুন।’

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জন্সের (বিএইউএস) আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, আজকের আলোচনার বিষয় প্রোস্টেট ক্যান্সার। একজন ইউরো-অনকোলজিস্ট হিসেবে প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা, তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলো-আপের সঙ্গে যুক্ত থাকা আমার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রোস্টেট ক্যান্সার এমন একটি রোগ, যা সময়মতো শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই সফলভাবে চিকিৎসা করা সম্ভব।

প্রোস্টেট ক্যান্সার সচেতনতা মাস উপলক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ, আপনারা এই সচেতনতামূলক বার্তাটি ব্যাপকভাবে প্রচার করুন। এর মাধ্যমে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর মানুষ প্রোস্টেট ক্যান্সার সম্পর্কে সচেতন হবেন এবং প্রয়োজনীয় কিছু সহজ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারবেন। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার শনাক্ত করা গেলে সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীর সুস্থতার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জন্সের সায়েন্টিফিক পার্টের সদস্য ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. নাছির উদ্দিন কাজল বলেন, প্রোস্টেট ক্যান্সার পুরুষদের মধ্যে একটি সাধারণ ক্যান্সার। বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০ জন পুরুষের মধ্যে ৮ থেকে ১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। রোগটি প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে অত্যন্ত কার্যকর ও নিরাময়মূলক চিকিৎসা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও, প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। এ কারণেই আমরা প্রোস্টেট ক্যান্সার স্ক্রিনিং পদ্ধতি চালু করেছি। বিশ্বব্যাপী প্রচলিত এই পদ্ধতির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশেও এটি শুরু করা হয়েছে। স্ক্রিনিংয়ের ক্ষেত্রে মূলত রক্তের পিএসএ পরীক্ষা ও শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। এই দুই পরীক্ষার পর প্রোস্টেট ক্যান্সারের সন্দেহ হলে রোগীকে এমআরআই করানো হয় এবং প্রয়োজনে প্রোস্টেটের বায়োপসি করা হয়।

বায়োপসির মাধ্যমে রোগটি নির্ণয় হলে প্রাথমিক পর্যায়েই নিরাময়মূলক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব উল্লেখ করে তিনি বলেন, যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করলে রোগী দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারমুক্ত জীবনযাপন করতে পারেন।

‘সুতরাং আমাদের বার্তা হলো ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষদের প্রোস্টেট ক্যান্সারের স্ক্রিনিং করা উচিত। আর যাদের পারিবারিক ইতিহাস রয়েছে, যেমন—যাদের বাবা, ভাই, দাদা বা নানা প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন বা মারা গেছেন, তাদের ক্ষেত্রে ৪০ থেকে ৪৫ বছর বয়স থেকেই স্ক্রিনিং কার্যক্রমের আওতায় আসা উচিত’—বলেন তিনি।

অনুষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম ফরহাদ হোসেন, বিশিষ্ট ইউরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম, বিভিন্ন মেডিকেলের ইউরোলিস্ট ও ঢামেকের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানসহ বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইউরোলজিক্যাল সার্জন্সের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

এমইউ/

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
সুস্থতায় সচেতন হওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

প্রতি ১০০ পুরুষের ৮-১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত

সুস্থতায় সচেতন হওয়ার আহ্বান বিশেষজ্ঞদের

প্রতি ১০০ পুরুষের ৮-১০ জন প্রোস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত