২৬ অগাস্ট, ২০২৬ ০৫:৫৪ পিএম

তীব্র অপুষ্টি সংকটে আফগানিস্তান, ঝুঁকিতে ৩৭ লাখ শিশু

তীব্র অপুষ্টি সংকটে আফগানিস্তান, ঝুঁকিতে ৩৭ লাখ শিশু
তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত ২১ মাস বয়সী নূরকে থেরাপিউটিক ফুড খাওয়াচ্ছেন তার মা। ছবিটি আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশের ইউনিসেফ-সমর্থিত কারাকুজি কমিউনিটি হেলথ সেন্টারে। ছবি: ইউনিসেফ

মেডিভয়েস রিপোর্ট: আফগানিস্তানে শিশুদের অপুষ্টি পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

ইউনিসেফ জানিয়েছে, দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ৩৭ লাখ শিশু ওয়েস্টিং বা তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ শিশু সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশনে আক্রান্ত, যা সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অতি অল্প বয়সী শিশুরা। হাসপাতালে তীব্র ওয়েস্টিং ও চিকিৎসাজনিত জটিলতা নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম। আর দুই বছরের কম বয়সী শিশুরাই সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশনের মোট রোগীর ৮৩ শতাংশ।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৫ লাখের বেশি শিশু উচ্চঝুঁকিপূর্ণ মাঝারি মাত্রার ওয়েস্টিং ও সিভিয়ার ওয়েস্টিংয়ের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে চিকিৎসাজনিত জটিলতাসহ সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশনে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা এক বছরের ব্যবধানে এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে।

দক্ষিণ আফগানিস্তানের কিছু হাসপাতালে পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। সেখানে কোনো কোনো হাসপাতালে একটি বেডের বিপরীতে তিন থেকে চারজন করে তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশু চিকিৎসার জন্য আসছে।

ইউনিসেফের আফগানিস্তান প্রতিনিধি ডা. তাজুদ্দিন ওয়ায়েলে সম্প্রতি পূর্ব আফগানিস্তানের নানগারহার আঞ্চলিক হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি ৯ মাস বয়সী সাগিদা নামের এক শিশুর সঙ্গে দেখা করেন। সাগিদার বাড়ি নুরিস্তান প্রদেশের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে। সম্প্রতি ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় ওই এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ইউনিসেফের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক নারী কমিউনিটি হেলথ ওয়ার্কার শিশুটিকে সিভিয়ার অ্যাকিউট ম্যালনিউট্রিশনে আক্রান্ত অবস্থায় শনাক্ত করে হাসপাতালে পাঠান।

হাসপাতালে ভর্তির সময় সাগিদার ওজন ছিল মাত্র ৪ কেজি। চিকিৎসকরা তখন তার বেঁচে থাকার বিষয়ে খুবই শঙ্কিত ছিলেন। পরে থেরাপিউটিক মিল্ক দেওয়ার পর তার অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল হয়। তবে শিশুটি এখনও অত্যন্ত দুর্বল এবং পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নয়।

ইউনিসেফের নতুন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আফগানিস্তানের অর্ধেক শিশু গুরুতর খাদ্য-দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। অর্থাৎ তারা প্রতিদিন দুই বা তারও কম ধরনের খাবার পাচ্ছে। দারিদ্র্য ও খাদ্যসংকটের কারণে অনেক পরিবার পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিচ্ছে, খাবারের পরিমাণ ছোট করছে কিংবা কখনো কখনো খাবার বাদ দিচ্ছে। 

ছয় মাস বয়সের পর শিশুর বুকের দুধের পাশাপাশি বৈচিত্র্যময় পরিপূরক খাবার প্রয়োজন হলেও অনেক শিশু পাচ্ছে শুধু চায়ের সঙ্গে রুটি কিংবা পানিতে মিশিয়ে পাতলা করা দইয়ের মতো সীমিত খাবার।

আফগানিস্তানে বছরের পর বছর ধরে চলা খরা, ভারী বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যা খাদ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সীমান্তবর্তী বাণিজ্য ও মানুষের জীবিকাকে ব্যাহত করছে।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ আফগানিস্তানে ফিরে এসেছে, যাদের অর্ধেকেরও বেশি শিশু। এতে কর্মসংস্থান, পারিবারিক আয় এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

শিশুদের অপুষ্টির প্রয়োজন বাড়লেও অর্থ সংকটের কারণে তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সেবার পরিধি কমছে। সম্পদের সংকটে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে সিভিয়ার ওয়েস্টিংয়ের চিকিৎসা দেওয়া ১০০টিরও বেশি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। শিশু এবং অপুষ্টিতে আক্রান্ত গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী নারীদের পুষ্টিসেবা দেওয়া আরও বহু কেন্দ্রও অর্থায়ন হারিয়েছে।

আফগানিস্তানে ইউনিসেফের পুষ্টি কর্মসূচি পরিচালনায় এ বছর প্রায় ১৮ কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত এর মাত্র ৪ কোটি মার্কিন ডলার অর্থায়ন হয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, শুধু তীব্র অপুষ্টিতে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়াই যথেষ্ট নয়। গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টি নিশ্চিত করা, জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো এবং ছয় মাস বয়সের পর বৈচিত্র্যময় ও পুষ্টিকর পরিপূরক খাবার নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিতে হবে।

এর পাশাপাশি টিকাদান, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষার মতো বিষয়গুলোও সমন্বিতভাবে নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের পুষ্টি পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার প্রাথমিক সংকেত শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই হতে পারে বড় ধরনের অপুষ্টি সংকট প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

সংস্থাটি সতর্ক করেছে, কোনো শিশু গুরুতর অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। এজন্য প্রয়োজন জরুরি, নমনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। কারণ অপুষ্টির ক্ষেত্রে আগেভাগে ব্যবস্থা নেওয়া শুধু জীবন বাঁচায় না—অপুষ্টির গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার তুলনায় এটি অনেক বেশি কার্যকর ও সাশ্রয়ী।

ইউনিসেফের বার্তা স্পষ্ট—আফগানিস্তানের শিশুদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো,সংকট আরও গভীর হওয়ার আগেই পদক্ষেপ নেওয়া।

এইউ/ 

মেডিভয়েসের জনপ্রিয় ভিডিও কন্টেন্টগুলো দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন MedivoiceBD ইউটিউব চ্যানেল। আপনার মতামত/লেখা পাঠান [email protected] এ।
নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল

৫০০ শয্যার নতুন ভবনের বহির্বিভাগ চালু

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল

৫০০ শয্যার নতুন ভবনের বহির্বিভাগ চালু

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও
একদিনেই অবস্থান বদল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

করোনা ছড়ায় উপসর্গহীন ব্যক্তিও