০১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:১২ পিএম

২৪ ঘণ্টা উন্মুক্ত জাবির স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মিলছে ৮৫ ধরনের ওষুধ

২৪ ঘণ্টা উন্মুক্ত জাবির স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মিলছে ৮৫ ধরনের ওষুধ
ছবি: মেডিভয়েস

মেডিভয়েস রিপোর্ট: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র। দিনরাত চিকিৎসকদের পরামর্শের পাশাপাশি মিলছে বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ওষুধ। জরুরি চিকিৎসা, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও অ্যাম্বুলেন্স সেবার সুযোগও রয়েছে এখানে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৬ থেকে ৭ শত শিক্ষার্থী চিকিৎসা নিতে আসেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। এর মধ্যে অন্তত ৪০০ জন নিয়মিত বিনামূল্যে ওষুধ সংগ্রহ করেন।

জাবি শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজলভ্য করতে গত সময়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ওষুধের মজুত, ল্যাব সুবিধা, জরুরি সেবা ও অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বর্তমানে ১৬ জন চিকিৎসক তিন শিফটে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে রয়েছে পাঁচ শয্যার অবজারভেশন রুম এবং ৮২ ধরনের পরীক্ষার সুবিধা। চারটি অ্যাম্বুলেন্সের পাশাপাশি আরও একটি নতুন অ্যাম্বুলেন্স যুক্ত করার প্রক্রিয়াও চলছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক হুসনী মোবারক বলেন, একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন। তাই তাদের জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি। তার লক্ষ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বর্তমানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৬ জন চিকিৎসক রয়েছেন। এর মধ্যে ৯ জন স্থায়ী এবং ৭ জন অস্থায়ী ভিত্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন।

২৪ ঘণ্টাই বিনামূল্যে ওষুধ

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্যতম বড় সুবিধা হলো ২৪ ঘণ্টা বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ। সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, আগে প্রয়োজনীয় সব ওষুধ সবসময় পাওয়া যেত না। বর্তমানে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ওষুধ ২৪ ঘণ্টাই পাওয়া যাচ্ছে। অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিহিস্টামিন, স্টেরয়েড, প্যারাসিটামলসহ প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০০ থেকে ৭০০ জন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসেন। এর মধ্যে অন্তত ৪০০ জন বিনামূল্যে ওষুধ সেবা নেন।

মেডিকেল কর্মকর্তা জানান, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ওষুধের বাজেট বাড়ানো হয়েছে। আগে ওষুধ কেনার জন্য বরাদ্দ ছিল ২২ লাখ টাকা। বর্তমানে তা বাড়িয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সার্বিক ব্যবস্থাপনার বাজেট ৪৫ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

তিন শিফটে চিকিৎসা কার্যক্রম

স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে ১৬ জন চিকিৎসক কর্মরত। তারা তিন শিফটে ভাগ হয়ে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতেও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। তবে চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়লেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকেরা এমবিবিএস ডিগ্রিধারী হলেও নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে প্রস্তাব পাস করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) পাঠানো হয়েছে বলে জানান হুসনী মোবারক। একইসঙ্গে গ্রেড উন্নীত করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পাঁচ শয্যার অবজারভেশন রুম

জাবির স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ কোনো ওয়ার্ড নেই। তবে জরুরি রোগীদের পর্যবেক্ষণের জন্য রয়েছে পাঁচ শয্যার একটি অবজারভেশন রুম।

সংশ্লিষ্ট মেডিকেল কর্মকর্তা জানান, কোনো রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হলে তাকে সেখানে রেখে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্যালাইনসহ জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। জরুরি বিভাগের পাশেই রয়েছে অবজারভেশন রুম।

জরুরি বিভাগে প্রাথমিক চিকিৎসার পাশাপাশি ড্রেসিং, স্যালাইন, নেবুলাইজার ও অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও করা হয়। ফোঁড়া, কেটে যাওয়া কিংবা দুর্ঘটনায় ছোটখাটো আঘাতের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী মিনি অপারেশন করা হয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মকর্তারা।

স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই ৮২ ধরনের পরীক্ষা

রোগ নির্ণয়ের সুবিধা বাড়াতেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ল্যাবরেটরিতে ৮২ ধরনের পরীক্ষা করা হয় বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এসব পরীক্ষা করা হয়। সিবিসি, ডেঙ্গু, লিপিড প্রোফাইল, লিভার ফাংশন টেস্ট, কিডনি ফাংশন টেস্ট, থাইরয়েড ফাংশন টেস্ট এবং ভিটামিন ডি পরীক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা এখানে করা যায়। থাইরয়েড ফাংশন টেস্টের মধ্যে টি৩, টি৪, টিএসএইচ, এফটি৩ ও এফটি৪ পরীক্ষাও রয়েছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, অত্যন্ত বিরল কিছু পরীক্ষা ছাড়া রোগীর চিকিৎসার প্রথম বা দ্বিতীয় ধাপে প্রয়োজন হয়, এমন অধিকাংশ পরীক্ষাই এখানে করার সুযোগ রয়েছে। আগে ল্যাবের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সব পরীক্ষা করা সম্ভব হতো না। ল্যাব সংস্কারের পর পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো হয়েছে।

চার অ্যাম্বুলেন্সে ট্র্যাকিং, আসছে আরও একটি

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে চারটি অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে। আরও একটি নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রক্রিয়া চলছে। আগে অ্যাম্বুলেন্স কোথায় রয়েছে, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির অভিযোগ ছিল। সেই সমস্যা কমাতে অ্যাম্বুলেন্সে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর ফলে কোনো শিক্ষার্থী অ্যাম্বুলেন্স চাইলে সেটি কোথায় রয়েছে, তা জানা সম্ভব হচ্ছে। চালক কোনো নির্দিষ্ট স্থানে থাকার কথা বললে অ্যাম্বুলেন্সের প্রকৃত অবস্থানও যাচাই করা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বেড়েছে। নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রক্রিয়া ইউজিসির সংশ্লিষ্ট অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। অনুমোদন মিললে এটি দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বহরে যুক্ত হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

নার্সের ঘাটতিই বড় সংকট

চিকিৎসক থাকলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নার্সের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। বর্তমানে ছয়জন নার্স দায়িত্ব পালন করছেন। তবে তারা ডিপ্লোমা নার্স নন, অ্যাসিস্ট্যান্ট নার্স হিসেবে কর্মরত।

হুসনী মোবারক বলেন, চিকিৎসক ও নার্সের অনুপাত বিবেচনায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আরও নার্স প্রয়োজন। বর্তমানে ছয়জন নার্স দিয়ে সেবা চালানো সম্ভব হলেও ভবিষ্যতে সেবার পরিধি বাড়াতে এই ঘাটতি পূরণ করা জরুরি।

ডিপ্লোমা নার্স নিয়োগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট থেকে ইউজিসিতে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে নতুন নার্স নিয়োগের মাধ্যমে সংকট কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দুই টেকনিশিয়ান দিয়ে চলছে ল্যাব

ল্যাবরেটরিতে বর্তমানে দুইজন টেকনিশিয়ান দায়িত্ব পালন করছেন। তবে ৮২ ধরনের পরীক্ষা পরিচালনার জন্য এই জনবল যথেষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য সম্পাদক। তিনি জানান, আরও টেকনিশিয়ান নিয়োগের জন্য ইউজিসিতে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত জনবল পাওয়া গেলে ল্যাব সেবার সক্ষমতা আরও বাড়বে। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগের প্রস্তাবগুলো বর্তমানে ইউজিসির অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগে তদন্ত, হয়েছে বহিষ্কার

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সেবার পাশাপাশি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও সামনে এসেছে। এসব অনিয়মের কারণে শিক্ষার্থীরা পূর্ণাঙ্গ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে দাবি করেন জাকসুর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক সম্পাদক।

তার ভাষ্য, অনিয়ম শনাক্ত হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতায় তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কয়েকজন বহিষ্কৃত হয়েছেন এবং কারও কারও চাকরিও চলে গেছে বলে জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে শুধু বাজেট ও জনবল বাড়ানো যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালের সম্ভাবনা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নয়। নেই কোনো ওয়ার্ড, সীমিত জনবল নিয়েই চলছে চিকিৎসাসেবা। তারপরও ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা, বিনামূল্যে ওষুধ, পাঁচ শয্যার অবজারভেশন রুম, ৮২ ধরনের পরীক্ষা এবং চারটি অ্যাম্বুলেন্সের মতো সুবিধা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ডিপ্লোমা নার্স ও অতিরিক্ত টেকনিশিয়ান নিয়োগ করা গেলে সেবার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাকসুর স্বাস্থ্য সম্পাদক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যদি ছাত্র সংসদের উদ্যোগগুলো অব্যাহত রাখে, তাহলে প্রয়োজনীয় জনবল, অবকাঠামো ও চিকিৎসা সুবিধা পর্যায়ক্রমে বাড়ানো সম্ভব। ধীরে ধীরে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপ দেওয়া খুব কঠিন কিছু নয়।

প্রায় ১৪ হাজার শিক্ষার্থীর একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রতিদিন শত শত মানুষের চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। সেই বাস্তবতায় ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসক, বিনামূল্যে ওষুধ, পরীক্ষার সুবিধা ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগ কেবল একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিসর বাড়ানোর গল্প নয়। এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কতটা শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ও জবাবদিহিমূলক করা যায়, তারও একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে।

এনএইচ/এমআই

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত